তারাকান্দায় ‘অ্যাকুয়াকালচার সেন্টার অব এক্সিলেন্স’ চালু: ফুডটেক বাংলাদেশের উদ্যোগ

প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬, ০৬:৫৬ অপরাহ্ণ
তারাকান্দায় ‘অ্যাকুয়াকালচার সেন্টার অব এক্সিলেন্স’ চালু: ফুডটেক বাংলাদেশের উদ্যোগ
ময়মনসিংহের তারাকান্দায় ‘অ্যাকুয়াকালচার সেন্টার অব এক্সিলেন্স’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ও খামার পরিদর্শন।

নিজস্ব প্রতিবেদক: ময়মনসিংহ দেশে টেকসই, প্রযুক্তিনির্ভর ও বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক মাছ চাষের ব্যাপক সম্প্রসারণের লক্ষ্যে ময়মনসিংহের তারাকান্দায় আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করেছে ‘অ্যাকুয়াকালচার সেন্টার অব এক্সিলেন্স’। মৎস্য খাতের নতুন ও অভিজ্ঞ উদ্যোক্তাদের আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া, ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ প্রদান এবং সামগ্রিক উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে ফুডটেক বাংলাদেশের উদ্যোগে এই কেন্দ্রের কার্যক্রম শুরু হয়েছে।

আজ মঙ্গলবার (২১ জুলাই) তারাকান্দা উপজেলার বানিহালা ইউনিয়নের মাঝিয়ালি গ্রামে এক বর্ণাঢ্য উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এতে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী, গবেষক, শিক্ষাবিদ ও স্থানীয় প্রান্তিক মৎস্যচাষিসহ প্রায় ২০০ জন অংশ নেন।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তারা জানান, বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অভ্যন্তরীণ মাছ উৎপাদনকারী দেশ। ২০২৪ অর্থবছরে দেশে প্রায় ৫০ লাখ টনের বেশি মাছ উৎপাদিত হলেও আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের রপ্তানি সম্ভাবনার তুলনায় আয় এখনো অনেক কম। তাই একক খামারের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিতকরণ এবং রপ্তানি সক্ষমতা বাড়াতে আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে ২০২২ সালে নেদারল্যান্ডস সরকারের সহায়তায় পাঁচ বছর মেয়াদি ‘ফুডটেক বাংলাদেশ’ কর্মসূচি শুরু হয়। লারিভ ইন্টারন্যাশনাল ও লাইটক্যাসল পার্টনার্সের যৌথ বাস্তবায়নে পরিচালিত এ কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশ ও নেদারল্যান্ডসের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে প্রযুক্তি হস্তান্তর, ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ, পরীক্ষামূলক নিবিড় চাষ ও আন্তর্জাতিক বাজারসংযোগ উন্নয়নে সমন্বিতভাবে কাজ করছে।

অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে নিযুক্ত নেদারল্যান্ডসের রাষ্ট্রদূত জরিস ভ্যান বোমেল বলেন, "বাংলাদেশ ইতিমধ্যে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ মাছ উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে সম্মানজনক অবস্থান তৈরি করেছে। তবে একক জমির উৎপাদনশীলতা, প্রোটিনের গুণগত মান এবং টেকসই আধুনিক মৎস্য চাষে আরও উন্নতির বিশাল সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশ ও নেদারল্যান্ডসের যৌথ উদ্যোগে আধুনিক ইউরোপীয় প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন ব্যবহার করে প্রান্তিক চাষীদের উৎপাদন ও আয় বহুগুণ বাড়ানো সম্ভব।"

রাষ্ট্রদূত আরও বলেন, "উৎপাদিত মাছের গুণগত মান আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা গেলে বাংলাদেশের জন্য বৈশ্বিক পরিসরে নতুন নতুন রপ্তানি বাজার সৃষ্টি হবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারেও বাংলাদেশি মাছের ভালো মূল্য পাওয়া যাবে। এই অ্যাকুয়াকালচার সেন্টার প্রকল্পটি সেই লক্ষ্য অর্জনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।"

সীমিত জমি ও প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহার করেও কীভাবে সর্বোচ্চ উৎপাদনশীলতা অর্জন করা সম্ভব, নেদারল্যান্ডস তা বিশ্বমঞ্চে করে দেখিয়েছে বলে মন্তব্য করেন মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক খালেদ কনক। তিনি বলেন, "বাংলাদেশ এই ডাচ অভিজ্ঞতা থেকে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা নিতে পারে এবং কীভাবে কম সম্পদ ব্যবহার করে অধিক নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন করা যায়, সে বিষয়ে নতুন করে কার্যকর পরিকল্পনা সাজাতে পারে। দেশের মৎস্য অধিদপ্তর গবেষক, বেসরকারি খাতের তরুণ উদ্যোক্তা এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের সার্বিক সহায়তা প্রদানে সর্বদা প্রস্তুত।"

