ইউরোপজুড়ে কেন ছড়াচ্ছে ক্ষোভের দাবানল
অনলাইন ডেস্ক: চলতি অক্টোবরে তীব্র গণবিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ, দোকানপাটে লুটপাট এবং পুলিশি সংঘাতের মাধ্যমে কার্যত নজিরবিহীন উত্তাল সময় পার করছে ইউরোপের একাধিক রাজধানী ও প্রধান শিল্পনগরী। আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও অর্থনীতি বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউরোপজুড়ে চেপে বসা জীবনযাত্রার চড়া মূল্য, তীব্র আবাসন সংকট এবং সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্য সংকটের চরম খেসারত হিসেবেই এই বিদ্রোহের দাবানল ছড়িয়ে পড়ছে।
চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে মার্কিন-ইসরায়েলি সামরিক অভিযান শুরুর পর কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিবহন স্থবির হয়ে পড়ে। আসালুয়েতে হামলার পর আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলে ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। ইউরোপীয় কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, বিশ্ব বাণিজ্য ও সরবরাহ ব্যবস্থার এমন অচলাবস্থার কারণে মহাদেশটিকে ইতোমধ্যে প্রায় ১০০ বিলিয়ন ইউরোর আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে। বেশ কিছু অঞ্চলে গ্যাসের দাম প্রায় ১৪০ শতাংশ এবং ডিজেলের দাম দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। যার প্রভাবে আমদানিকৃত জীবাশ্ম জ্বালানির পেছনে কেবল অতিরিক্ত ব্যয় মেটাতে গিয়ে দেউলিয়া হওয়ার মুখে পড়েছে সাধারণ পরিবারগুলো।
সংকটের মূল সুত্রপাত ঘটে ফ্রান্সে হাইস্কুল শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষ অবরোধের মাধ্যমে। শিক্ষক সংকট ও জরাজীর্ণ ভবনের প্রতিবাদে শুরু হওয়া আন্দোলন পরবর্তীতে শক্তিশালী সিজিটি ইউনিয়ন, কৃষক, পরিবহন কর্মী ও সরকারি কর্মচারীরা যোগ দিলে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। গত ১৭ অক্টোবর এক দিনেই দেশটিতে ৮ লাখের বেশি মানুষ রাস্তায় নেমে আসেন। লিমিজের ঐতিহাসিক ১৯ শতকের সিটি হল আংশিক ধ্বংস হওয়ার পর সেখান থেকে প্রায় ২৪০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। একইভাবে ইতালির মিলান, স্পেনের মাদ্রিদ, বেলজিয়ামের ব্রাসেলস এবং আলবেনিয়ার তিরানাতেও পুলিশের সাথে বিক্ষোভকারীদের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়।
স্পেনের মাদ্রিদে উচ্ছেদ অভিযানের জেরে একজন ৮৭ বছর বয়সী নারীর করুণ মৃত্যুর পর সেখানে পরিস্থিতি আরও অগ্নিগর্ভ রূপ নেয়। ন্যূনতম মজুরির প্রায় সমপরিমাণ টাকা বাড়ি ভাড়ায় ব্যয় হতে থাকায় প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ আবাসন আইন পাস করতে ব্যর্থ হয়ে শেষ পর্যন্ত আগাম নির্বাচনের ডাক দিয়েছেন। পর্তুগালের লিসবনে গড় ভাড়ার খরচ গড় বেতনের ১১৬ শতাংশে পৌঁছানোয় মানুষ ভিটেমাটি হারানোর আশঙ্কায় রাস্তায় নেমে এসেছে।
অন্যদিকে, গাজায় প্রাণহানি এবং ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইউরোপীয় দেশগুলোর সামরিক বাজেট বৃদ্ধির তাগিদকেও সাধারণ মানুষ ভালোভাবে নিচ্ছেন না। সামাজিক ও অর্থনৈতিক এই নজিরবিহীন দেউলিয়াত্ব ও অসন্তোষের সুযোগ নিয়ে ফ্রান্সে মারিন ল্য পেন এবং জার্মানির এএফডির মতো উগ্র ডানপন্থী দলগুলো জনমত জরিপে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক দৃশ্যমান সংস্কার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত ইউরোপের প্রধান শহরগুলোর এই আন্দোলন থামার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
সকালবেলা / নুসরাত