
স্পোর্টস ডেস্ক: ইউরোপীয় ক্লাব ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ আসর উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের (UEFA Champions League) ফাইনালে চরম নাটকীয়তা আর রোমাঞ্চ শেষে ব্যাক-টু-ব্যাক শিরোপা নিজেদের শোকেসে ভরল ফরাসি ক্লাব প্যারিস সেন্ট জার্মেই (পিএসজি)। লন্ডনের ক্লাব আর্সেনালের বুকভাঙ্গা কান্না আর পেনাল্টি শুটআউটের চরম স্নায়ুযুদ্ধে জয়ী হয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো চ্যাম্পিয়ন হলো প্যারিসের দলটি। নিজ নিজ দেশের ঘরোয়া লিগ চ্যাম্পিয়ন হিসেবে মহাদেশীয় এই ফাইনালে মুখোমুখি হয়েছিল দুই দল, যার ফলে মাঠের লড়াইয়ে দুই পরাশক্তির মাঝে পার্থক্য করা ছিল খুবই দুলর্ভ। তবে টাইব্রেকারের ভাগ্য নির্ধারণে শেষ হাসি হেসেছে লুইস এনরিকের শিষ্যরাই। আজ রবিবার (৩১ মে) সকাল ১১টা ৪৭ মিনিটে প্রকাশিত এক বিশেষ স্পোর্টস প্রতিবেদনে পিএসজির এই ইতিহাস গড়া জয়ের পেছনে লুকিয়ে থাকা একঝাঁক অবিশ্বাস্য ও ঐতিহাসিক পরিসংখ্যান বা সংখ্যা সামনে এসেছে।
চলুন সংখ্যায় সংখ্যায় দেখে নেওয়া যাক পিএসজির এই অবিস্মরণীয় ও মহাকাব্যিক রাজত্ব জয়ের খতিয়ান
বিগত ২০২৩-২৪ মৌসুমের চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনাল এবং চলতি ২০২৫-২৬ মৌসুমের মেগা ফাইনালের শুরুর একাদশে পিএসজি তাদের আউটফিল্ডের (গোলরক্ষক বাদে) একই ১০ জন খেলোয়াড়কে মাঠে নামিয়েছিল। ইউরোপীয় প্রতিযোগিতার সুদীর্ঘ ইতিহাসে ২০১৭ ও ২০১৮ সালে রিয়াল মাদ্রিদের পর দ্বিতীয় কোনো ক্লাব হিসেবে এই অনন্য ও বিরল ধারাবাহিকতার কীর্তি গড়ল পিএসজি।
ম্যাচে ফরাসি তারকা উসমান দেম্বেলের করা জাদুকরী গোলটির ওপর ভর করে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের একক আসরে সর্বোচ্চ গোলের বিশ্বরেকর্ড ছুঁয়ে ফেলেছে পিএসজি। চলতি টুর্নামেন্টে এটি ছিল ফরাসি চ্যাম্পিয়নদের সর্বমোট ৪৫তম গোল, যার মাধ্যমে তারা ১৯৯৯-২০০০ মৌসুমে স্প্যানিশ জায়ান্ট বার্সেলোনার গড়া বহুল আলোচিত সর্বোচ্চ গোলের কীর্তিতে নিজেদের ভাগ বসাল।
পুরো ফাইনাল ম্যাচ জুড়ে পিএসজির বল পজেশন বা বল নিয়ন্ত্রণে রাখার হার ছিল চোখ কপালে তোলার মতো, যা শতাংশের হিসেবে ৭৫.৩%। উয়েফার ইতিহাসে আধুনিক রেকর্ড ও ডেটা সংরক্ষণ শুরু হওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালে কোনো একক দলের সর্বোচ্চ বল পজেশনের নতুন বিশ্বরেকর্ড এটি।
