মার্কিন অর্থনৈতিক চাপ ও নিষেধাজ্ঞা: ইরান কি নতিস্বীকার করবে?
অনলাইন ডেস্ক: ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার বহুল আলোচিত ৬০ দিনের অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি তথা ‘ইসলামাবাদ চুক্তি’র মেয়াদ আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো সমাধান ছাড়াই শেষ হয়েছে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী শান্তির সম্ভাবনা আবারও গভীর অনিশ্চয়তায় পড়ে গেল। মেয়াদ শেষ হওয়ার পরপরই ট্রাম্প প্রশাসন তেহরানের ওপর নতুন করে সর্বাত্মক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও সামুদ্রিক বা নৌ অবরোধ জোরদার করার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা শুরু করেছে।
মার্কিন প্রশাসনের প্রধান লক্ষ্য হলো— নতুন শর্তে ইরানকে মার্কিন স্বার্থের অনুকূলে দরকষাকষিতে বাধ্য করা। তবে কয়েক দশকের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, বর্তমান দেশের অস্থিতিশীল অর্থনীতি এবং ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে প্রশ্ন উঠে এসেছে, কেবল অতিরিক্ত অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করেই কি ইরানকে চুক্তিতে আনা সম্ভব?
কী ছিল ‘ইসলামাবাদ চুক্তি’তে?
গত ১৭ জুন পাকিস্তান ও কাতারের মধ্যস্থতায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরানি প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ১৪ দফার এই নথিতে স্বাক্ষর করেছিলেন। চুক্তির মূল লক্ষ্য ছিল ৬০ দিনের এই সাময়িক বিরতিকে কাজে লাগিয়ে উভয় দেশের দীর্ঘদিনের বৈরিতা— বিশেষ করে ইরানের বিতর্কিত পারমাণবিক কর্মসূচি, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, সংঘাতপূর্ণ মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে দুই দেশের সামরিক উপস্থিতি এবং গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী সচল রাখার মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলোর স্থায়ী কূটনৈতিক সমাধান বের করা।
চুক্তির নীতি অনুযায়ী মার্কিন নিষেধাজ্ঞা শিথিলকরণ, বন্ধ হয়ে থাকা ইরানি তহবিল ফেরত দেওয়া এবং ইরান উপকূল থেকে মার্কিন সেনা হ্রাসের কথা থাকলেও দুই পক্ষের অনমনীয়তার কারণে কোনো অগ্রগতি হয়নি।
অর্থনৈতিক চাপ ও আন্তর্জাতিক বাস্তবতা:
যুক্তরাষ্ট্রের নতুন এই অর্থনৈতিক অভিযানের মূল স্তম্ভ হলো— ইরানের জ্বালানি ও তেলের বৈশ্বিক বাণিজ্যের পাশাপাশি দেশটির সামুদ্রিক বিমা, বিমান পরিষেবা এবং ব্যাংকিং খাতের ওপর শতভাগ কঠোর নিয়ন্ত্রণ আনা। বিশেষ করে চীনা স্বাধীন তেল শোধনাগারগুলোকে লক্ষ্য করে মার্কিন অর্থ দফতর দ্বিতীয় পর্যায়ের শাস্তিমূলক শুল্ক আরোপের প্রস্তুতি নিচ্ছে, কারণ ইরানের তেল রপ্তানির সিংহভাগই যায় চীনে।
আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল (আইএমএফ)-এর সাম্প্রতিক ডেটা অনুযায়ী, ইরানে বার্ষিক মুদ্রাস্ফীতি বর্তমানে প্রায় ৬৯ শতাংশে ঠেকেছে এবং চলতি বছর তাদের অর্থনীতি অন্তত ৬.১ শতাংশ সংকুচিত হতে পারে। স্থানীয় বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম অস্বাভাবিক হারে বাড়ায় সাধারণ ইরানিদের ক্রয়ক্ষমতা চরম বিপর্যয়ের মুখে।
ইরান কি সত্যিই নতিস্বীকার করবে?
মার্কিন অর্থ দফতরের দাবি, এমন সর্বাত্মক অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতা ইরানকে বিশ্ববাজার থেকে সম্পূর্ণরূপে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে ওয়াশিংটনের শর্ত মানতে বাধ্য করবে।
তবে সাবেক মার্কিন নিষেধাজ্ঞা কর্মকর্তা এবং আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশ এই মতবাদের সাথে একমত নন। তাঁদের মতে, আশির দশক থেকেই একের পর এক মার্কিন নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে টিকে থাকার দীর্ঘ অভ্যাস তৈরি করেছে তেহরান। তারা বিকল্প বা 'ছায়ানৌবহর' ব্যবহার করে নিজেদের জ্বালানি তেল ও আন্তর্জাতিক ব্যবসা চালু রাখার পথ রপ্ত করে নিয়েছে। ফলে কেবল অর্থনৈতিক অবরোধ বা হুমকি দিয়ে তেহরানের ক্ষমতাসীন নীতিনির্ধারকদের পুরোপুরি নিজেদের বশে আনা সম্ভব না-ও হতে পারে।
|