হরমুজ প্রণালীর বিকল্প খুঁজছে বাগদাদ

প্রকাশ: রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬, ১১:৪৯ পূর্বাহ্ণ
হরমুজ প্রণালীর বিকল্প খুঁজছে বাগদাদ

অনলাইন ডেস্ক:  বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ তেল উৎপাদনকারী দেশ ইরাক অপরিশোধিত তেল রফতানির ক্ষেত্রে হরমুজ প্রণালীর ওপর একক নির্ভরশীলতা কমাতে একটি বড় ধরনের কৌশলগত পদক্ষেপ নিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান অস্থির ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিকে বিবেচনায় নিয়ে দেশটি তুরস্ক ও সিরিয়া হয়ে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে একটি নতুন তেল রফতানি করিডোর তৈরির মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, ইরাকের দক্ষিণাঞ্চলীয় তেলসমৃদ্ধ বসরা প্রদেশ থেকে উত্তরাঞ্চলের কিরকুক হয়ে তুরস্কের ভূমধ্যসাগরীয় সিহান (জেইহান) বন্দর এবং সেখান থেকে সিরিয়ার বানিয়াস উপকূল পর্যন্ত একটি দীর্ঘ ও কৌশলগত তেল পাইপলাইন নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাই করছে বাগদাদ।

গত শনিবার (১৮ জুলাই) যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন সফরকালে ইরাকি সংবাদ সংস্থাকে (আইএনএ) দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে এই মেগা প্রজেক্টের তথ্য নিশ্চিত করেছেন ইরাকের তেলমন্ত্রী বাসিম মোহাম্মদ খুদাইর।

সাক্ষাৎকারে ইরাকের তেল রফতানির ভবিষ্যৎ রণকৌশল তুলে ধরে বাসিম মোহাম্মদ খুদাইর বলেন:

"ইরাকের তেল মন্ত্রণালয়ের বর্তমান সুস্পষ্ট লক্ষ্য হলো তেল রফতানির পথকে বৈচিত্র্যময় করা এবং কোনো নির্দিষ্ট একক রুট বা শুধু হরমুজ প্রণালীর ওপর নির্ভরশীল না থাকা।"

মার্কিন ও কাতারি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে চুক্তি: ইরাকি তেলমন্ত্রী জানান, এই বৃহৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রাথমিক ধাপ হিসেবে ইতিমধ্যে বিশ্ববিখ্যাত মার্কিন জ্বালানি প্রতিষ্ঠান শেভরন (Chevron), টিই ক্যাপিটাল (TE Capital) এবং কাতারের ইউসিসি (UCC)-কে নিয়ে গঠিত একটি শক্তিশালী আন্তর্জাতিক কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারক (MoU) সই করেছে ইরাক। বর্তমানে বসরা থেকে কিরকুক পর্যন্ত পাইপলাইন চালুর বিস্তারিত সমীক্ষা চলছে, যা পরবর্তীতে তুরস্কের সিহান বন্দর এবং সিরিয়ার উপকূলীয় শহর বানিয়াস পর্যন্ত সম্প্রসারণ করা হবে।

বানিয়াস বন্দরের কৌশলগত গুরুত্ব: উত্তর-পশ্চিম সিরিয়ার ভূমধ্যসাগর উপকূলে অবস্থিত বানিয়াস শহরটি দেশটির অন্যতম প্রধান তেল শোধনাগার এবং বৃহৎ তেল রফতানি টার্মিনালের মূল কেন্দ্র। অতীতেও কিরকুক থেকে স্থলপথে ইরাকি অপরিশোধিত তেল ভূমধ্যসাগরে পৌঁছানোর জন্য একটি প্রথাগত পাইপলাইন ব্যবহৃত হতো। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে কয়েক দশকের যুদ্ধ, সিরিয়ার ওপর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এবং দীর্ঘদিনের অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির কারণে সেই ঐতিহাসিক পাইপলাইনটি বর্তমানে প্রায় সম্পূর্ণ অকার্যকর হয়ে পড়েছে। বাগদাদ এখন নতুন প্রযুক্তিতে এটি পুনরুজ্জীবিত করতে চায়।

হরমুজের বিকল্প কেন জরুরি? পেট্রোলিয়াম রপ্তানিকারক দেশগুলোর সংস্থা ওপেকের (OPEC) দ্বিতীয় বৃহত্তম তেল উৎপাদক দেশ ইরাক। তবে ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতার কারণে দেশটিকে তাদের উৎপাদিত তেলের সিংহভাগই পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্ববাজারে পাঠাতে হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও পশ্চিমাদের সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার ক্রমাগত আশঙ্কায় ইরাক চরম অর্থনৈতিক ঝুঁকিতে পড়েছে।

জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, বসরা-কিরকুক-সিহান-বানিয়াস পাইপলাইন প্রকল্প চূড়ান্তভাবে বাস্তবায়িত হলে ইরাক শুধু ভৌগোলিক ঝুঁকিই এড়াবে না, বরং ভূমধ্যসাগরের জলসীমা ব্যবহার করে ইউরোপসহ পশ্চিমা আন্তর্জাতিক বাজারে অনেক বেশি নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও স্থিতিশীলভাবে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারবে। এ ছাড়া এই প্রজেক্ট মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক জ্বালানি রাজনীতি ও আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে একটি নতুন কৌশলগত ভারসাম্য তৈরি করবে।

মন্তব্য করুন