এআই চ্যাটবটে তথ্যের পুনরাবৃত্তি: নলেজ কল্যাপ্স ও জ্ঞানের বৈচিত্র্য কমার ঝুঁকি

প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:২১ অপরাহ্ণ
এআই চ্যাটবটে তথ্যের পুনরাবৃত্তি: নলেজ কল্যাপ্স ও জ্ঞানের বৈচিত্র্য কমার ঝুঁকি

অনলাইন ডেস্ক: প্রাত্যহিক কাজের পাশাপাশি যেকোনো তথ্য অনুসন্ধানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই চ্যাটবটের ওপর বিশ্বজুড়ে মানুষের নির্ভরতা দিন দিন বাড়ছে। তবে এই অতিরিক্ত প্রযুক্তি-নির্ভরতা ব্যবহারকারীদের নির্দিষ্ট কিছু তথ্য ও একমুখী দৃষ্টিভঙ্গির গণ্ডিতে আটকে দিচ্ছে বলে মারাত্মক হুঁশিয়ারি দিয়েছেন গবেষকরা। এর ফলে ভবিষ্যতে ‘নলেজ কল্যাপ্স’ (Knowledge Collapse) বা সার্বিক জ্ঞানের বৈচিত্র্য সংকুচিত হয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।

সম্প্রতি ডেনমার্কের কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্বে পরিচালিত এক গবেষণায় এমন আশঙ্কাজনক চিত্র উঠে এসেছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির এক প্রতিবেদনে গবেষণার বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়।

গবেষণাকালে বিজ্ঞানিরা বিশ্বের ১২টি দেশের প্রেক্ষাপট সম্পর্কিত ১৫৫টি পৃথক বিষয়ে মোট ২৭টি শীর্ষস্থানীয় লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল (এলএলএম) পরীক্ষা করেন। এ সময় প্রায় ১৭ লাখ লিখিত উত্তর এবং ৭ কোটি স্বতন্ত্র তথ্য-দাবি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা হয়। এতে দেখা যায়, সবকটি প্রচলিত চ্যাটবটই সাধারণ সার্চ ইঞ্জিনের (যেমন গুগল সার্চ) তুলনায় অত্যন্ত সীমিত ও কাছাকাছি ধাঁচের উত্তর প্রদান করেছে। অর্থাৎ, একই প্রশ্ন বারবার ভিন্নভাবে করা হলেও ব্যবহারকারী ঘুরেফিরে একই দৃষ্টিভঙ্গি ও তথ্য পেতে থাকেন।

পরীক্ষা করা এআই মডেলগুলোর মধ্যে প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান ওপেনএআই-এর ‘জিপিটি-৫’ তুলনামূলকভাবে সবচেয়ে বেশি বৈচিত্র্যময় তথ্য উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়েছে। তা সত্ত্বেও সাধারণ সার্চ ইঞ্জিনের ফলাফলের সঙ্গে তুলনা করলে জিপিটি-৫-এর তথ্যের বৈচিত্র্য অন্তত ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ কম ছিল।

গবেষকদের মতে, ‘তথ্যের সংকীর্ণ পরিধি’ বলতে চ্যাটবটের উত্তরের আকার ছোট হওয়াকে বোঝায় না। বরং এগুলো বহুবিধ উৎস, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও ভিন্ন ভিন্ন মতামত তুলে ধরার বদলে একটি নির্দিষ্ট ধারার দাবি ও মতামতকে বার বার সামনে নিয়ে আসছে।

গবেষণার প্রধান লেখক ডাস্টিন রাইট জানান, এআই চ্যাটবটগুলো শুধু তথ্য খোঁজার মাধ্যমকেই বদলে দিচ্ছে না, বরং সাধারণ মানুষ কোন কোন তথ্য জানার সুযোগ পাবে, পরোক্ষভাবে সেটির ওপরও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করছে।

ভবিষ্যতে নতুন এআই মডেল প্রশিক্ষণের সময় পূর্ববর্তী এআই দিয়ে তৈরি কন্টেন্টের ওপর নির্ভরতা বাড়লে এ পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করতে পারে। আগে থেকেই কম বৈচিত্র্যপূর্ণ তথ্য দিয়ে তৈরি লেখা যখন পরবর্তী প্রজন্মের এআই প্রশিক্ষণে ব্যবহৃত হবে, তখন তথ্যের গভীরতা ক্রমশ তলানিতে ঠেকবে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে তা সার্বিক মানব সভ্যতার জন্য ‘নলেজ কল্যাপ্স’ ডেকে আনবে।

তবে গবেষণায় একটি ইতিবাচক দিকও দেখা গেছে— তুলনামূলক ছোট কিছু মডেল এবং নতুন সংস্করণগুলো পুরোনোর চেয়ে কিছুটা বেশি বৈচিত্র্যময় উত্তর দিতে পেরেছে। কিন্তু কোনো মডেলই ঐতিহ্যবাহী সার্চ ইঞ্জিনের মতো কোটি কোটি ওয়েবসাইটের বহুধা বিস্তৃত তথ্যের সমাহার পুরোপুরি এনে দিতে ব্যর্থ হয়েছে।

এই সংকট এড়াতে গবেষকদের পরামর্শ, চ্যাটবটকে কখনোই তথ্যের একমাত্র বা শেষ উৎস হিসেবে গ্রহণ করা উচিত নয়। বিশেষ করে শিক্ষার্থী, গবেষক ও নীতি নির্ধারকদের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত, পরীক্ষার পাঠ্যক্রম বা সরকারি সনদের নিয়মকানুন যাচাইয়ের ক্ষেত্রে অবশ্যই একাধিক সংবাদমাধ্যম, নির্ভরযোগ্য মূল ওয়েবসাইট, পাঠ্যবই এবং গ্রন্থাগারের শরণাপন্ন হতে হবে।

মন্তব্য করুন