‘আয়নাঘর’ পরিদর্শনে যাবেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের ৩ বিচারক
আইন-আদালত প্রতিবেদক
ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে অন্যায়ভাবে গুমের শিকার হাজারও মানুষকে আটকে রেখে নির্যাতন চালানোর অভিযোগ ওঠা বিভিন্ন গোপন বন্দিশালা বা ‘আয়নাঘর’ সরেজমিনে পরিদর্শন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তিনজন সম্মানিত বিচারক।
আজ মঙ্গলবার (২১ জুলাই) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিশেষ শুনানি শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে চিফ প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট মো. আমিনুল ইসলাম এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের কথা নিশ্চিত করেন।
যে তিন বিচারক সরজমিনে ‘আয়নাঘর’ পরিদর্শনে যাবেন তাঁরা হলেন—আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদার, বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ এবং বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন টিমের আবেদনের পুঙ্খানুপুঙ্খ শুনানি শেষে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ বিচারকদের সরাসরি পরিদর্শনের এই অনুমতি ও সম্মতি জ্ঞাপন করেন।
আবেদনের পেছনের প্রেক্ষাপট ও আইনি গুরুত্ব তুলে ধরে চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেন, "বিগত স্বৈরাচারী শাসনের আমলে বাংলাদেশে অগণিত মানুষ ভয়াবহ গুমের শিকার হয়েছেন। গুমের শিকার এসব নিরপরাধ ব্যক্তিদের দিনের পর দিন নির্জন ‘আয়নাঘর’ নামের গোপন বন্দিশালা, যৌথ জিজ্ঞাসাবাদ সেল (জেআইসি) কিংবা টাস্কফোর্স ইন্টারোগেশন (টিএফআই) সেলে আটকে রেখে নির্যাতন চালানো হতো।"
কোন কোন গোপন বন্দিশালা পরিদর্শনের আবেদন করা হয়েছে—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে সুনির্দিষ্ট কিছু জায়গার নাম উল্লেখ করে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, "কচুক্ষেত সেনানিবাসের ভেতরে অবস্থিত ডিজিএফআই (ডিফেন্স ইন্টেলিজেন্স) কমপ্লেক্সের ভেতরের একটি প্রধান আয়নাঘর, র্যাব-১ কার্যালয়ে অবস্থিত একটি টিএফআই সেল এবং ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কার্যালয়ের অভ্যন্তরে থাকা গোপন সেল। এ রকম যে কয়টি আলোচিত আয়নাঘর বা গোপন নির্যাতন কেন্দ্র রয়েছে, বিচারিক স্বার্থে সেগুলো সরেজমিনে পরিদর্শন করার জন্য আমরা মাননীয় ট্রাইব্যুনাল-১ এ প্রাতিষ্ঠানিক আবেদন জানাই।"
ঘটনাস্থল সরেজমিনে পরিদর্শনের আন্তর্জাতিক ও দেশীয় আইনগত বৈধতা প্রসঙ্গে বিভিন্ন নজির তুলে ধরে তিনি বলেন, "আমাদের দেশীয় প্রচলিত আইন অর্থাৎ ডোমেস্টিক ল-এর ৫৩৯-বি ধারায় বিচারকদের ঘটনাস্থল পরিদর্শনের স্পষ্ট বিধান রয়েছে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের রোম স্ট্যাটিউটের রুল ৭ এবং রুল ৭৩-তেও এই আইনি এখতিয়ার দেওয়া হয়েছে যে, মামলার ন্যায়বিচারের স্বার্থে বিচারক মহোদয়গণ যেকোনো ক্রাইম সিন বা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করতে পারেন।"
সারা বিশ্বজুড়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের নজির টেনে চিফ প্রসিকিউটর আরও যোগ করেন, "অতীতে রুয়ান্ডা ট্রাইব্যুনাল এবং সাবেক যুগোস্লাভিয়া ট্রাইব্যুনালে সংঘটিত দুটি গণহত্যার ঘটনায় বিজ্ঞ বিচারকগণ সরেজমিনে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছিলেন এবং পরবর্তীতে সেই পরিদর্শন প্রতিবেদন মেমোরেন্ডাম হিসেবে গ্রহণ করে মূল বিচারে ব্যবহার করা হয়েছিল। আমরা মাননীয় ট্রাইব্যুনালের কাছে সেই বৈশ্বিক নজিরগুলো তুলে ধরেছি।"
প্রসিকিউশনের সেই আবেদনটি আদালত মঞ্জুর করেছেন জানিয়ে তিনি বলেন, "ট্রাইব্যুনাল-১ আনুষ্ঠানিক সম্মতি দিয়েছেন। ট্রাইব্যুনালের তিন বিচারক যেকোনো দিন আমাদের দিন-তারিখ নির্ধারণ করে দেবেন। এরপরই ‘আয়নাঘর’ নামের ওই ক্রাইম সিনগুলো তারা সরাসরি সরেজমিনে গিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করবেন।"
পরবর্তী পরিদর্শনের মূল আইনি প্রক্রিয়া সম্পর্কে তিনি বলেন, "এই পরিদর্শনের জন্য ট্রাইব্যুনাল থেকে আমাদের নোটিশ করা হবে। একই সঙ্গে যদি আসামিপক্ষের আইনজীবীরা সেখানে যেতে চান, তবে তাদেরকেও নোটিশ প্রদান করা হবে এবং উভয় পক্ষের সমন্বয়ে একটি যৌথ পরিদর্শনের মাধ্যমে সেই আইনি কার্যক্রমটি সম্পন্ন হবে।
|