যুক্তরাজ্যের নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিলেন অ্যান্ডি বার্নহাম
নিজস্ব প্রতিবেদক: যুক্তরাজ্যের জাতীয় রাজনীতিতে আবারও এক বড় ধরনের নাটকীয় পটপরিবর্তন ঘটেছে। মাত্র দুই বছর আগে দেশের সাধারণ নির্বাচনে লেবার পার্টিকে এক ঐতিহাসিক ও বিশাল জয় এনে দেওয়া কিয়ার স্টারমারের স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন দলের নতুন নির্বাচিত শীর্ষ নেতা অ্যান্ডি বার্নহাম। আজ সোমবার (২০ জুলাই) লন্ডনের ঐতিহাসিক বাকিংহাম প্যালেসে ব্রিটেনের রাজা তৃতীয় চার্লসের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণে অ্যান্ডি বার্নহাম নতুন ব্রিটিশ সরকার গঠন করেন এবং দেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বভার গ্রহণ করেন।
এর মাধ্যমে যুক্তরাজ্যের গত মাত্র এক দশকের রাজনৈতিক ইতিহাসের মধ্যে সপ্তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেশ পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব নিলেন অভিজ্ঞ এই রাজনীতিক। যুক্তরাজ্যের প্রচলিত সংসদীয় শাসনব্যবস্থার নিয়মানুযায়ী সাধারণ ভোটাররা সরাসরি দেশের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন না করে রাজনৈতিক দলকে ভোট দেয়। যার ফলে কোনো নতুন সাধারণ বা জাতীয় নির্বাচন ছাড়াই ক্ষমতাসীন দলের অভ্যন্তরীণ ভোটাভুটিতে এভাবে শীর্ষ পদের নেতৃত্ব পরিবর্তন আইনগতভাবে সম্ভব হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব নেওয়ার পর ঐতিহ্যবাহী ১০ ডাউনিং স্ট্রিটের সরকারি বাসভবনের বাইরে মিডিয়ার সামনে নিজের প্রথম আনুষ্ঠানিক ভাষণে অ্যান্ডি বার্নহাম অকপটে স্বীকার করেন যে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটিতে ঘন ঘন প্রধানমন্ত্রী বদলের অনাকাঙ্ক্ষিত সংস্কৃতির ফলে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ব্রিটেনের ভাবমূর্তি ও মর্যাদা বেশ ক্ষুণ্ন হয়েছে। এমতাবস্থায় বিশ্বমঞ্চে ব্রিটেনের চিরাচরিত রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনপ্রতিষ্ঠা করে প্রমাণ করা এবং দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকে নতুন করে পুনর্গঠন করাই এখন তাঁর প্রধান ও মূল লক্ষ্য।
যুক্তরাজ্যের রাজনৈতিক অঙ্গনে ‘কিং অব দ্য নর্থ’ (উত্তরাঞ্চলের রাজা) হিসেবে বিশেষভাবে পরিচিত গ্রেটার ম্যানচেস্টারের এই সাবেক সফল মেয়র ও অভিজ্ঞ ক্যাবিনেট মন্ত্রী দীর্ঘদিন ধরেই মূলত লন্ডনের একক কেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থার বাইরে দেশের অন্যান্য আঞ্চলিক পর্যায়ে প্রশাসনিক ক্ষমতা ও অর্থনৈতিক বিনিয়োগ সমানভাবে ছড়িয়ে দেওয়ার পক্ষে জোরালো লড়াই করে আসছেন। তিনি আজ দেশের জনগণের উদ্দেশ্যে দৃঢ় প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করে বলেন, সরকারের ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে অতি দ্রুত যুক্তরাজ্যের সাধারণ মানুষের বর্তমান লাগামহীন জীবনযাত্রার ব্যয় নাগালের মধ্যে আনা হবে।
তবে ডাউনিং স্ট্রিটের ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই অ্যান্ডি বার্নহামকে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বেশ কিছু বড় ও জটিল চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। আন্তর্জাতিক কূটনীতির ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে যুক্তরাজ্যের দ্বিপক্ষীয় কৌশলগত সম্পর্ক সফলভাবে বজায় রাখা তাঁর জন্য একটি অন্যতম বড় পরীক্ষা হতে যাচ্ছে। কারণ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইতোমধ্যে অ্যান্ডি বার্নহামকে আন্তর্জাতিক মহলে একজন ‘চরম উদারপন্থী’ বা এক্সট্রিম লিবারেল নেতা বলে প্রকাশ্য আখ্যা দিয়েছেন।
অন্যদিকে যুক্তরাজ্যের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির মাঠে কট্টর ডানপন্থী রাজনৈতিক দল ‘রিফর্ম ইউকে’ এবং প্রগতিশীল বামপন্থী দল ‘গ্রিন পার্টি’র ব্যাপক উত্থানের মুখে ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির বর্তমান রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা ধরে রাখাও তাঁর জন্য বেশ কঠিন একটি কাজ হবে। গত মাত্র পাঁচ বছরের ব্যবধানে চারজন ভিন্ন প্রধানমন্ত্রীর মুখে ‘নতুন করে পথ চলার’ গালভরা প্রতিশ্রুতি শুনে শুনে ক্লান্ত ও ক্ষুব্ধ সাধারণ ব্রিটিশ ভোটারদের মনে এখন এটাই বিশ্বাস করানো অ্যান্ডি বার্নহামের প্রথম ও প্রধান কাজ হবে যে—তিনি কেবল জনগণের জীবনযাত্রার মানই উন্নত করবেন না, বরং তাঁর পূর্বসূরি প্রধানমন্ত্রীদের চেয়ে অনেক বেশিদিন ১০ ডাউনিং স্ট্রিটের মসনদে সফলভাবে টিকে থাকবেন।
|