ইউক্রেন দ্বন্দ্বে শেষ মুহূর্তে রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা স্থগিত ট্রাম্পের
অনলাইন ডেস্ক: ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে ওয়াশিংটনের কূটনৈতিক দ্বন্দ্ব যখন চরমে পৌঁছেছে, ঠিক তখনই এক নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত নিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। নিজ দেশের পাস করা সিদ্ধান্ত অগ্রাহ্য করে নির্বাহী ক্ষমতাবলে রাশিয়ার ওপর নির্ধারিত বেশ কিছু বড় অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা স্থগিত ঘোষণা করেছেন তিনি।
সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, উক্ত নিষেধাজ্ঞাগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হওয়ার মাত্র ৪৮ ঘণ্টা আগে শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) গভীর রাতে জারি করা এক জরুরি প্রজ্ঞাপনে ট্রাম্প দাবি করেন—রাশিয়ার ওপর একতরফা বিধিনিষেধ স্থগিত রাখা বর্তমান মুহূর্তে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘জাতীয় স্বার্থের’ জন্য ইতিবাচক।
উল্লেখ্য, গত সেপ্টেম্বর মাসে মার্কিন কংগ্রেসে দুই দলের সম্মতিতে পাস হওয়া ও ট্রাম্প কর্তৃক স্বাক্ষরিত এই নতুন আইনে রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল ও গ্যাসের শীর্ষ ক্রেতা দেশগুলোর (যেমন—চীন ও ভারত) ওপর ১০০ শতাংশ পর্যন্ত অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল। একই সঙ্গে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও তেলবাহী ‘শ্যাডো ফ্লিট’-এর ওপরও নিষেধাজ্ঞা বলবৎ করার আইন পাস হয়। ট্রাম্পের সাম্প্রতিক এই জরুরি নির্বাহী আদেশের ফলে মার্কিন আইনপ্রণেতাদের তৈরি সেই শক্তিশালী আইনের বড় একটি অংশ কার্যত অকার্যকর হয়ে গেল।
ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন মার্কিন আইনপ্রণেতারা। ভার্জিনিয়া থেকে নির্বাচিত ডেমোক্র্যাট কংগ্রেস সদস্য ডন বায়ার সামাজিক মাধ্যম এক্সে লিখেছেন, “পুতিনের কাছে ট্রাম্পের এই নতুন আত্মসমর্পণ আবার প্রমাণ করল—তিনি আমাদের ইউক্রেনীয় অংশীদারদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করছেন এবং রাশিয়ার বেআইনি আগ্রাসনের শাস্তি নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে পাস করা আইনের সুস্পষ্ট বরখেলাপ করছেন।”
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এমন আকস্মিক ক্ষমার নেপথ্যে রয়েছে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বহাল ইরান যুদ্ধের চরম প্রভাব। মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনার ফলে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি ও তেলের রেকর্ড মূল্যবৃদ্ধি ঘটেছে। আগামী মাসের আসন্ন মিড-টার্ম (মধ্যবর্তী) নির্বাচনের আগে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে তেলের সংকট ও দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে রাশিয়ার কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ ডিজেল আমদানির গোপন চুক্তি করেন ট্রাম্প। এর তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি অভিযোগ তোলেন যে, আমেরিকা পরোক্ষভাবে রাশিয়ার রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ তহবিলে অর্থ যোগান দিচ্ছে।
পরিস্থিতি আরও জটিল রূপ নেয় যখন ওয়াশিংটনের বারণ সত্ত্বেও কিয়েভ বাহিনী রাশিয়ার তেল শোধনাগারে ফের ড্রোন হামলা চালায়। ট্রাম্প এই পদক্ষেপকে ‘লজ্জাজনক’ আখ্যা দিলে, ব্রাসেলসে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সম্মেলনে জেলেনস্কি ট্রাম্পকে খোঁচা দিয়ে বলেন, “অবশেষে কাজের এবং প্রকৃত নেতাদের মাঝে ফিরতে পেরে ভালো লাগছে।”
পরবর্তীতে ইউক্রেনীয় প্রতিরক্ষা বাহিনীর যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহৃত অপরিহার্য স্যাটেলাইট ইন্টারনেট পরিষেবা ‘স্টারলিংক’-এর গতি মার্কিন নিয়ন্ত্রকদের নির্দেশে কৃত্রিমভাবে কমিয়ে দেওয়া এবং গোয়েন্দা তথ্য শেয়ার স্থগিত করার গুরুতর অভিযোগ ওঠে ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে। যদিও ট্রাম্প সামরিক সাহায্য পুরোপুরি বন্ধের দাবি উড়িয়ে দিয়েছেন, তবে শুক্রবার জেলেনস্কি সাংবাদিকদের কাছে সত্যতা নিশ্চিত করেছেন যে, স্টারলিংকের কমানো গতি এখনও পুরোপুরি পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা হয়নি।