হিরোশিমা-নাগাসাকিতে পরমাণু হামলার ৮১ বছর: বিশ্ব কি আজ নিরাপদ?

প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ০৬ আগস্ট ২০২৬, ১১:২৩ পূর্বাহ্ণ
হিরোশিমা-নাগাসাকিতে পরমাণু হামলার ৮১ বছর: বিশ্ব কি আজ নিরাপদ?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ১৯৪৫ সালের আগস্ট মাসে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষলগ্নে জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকি শহরের ওপর সংঘটিত মানব ইতিহাসের প্রথম ও একমাত্র পারমাণবিক বোমাবর্ষণের ৮১ বছর পূর্ণ হলো। তৎকালীন মার্কিন হামলায় কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে মাটির সঙ্গে মিশে গিয়েছিল দুটি সমৃদ্ধ ও ঐতিহাসিক শহর। ভয়াবহ তেজস্ক্রিয়তা, অগ্নিকাণ্ড ও আঘাতের কারণে প্রাণ হারিয়েছিলেন প্রায় আড়াই লাখ মানুষ, যাদের সিংহভাগই ছিলেন নিরীহ বেসামরিক নাগরিক।

আট দশক পার হয়ে গেলেও এই আক্রমণের যৌক্তিকতা, সামরিক প্রয়োজন ও আইনি ভিত্তি নিয়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে তীব্র বিতর্ক আজও বিরাজমান। যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের সমর্থকদের মতে, এই কঠোর পদক্ষেপের ফলেই জাপান দ্রুত আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়েছিল এবং পরবর্তীতে সম্ভাব্য স্থল অভিযান এড়িয়ে দুই পক্ষের লাখ লাখ সেনার প্রাণ বেঁচেছিল। তবে বিশ্বজুড়ে বহু ইতিহাসবিদ ও বিশ্লেষকদের মতে, এটি ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস ও যুদ্ধাপরাধ। কারণ তৎকালীন কঠোর নৌ-অবরোধ এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের যুদ্ধ ঘোষণার ফলে জাপান এমনিতেই পর্যদুস্ত ছিল। ফলে নতুন এই মারণাস্ত্রের পরীক্ষা চালানো এবং উদীয়মান সোভিয়েত ইউনিয়নকে নিজের শক্তির জানান দেওয়াকেই মার্কিন নীতিনির্ধারকদের মূল উদ্দেশ্য মনে করা হয়।

হিরোশিমার ভস্মীভূত ধ্বংসস্তূপ মানবজাতিকে যে সতর্কবার্তা দিয়েছিল, বর্তমান বিশ্বের পারমাণবিক রণসজ্জা প্রমাণ করে বিশ্ব এখনো সেই ভয়াবহ শঙ্কার ছায়াতেই বাস করছে। স্নায়ুযুদ্ধের তুঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রায় ৭০ হাজার পারমাণবিক অস্ত্র মজুত ছিল। তার তুলনায় সংখ্যাটি বর্তমানে কিছুটা কমলেও তা পুরো মানবজাতিকে একাধিকবার ধ্বংস করার জন্য যথেষ্ট।

আন্তর্জাতিক পরমাণু বিশেষজ্ঞদের সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বজুড়ে সামরিক পরাশক্তিগুলোর হাতে ১২ হাজারের বেশি পারমাণবিক ওয়ারহেড মজুত রয়েছে। এই বিশাল মারণাস্ত্র ভাণ্ডারের সিংহভাগই এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া, যাদের যৌথ সংগ্রহে রয়েছে প্রায় সাড়ে ১০ হাজার ওয়ারহেড। এর মধ্যে রাশিয়ার সক্রিয় ওয়ারহেডের সংখ্যা প্রায় ৪ হাজার ৪০০টি এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৩ হাজার ৭০০টি। তাৎক্ষণিক ব্যবহারের জন্য দুই দেশই প্রায় সমসংখ্যক মোতায়েনকৃত অস্ত্র তৈরি রেখেছে—রাশিয়ার প্রায় ১,৮০০টি এবং যুক্তরাষ্ট্রের ১,৭০০টি। আকাশ, জল ও স্থল—তিন পথেই একযোগে পারমাণবিক আঘাত হানার পূর্ণ সক্ষমতা রয়েছে এই দুই পরাশক্তির।

বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম পারমাণবিক শক্তির অধিকারী দেশ চীন দ্রুত তাদের সক্ষমতা বাড়িয়ে চলেছে। বেইজিংয়ের হাতে বর্তমানে প্রায় ৬২০টি পারমাণবিক ওয়ারহেড রয়েছে, যার একটি অংশ প্রস্তুত অবস্থায় রাখা হয়েছে। এ ছাড়া নিজেদের ‘নিউক্লিয়ার ট্রায়াড’ শক্ত করতে বড় বিনিয়োগ করছে তারা। ইউরোপের দিকে তাকালে দেখা যায়, কেবল ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের নিজস্ব পারমাণবিক সমরাস্ত্র রয়েছে। ফ্রান্সের সংগ্রহে প্রায় ৩৭০টি এবং যুক্তরাজ্যের হাতে রয়েছে প্রায় ২২০টি ওয়ারহেড। এর পাশাপাশি ন্যাটোভুক্ত দেশ বেলজিয়াম, জার্মানি, ইতালি ও তুরস্কে মার্কিন পারমাণবিক বোমা এবং সম্প্রতি বেলারুশে রাশিয়ার কৌশলগত পারমাণবিক অস্ত্র মোতায়েন করা হয়েছে।

দক্ষিণ এশিয়ার চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দুই প্রতিবেশী ভারত ও পাকিস্তানের পারমাণবিক প্রতিযোগিতা এই অঞ্চলের জন্য সার্বক্ষণিক উদ্বেগের কারণ। ভারতের হাতে বর্তমানে প্রায় ১৯০টি এবং পাকিস্তানের হাতে ১৭০টির মতো ওয়ারহেড রয়েছে। দুটি দেশই তাদের পারমাণবিক ভাণ্ডার আধুনিকায়নে নিয়মিত কাজ করছে।

অন্যদিকে, পারমাণবিক ক্লাবের সর্বকনিষ্ঠ সদস্য উত্তর কোরিয়া ইতোমধ্যেই অন্তত ৬০টি পরমাণু ওয়ারহেড তৈরি করেছে, যা তারা দূরপাল্লার ব্যালাস্টিক মিসাইলে যুক্ত করতে সক্ষম বলে দাবি করে। আর মধ্যপ্রাচ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে অস্বীকার করলেও ইসরায়েলের হাতে আনুমানিক ৮০ থেকে ৯০টি পরমাণু বোমা রয়েছে বলে ধরে নেওয়া হয়। ৮১ বছর আগে হিরোশিমা ও নাগাসাকির ট্র্যাজেডি যে মর্মান্তিক বার্তা বিশ্বকে দিয়েছিল, বর্তমানের এই বিশাল পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা দেখায় যে, বিশ্বশান্তি ও মানব অস্তিত্ব এখনো এক মারাত্মক সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে আছে।

মন্তব্য করুন