ইউরোপীয় শ্রেষ্ঠত্বের আসরে দীর্ঘ ১০ বছর বা এক দশকের মধ্যে এই প্রথমবার চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনাল ম্যাচ নির্ধারিত ৯০ মিনিটের গণ্ডি পেরিয়ে অতিরিক্ত সময়ে (Extra Time) গড়ায় এবং শেষ পর্যন্ত পেনাল্টি শুটআউটের মতো ভাগ্যপরীক্ষায় গিয়ে ট্রফির নিষ্পত্তি ঘটে।
উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ কিংবা প্রাচীন ইউরোপিয়ান কাপের ফাইনালে প্রথম কোনো ইংলিশ ক্লাব হিসেবে পেনাল্টি শুটআউটে কোনো বিদেশী (অ-ইংলিশ) ক্লাবের কাছে হারার করূণ রেকর্ড গড়ল আর্সেনাল। এর আগে ফাইনালে টাইব্রেকারে হেরে যাওয়া একমাত্র ইংলিশ ক্লাব ছিল চেলসি (২০০৮ সাল), তবে তারা হেরেছিল নিজ দেশেরই আরেক ক্লাব ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের কাছে।
২০১৬, ২০১৭ ও ২০১৮ সালে স্প্যানিশ জায়ান্ট রিয়াল মাদ্রিদের ডাগআউটে বসে টানা তিনটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জিতেছিলেন কিংবদন্তি জিনেদিন জিদান। জিজুর সেই ঐতিহাসিক কীর্তির পর প্রথম ম্যানেজার বা কোচ হিসেবে টানা ব্যাক-টু-ব্যাক চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনাল জেতার মহান রেকর্ড গড়লেন পিএসজির মাস্টারমাইন্ড লুইস এনরিকে।
ফাইনালে পিএসজির রাশিয়ান গোলকিপার মাতভে সাফানোভ পুরো ১২০ মিনিটের ম্যাচে এবং পরবর্তীতে পেনাল্টি শুটআউটেও প্রতিপক্ষের কোনো শট একটিবারের জন্যও সেভ বা প্রতিহত করতে পারেননি। কোনো সেভ না করেই চ্যাম্পিয়ন্স লিগের মেডেল গলায় ঝোলানোর এক অদ্ভুত কীর্তি গড়লেন এই গোলরক্ষক।
ইউরোপিয়ান কাপ কিংবা আধুনিক চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলেও ট্রফি না ছুঁতে পারার সবচেয়ে ট্র্যাজিক ও দুর্ভাগ্যজনক দল এখন গানার্স বা আর্সেনাল। মহাদেশীয় আসরে তারা এ পর্যন্ত সর্বমোট ২২৬টি ম্যাচ খেললেও আজ পর্যন্ত ইউরোপের এই রূপালী ট্রফিটি একবারের জন্যও উঁচিয়ে ধরতে পারেনি।
প্যারিস সেন্ট জার্মেইর তরুণ ফরাসি মিডফিল্ডার ওয়ারেন জায়ার-এমেরি ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ ফুটবলার হিসেবে ক্যারিয়ারে দুটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনাল জয়ের অবিশ্বাস্য এক রেকর্ড গড়লেন। এক্সট্রা টাইমে বেঞ্চ থেকে মাঠে নামা এই ফরাসি আন্তর্জাতিক ফুটবলার মাত্র ২০ বছর ২ মাস বয়সেই টানা দ্বিতীয়বারের মতো এই ট্রফি ছোঁয়ার স্বাদ নিলেন। এর মাধ্যমে তিনি ১৯৭০ সালে আয়াক্স আমস্টারডামের ডাচ মিডফিল্ডার জোহান নিসকেন্সের গড়া (২০ বছর ৮ মাস) দীর্ঘ ৫৬ বছরের পুরনো রেকর্ডটি ভেঙে চুরমার করে দিলেন। পিএসজির এই ঐতিহাসিক জয় ফুটবল বিশ্বে এক নতুন পরাশক্তির দীর্ঘস্থায়ী রাজত্বের জানান দিল।
জান্নাত সকালাবেলা