
ক্রীড়া প্রতিবেদক: বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনের সবচেয়ে বড় ও মর্যাদাপূর্ণ আসর ‘২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ’ (FIFA World Cup 2026) শুরু হতে আর মাত্র কয়েকটা দিন বাকি। ঠিক এই অন্তিম মুহূর্তে ফুটবল বিশ্বকে নাড়িয়ে দিয়ে এক বড়সড় ভূরাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে টুর্নামেন্টের প্রধান আয়োজক দেশ যুক্তরাষ্ট্র। বিশ্বকাপের মূল পর্বে অংশ নিতে যাওয়া ইরান জাতীয় ফুটবল দলের (Iran National Football Team) সমস্ত খেলোয়াড়দের জন্য মার্কিন ভিসা অনুমোদন করা হলেও, দলটির ছায়া সঙ্গী ও নেপথ্যের কারিগর ১৪ জন শীর্ষ কর্মকর্তাকে ভিসা দিতে সাফ অস্বীকৃতি জানিয়েছে ওয়াশিংটন। যুক্তরাষ্ট্রের এই নজিরবিহীন সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বিশ্ব ফুটবলের অভিভাবক সংস্থা ফিফার কাছে আনুষ্ঠানিক নালিশ জানানোর চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছে ইরান।
আজ রবিবার (৭ জুন) দুপুর ২টা ৪ মিনিটে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের বরাতে অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত ‘খেলার মাঠ, ফুটবল ও বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গন’ এবং ‘ফিফা বিশ্বকাপ মনিটরিং, আন্তর্জাতিক ক্রীড়া কূটনীতি ও ভূরাজনীতি পর্যবেক্ষণ উইং’ বিভাগের বিশেষ যৌথ বুলেটিংয়ে ইরান ফুটবল দলের ভিসা জটিলতার নেপথ্য কারণ ও দুই দেশের কূটনৈতিক বাদানুবাদের খতিয়ান বিস্তারিত তুলে ধরা হলো।
ইরান ফুটবল ফেডারেশনের (FFIRI) অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক জরুরি বিবৃতিতে দাবি করা হয়েছে, টুর্নামেন্টের সহ-আয়োজক রাষ্ট্র হিসেবে মার্কিন প্রশাসন ইরান দলের ‘প্রধান বেশ কয়েকজন অভিজ্ঞ ম্যানেজার, টেকনিক্যাল স্টাফ ও গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কর্মকর্তাকে’ কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়াই ভিসা দেয়নি। ফেডারেশনের মতে, মাঠের বাইরের এই রাজনৈতিক ও বৈষম্যমূলক সিদ্ধান্ত মূলত ইরান জাতীয় ফুটবল দলকে একটি সমতার ও পক্ষপাতহীন প্রতিযোগিতা থেকে বঞ্চিত করার অপকৌশল।
ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের বৈশ্বিক সম্প্রচার উইং জানিয়েছে, মার্কিন দূতাবাসের জটিল নিয়মের বেড়াজালে পড়ে আবেদন করেও চূড়ান্তভাবে ভিসা পাননি ইরান দলের মোট ১৪ জন কর্মকর্তা। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই তালিকায় খোদ ইরান ফুটবল ফেডারেশনের মহাসচিব হেদায়েত মোম্বেইনি (Hedayat Mombeini) এবং ফেডারেশনের সহসভাপতি মেহদি মোহাম্মদ নবী (Mehdi Mohammad Nabi)-র মতো শীর্ষ কর্তারাও রয়েছেন। তবে ইরান ফুটবল ফেডারেশনের বর্তমান সভাপতি মেহদি তাজের (Mehdi Taj) ভিসা আদতেও হয়েছে কি না, তা নিয়ে এখনো এক ধরণের ধোঁয়াশা বজায় রেখেছে উভয় পক্ষ।
আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের এই ফুটবল কর্মকর্তাদের ভিসা না দেওয়ার পেছনে কাজ করছে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি পুরনো ও কঠোর নিষেধাজ্ঞা। ইরানের ফুটবলপ্রধান মেহেদি তাজ বর্তমান পদে যোগ দেওয়ার আগে দেশটির প্রভাবশালী সামরিক শাখা ‘ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী’ বা আইআরজিসি (IRGC)-র একজন সক্রিয় উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ছিলেন। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী পূর্বেই ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, আইআরজিসির সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত কোনো ইরানি নাগরিককে কোনো অবস্থাতেই যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে প্রবেশাধিকার বা ভিসা দেওয়া হবে না। মূলত সেই ভূরাজনৈতিক শত্রুতার কারণেই ফুটবল ফেডারেশনের কর্মকর্তাদের ওপর এই কোপ পড়ল বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এই কূটনৈতিক টানাপোড়েনের প্রভাব পড়েছে ইরান দলের বিশ্বকাপ প্রস্তুতিতেও। প্রথমে ফিফা ইরানের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনা অঙ্গরাজ্যে অফিশিয়াল বেজক্যাম্প নির্ধারণ করেছিল। কিন্তু মার্কিন প্রশাসনের বৈরী আচরণের পূর্বাভাস পেয়ে ইরান ফুটবল ফেডারেশনের বিশেষ অনুরোধে পরবর্তীতে সেই বেজক্যাম্প পরিবর্তন করে পাশের দেশ মেক্সিকোতে (Mexico) সরিয়ে নেওয়া হয়। গত ১৮ মে থেকে তুরস্কের আঙ্কারায় বিশেষ কন্ডিশনিং ক্যাম্প করছিল ইরান দল এবং সেখান থেকেই মেক্সিকো ও যুক্তরাষ্ট্রের ভিসার প্রক্রিয়া চালানো হয়। ইরানের শীর্ষ বার্তা সংস্থা ‘তাসনিম’ (Tasnim) জানিয়েছে, ভিসা না পাওয়া এই ১৪ জন কর্মকর্তাও দলের সাথে মেক্সিকোতেই যাবেন এবং সেখান থেকেই টুর্নামেন্ট চলাকালীন সময়ে মার্কিন ভিসা পাওয়ার আইনি লড়াই ও চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া হবে। গতকাল শনিবারই ইরান দল তুরস্ক ছেড়ে মেক্সিকোর উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছে।
এদিকে, তুরস্কের আঙ্কারায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত টম বারাক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্ট করে ইরান দলের খেলোয়াড়দের ভিসা দ্রুত প্রসেস করার জন্য নিজের দূতাবাসের কর্মীদের বাহবা ও অভিনন্দন জানিয়েছিলেন। কিন্তু তার এই পোস্টের তীব্র বিরোধিতা করে আঙ্কারায় অবস্থিত ইরানি দূতাবাস পাল্টা পোস্টে লেখে, “নিজেদের মনগড়া প্রশংসা করে আপনারা এমন এক অনৈতিক আচরণকে ধামাচাপা দিতে পারেন না, যা ফিফার আন্তর্জাতিক নিয়মকে সরাসরি লঙ্ঘন করে এবং বিশ্বকাপের আয়োজক দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক দায়বদ্ধতাকে ক্ষুণ্ন করে। এটি আসলে সমকালীন খেলাধুলার মধ্যে রাজনৈতিকভাবে পক্ষপাতদুষ্ট নোংরা হস্তক্ষেপের নিকৃষ্টতম উদাহরণ।”
গত শুক্রবার (৫ জুন) মার্কিন প্রশাসনের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বিশ্বখ্যাত গণমাধ্যম এবিসি নিউজকে (ABC News) দেওয়া সাক্ষাৎকারে নিশ্চিত করেন যে, ইরানের মূল স্কোয়াডের সব ফুটবলারের ভিসা শতভাগ অনুমোদন করা হয়েছে এবং খেলোয়াড়দের ওপর কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। তবে বিশ্বখ্যাত বার্তা সংস্থা এপি (AP)-কে নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরেকজন মার্কিন কর্মকর্তা ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, ইরান ফুটবল দলের সাথে যুক্ত কিছু আবেদনকারী মূলত ‘মিথ্যা ও ভুয়া অজুহাত’ (False Pretenses) দেখিয়ে ভিসার আবেদন করায় আন্তর্জাতিক নিয়মানুযায়ী তা বাতিল বা রিফিউজ করা হয়েছে। বিশ্বকাপ শুরুর আগেই মাঠের বাইরের এই মেগা লড়াই বিশ্ব ফুটবল অঙ্গনকে বেশ গরম করে তুলেছে।
জান্নাত সকালবেলা