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মূল পর্ব শেষে আমন্ত্রিত অতিথি ও খামারিরা ‘অ্যাকুয়াকালচার সেন্টার অব এক্সিলেন্স’ এর প্রজেক্ট এলাকা ঘুরে দেখেন। সেখানে ইন-পন্ড রেসওয়ে সিস্টেম (IPRS) ও রিসার্কুলেটিং অ্যাকুয়াকালচার সিস্টেম (RAS) প্রযুক্তির ব্যবহারিক কার্যকারিতা তুলে ধরা হয়। প্রদর্শনীতে দেখানো হয়, আধুনিক এসব প্রযুক্তির সাহায্যে একই পানি বারবার প্রক্রিয়াজাত করে পুনর্ব্যবহারের মাধ্যমে কম জায়গায় আগের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি মাছ উৎপাদন করা সম্ভব, পাশাপাশি পানি ও দামি খাবারের অপচয়ও অনেকাংশে কমে যায়।

প্রকল্প এলাকা পরিদর্শনকালে তারাকান্দার বালিয়া গ্রামের অভিজ্ঞ মাছচাষি মাহবুব আলম বলেন, "আমি দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে মাছ চাষের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। আধুনিক এই ডাচ প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় অনেক বেশি ঘনত্বের মধ্যে নিরাপদে মাছ চাষ করা সম্ভব। এটি আমাদের এলাকায় এখনো খুব বেশি বিস্তৃত হয়নি। প্রযুক্তিটি সর্বস্তরে সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী করা গেলে সাধারণ খামারিরা অনেক বেশি লাভবান হতে পারবেন।"

একই সময়ে প্রায় ৩০ বছর ধরে মাছ চাষ করা মোহাম্মদ নুরুল আমিন খান নামের আরেক খামারি বলেন, "বর্তমানে বাজারে কৃত্রিম মাছের খাবারের দাম প্রচণ্ড বেড়েছে, কিন্তু সেই অনুপাতে বাজারে মাছের দাম বাড়ছে না। ফলে প্রচলিত সেকেলে পদ্ধতিতে চাষ করে লাভের মুখ দেখা কঠিন হয়ে পড়েছে। নতুন এই প্রযুক্তিতে কম জায়গায় অনেক বেশি উৎপাদন সম্ভব এবং একই পানি বারবার ব্যবহার করা যায়। তাই এটি খামারিদের জন্য খুবই লাভজনক হবে।"

আয়োজক সূত্রে জানা গেছে, ফুডটেক বাংলাদেশের এই প্রকল্পের আওতায় ইতিমধ্যে দেশে ৬০টির বেশি আন্তর্জাতিক মানের প্রদর্শনী কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে। অনলাইন ও সরাসরি ক্লাসের মাধ্যমে প্রায় ১,৪০০ মৎস্যচাষিকে আধুনিক প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে। পাশাপাশি আধুনিক খামার ব্যবস্থাপনায় ‘অ্যাকুয়া কোচ’ নামে একটি বিশেষ ডিজিটাল মোবাইল অ্যাপও ব্যবহার করছেন চাষিরা।

অনুষ্ঠানের সমাপনীতে ফিশটেক লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ তারেক সরকার বলেন, "বাংলাদেশে মাছ চাষের জন্য নির্ধারিত আবাদি জমি দিন দিন কমে আসছে, অথচ জনসংখ্যার অনুপাতে আমিষ ও মাছের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। তাই ভবিষ্যতের জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রযুক্তিনির্ভর ও যান্ত্রিক মৎস্য চাষের কোনো বিকল্প নেই। অ্যাকুয়াকালচার সেন্টার অব এক্সিলেন্সের মাধ্যমে আধুনিক প্রযুক্তি ছড়িয়ে দিয়ে স্বল্প জায়গায় কম সময়ে আন্তর্জাতিক মানের মাছ উৎপাদনের লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছে।"

তিনি আরও যোগ করেন, "শুধুমাত্র মাছের উৎপাদন বাড়ালেই চলবে না, আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশি মাছ রপ্তানির জন্য আন্তর্জাতিক কোয়ালিটি স্ট্যান্ডার্ড ও গুড অ্যাকুয়াকালচার প্র্যাকটিস (GAP) নিশ্চিত করতে হবে। আগামী তিন বছরে প্রায় এক হাজার মাছচাষিকে এ বিষয়ে সরাসরি প্রশিক্ষণ দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে।"

ফিশটেক বাংলাদেশ লিমিটেডের চেয়ারম্যান খন্দকার ফরহাদ হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই উদ্বোধনী কর্মসূচিতে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মৎস্য অধিদপ্তরের প্রশাসন শাখার পরিচালক এস এম রেজাউল করিম, ময়মনসিংহ বিভাগীয় পরিচালক নৃপেন্দ্র নাথ বিশ্বাস এবং ফিশটেক (বিডি) লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আতাউল করিম ভূঁইয়া প্রমুখ। এছাড়া লারিভ ইন্টারন্যাশনালের প্রকল্প ব্যবস্থাপক রজিয়ার বেকার এবং ফিশটেক বাংলাদেশের জ্যেষ্ঠ কারিগরি কর্মকর্তা ইমরান হোসেন ও সহকারী ব্যবস্থাপক আরিফুল ইসলাম প্রকল্পবিষয়ক বিশেষ উপস্থাপনা প্রদান করেন।

মন্তব্য করুন