
স্পোর্টস ডেস্ক:রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং ক্রিকেটারদের পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ইস্যুকে সামনে রেখে ভারতে অনুষ্ঠিত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ বর্জন করার পর বাংলাদেশের ক্রিকেট অঙ্গনে যে তীব্র হতাশা ও আন্তর্জাতিক ত্রিমুখী (আইসিসি, বিসিসিআই ও বিসিবি) বিরোধ দেখা দিয়েছিল, তা যেন এখন এক পরম আশীর্বাদে বা শাপে বরে পরিণত হয়েছে। তৎকালীন সরকারের কড়া নির্দেশনায় বিশ্বমঞ্চে বিশ্বজয়ের লড়াইতে অংশ নিতে না পারার মানসিক আঘাতকে ক্রিকেটাররা মাঠে অবিশ্বাস্য এক সাফল্যের রূপান্তর ঘটিয়েছেন। বিশ্বকাপ-পরবর্তী সময়ে ঘরের মাঠে আসা বিশ্বের বড় বড় ক্রিকেট পরাশক্তিদের রীতিমতো খড়কুটোর মতো উড়িয়ে দিয়ে টানা ৫টি সিরিজে অপরাজিত থাকার অবিশ্বাস্য এক নজির স্থাপন করেছে টিম বাংলাদেশ।
আজ শুক্রবার (১২ জুন) সকালে অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত ‘আন্তর্জাতিক ক্রিকেট, দ্বিপাক্ষিক সিরিজ ও দলগত পারফরম্যান্স খতিয়ান’ এবং ‘পেস বোলিং দাপট, রিভার্স সুইং ও হোম কন্ডিশন উইং’-এর বিশেষ যৌথ বুলেটিংয়ে টাইগারদের এই ওয়ান-ম্যান শো’র ধারাবাহিক রূপরেখা বিস্তারিত তুলে ধরা হলো।
বিশ্বকাপের হাই-ভোল্টেজ আসর শেষ হতেই বাংলাদেশ সফরের মধ্য দিয়ে দ্বিপাক্ষিক ক্রিকেট সিরিজে অংশ নিতে ঢাকায় আসে পাকিস্তান দল। বিশ্বকাপে অংশ নিতে না পারার সমস্ত জমানো ক্ষোভ লিটন দাসের দল উগরে দেয় বাবর আজমদের ওপর। তিন ম্যাচের সেই হাই-ভোল্টেজ ওডিআই সিরিজে পাকিস্তান দলকে ২-১ ব্যবধানে হারিয়ে নিজেদের নতুন জয়যাত্রার রাজকীয় সূচনা করে বাংলাদেশ। সিরিজের প্রতিটি ম্যাচেই বাংলাদেশ দলের ক্রিকেটারদের শরীরী ভাষায় স্পষ্ট ছিল একরোখা জেদ আর লড়াইয়ের মানসিকতা।
পাকিস্তান সিরিজের রেশ কাটতে না কাটতেই বাংলাদেশে পা রাখে নিউজিল্যান্ড ক্রিকেট দল। মিরপুর ও জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামের উইকেটে ঐতিহ্যগত মন্থরতা ভেঙে কিউইদের চমকে দিতে তৈরি করা হয়েছিল স্পোর্টিং ও বাউন্সি পিচ। তাসকিন-মুস্তাফিজদের আগুনঝরা বোলিংয়ের সামনে দাঁড়াতেই পারেনি নিউজিল্যান্ডের শক্তিশালী ব্যাটিং লাইনআপ। ফলে তিন ম্যাচের ওডিআই সিরিজটি বাংলাদেশ নিজেদের করে নেয় ২-১ ব্যবধানে। এরপর অনুষ্ঠিত টি-টোয়েন্টি সিরিজটি ১-১ ব্যবধানে ড্র হলেও চট্টগ্রামের বৃষ্টি যদি বাধা না হয়ে দাঁড়াতো, তবে সেখানেও কিউইদের হোয়াইটওয়াশ করার মোক্ষম সুযোগ ছিল স্বাগতিকদের সামনে।
কন্ডিশনের সুবিধা নিয়ে কিউইদের বধ করার পর পূর্ণাঙ্গ সিরিজ খেলতে বাংলাদেশে পুনরায় আগমন ঘটে শান মাসুদের নেতৃত্বাধীন পাকিস্তান ক্রিকেট দলের। দুই ম্যাচের এই মহাকাব্যিক টেস্ট সিরিজে ফাস্ট বোলারদের চারণভূমি হিসেবে পরিচিত পাকিস্তানের ব্যাটারদের নিজেদের পেস দিয়েই কাবু করে ফেলেন নাহিদ রানা ও তাসকিন আহমেদরা। পুরো সিরিজে ব্যাটার ও বোলারদের যৌথ অবদানে উভয় ম্যাচেই দুর্দান্ত জয় তুলে নেয় বাংলাদেশ। এর ফলে টেস্ট ক্রিকেটের সুদীর্ঘ ইতিহাসে ঘরের মাঠে প্রথমবার পাকিস্তানকে টেস্ট ম্যাচ ও টেস্ট সিরিজ হারানোর নতুন কীর্তি গড়ে শান্তর দল।
পাঁচে পাঁচ পূর্ণ করার সবশেষ এবং সবচেয়ে ঐতিহাসিক অধ্যায়টি রচিত হলো চলমান অস্ট্রেলিয়া ওডিআই সিরিজে। দীর্ঘ প্রায় ১৫ বছর পর বাংলাদেশের মাটিতে ৫০ ওভারের ওডিআই ক্রিকেট খেলতে আসা ক্রিকেট পরাশক্তি অস্ট্রেলিয়াকে পাত্তাই দেয়নি স্বাগতিকরা। মিরপুরের চেনা উইকেটে পেসারদের আগুনে বোলিং ও ব্যাটারদের দায়িত্বশীল ব্যাটিংয়ে প্রথম দুই ম্যাচ জিতেই এক ম্যাচ হাতে রেখে ঐতিহাসিক সিরিজ নিশ্চিত করেছে মিরাজ-শান্তরা। বাংলাদেশের ৪০ বছরের ওডিআই ক্রিকেট ইতিহাসে অজিদের বিপক্ষে এটাই প্রথম দ্বিপাক্ষিক ওডিআই সিরিজ জয়ের অনন্য রেকর্ড।
বিশ্বকাপ বয়কটের পর থেকে এখন পর্যন্ত তিন ফরম্যাটের মোট পাঁচটি আন্তর্জাতিক সিরিজে অপরাজিত থাকার এই অভাবনীয় গৌরব ক্রিকেট বিশ্বের নজর কেড়েছে। অস্ট্রেলিয়া সিরিজের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করেই জিম্বাবুয়ে সফরে যাবে বাংলাদেশ দল, যা হবে এই চলতি বছরে টাইগারদের প্রথম বিদেশ সফর। এরপর অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকার মতো কঠিন কন্ডিশনেও খেলার সূচি রয়েছে। দেশের বাইরে গিয়েও ক্রিকেটাররা এই জয়ের ছন্দ ধরে রাখতে পারেন কিনা, এখন সেটাই দেখার বিষয়।
জান্নাত সকালবেলা