সৌদিকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অনুমতি দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র: পরমাণু চুক্তির খসড়া

প্রকাশ: রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬, ০৫:৫১ অপরাহ্ণ
সৌদিকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অনুমতি দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র: পরমাণু চুক্তির খসড়া
সৌদি আরবের একটি তেল ও শিল্প অবকাঠামো এলাকা।

নিজস্ব প্রতিবেদক: সৌদি আরবকে তাদের নিজস্ব মাটিতেই ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের বিশেষ অনুমতি দিয়ে একটি যুগান্তকারী পারমাণবিক চুক্তির খসড়া চূড়ান্ত করেছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চূড়ান্ত অনুমোদন ও সই না মেলায় চুক্তিটি এখন ঝুলে আছে।

একটি গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ২০১৫ সালের অক্টোবরেই এই স্পর্শকাতর চুক্তির প্রাথমিক আলোচনা শেষ হয়েছিল। তবে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সাথে চলমান যুদ্ধ ও উত্তেজনাকর পরিস্থিতির কারণে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই চুক্তিতে সই করতে বিলম্ব করছেন বলে জানা গেছে। এর পাশাপাশি মার্কিন কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান উভয় দলের তীব্র বিরোধিতার মুখে পড়ার ভয়ও এর পেছনে অন্যতম কারণ হিসেবে কাজ করছে।

আন্তর্জাতিক পরমাণু বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ হলো মূলত পারমাণবিক বোমা বা পরমাণু অস্ত্র তৈরির মূল ও প্রধানতম উপায়। সাধারণত কোনো দেশ বেসামরিক বা শান্তিপূর্ণ কাজের জন্য প্রয়োজনীয় ইউরেনিয়াম নিজেরা উৎপাদন না করে অন্য পরমাণু শক্তিধর দেশ থেকে আমদানি করে থাকে। কিন্তু সৌদিকে এই স্পর্শকাতর প্রযুক্তি নিজেদের মাটিতেই ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, কঠোর আন্তর্জাতিক আইনি ফ্রেমওয়ার্ক না থাকলে এই শিথিল চুক্তির সুযোগ নিয়ে সৌদি আরব খুব সহজেই পরমাণু অস্ত্র তৈরির গোপন পথ পেয়ে যেতে পারে। এর আগে স্বয়ং সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান স্পষ্ট করে বলেছিলেন, আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী ইরান যদি কখনো পরমাণু বোমা বানায়, তবে সৌদি আরবও ঠিক তা-ই করবে।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই বিশেষ খসড়া চুক্তিতে জাতিসংঘের পারমাণবিক নজরদারি সংস্থা (আইএইএ)-র কঠোর ও বাধ্যতামূলক তদারকির আন্তর্জাতিক নিয়মটি যুক্ত করা হয়নি। এর ফলে আন্তর্জাতিক এই সংস্থাটি চাইলেই সৌদির কোনো সন্দেহভাজন পরমাণু কেন্দ্র আকস্মিক পরিদর্শন বা পরীক্ষা করতে পারবে না। পুরো প্রক্রিয়াটি কেবল যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদির দ্বিপাক্ষিক বোঝাপড়া এবং অভ্যন্তরীণ চুক্তির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হবে।

এভিয়েশন ও পরমাণু বিশেষজ্ঞরা এর একটি নেতিবাচক তুলনা টেনে বলেছেন, ২০০৯ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) পরমাণু বোমার এই প্রযুক্তি অর্জনের লোভ ত্যাগ করে কঠোর আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে আমেরিকার সাথে চুক্তি করেছিল, যা পারমাণবিক সুরক্ষার ইতিহাসে ‘গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড’ বা আদর্শ নিয়ম হিসেবে বিশ্বজুড়ে সমাদৃত।

অনেকে মনে করছেন, সৌদির মাটিতে এই উন্নত প্রযুক্তি সরবরাহ করা অত্যন্ত বিপজ্জনক, কারণ তারা যেকোনো রাজনৈতিক সংকটে এই কেন্দ্র সম্পূর্ণ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। অন্যদিকে, এই চুক্তির পক্ষে থাকা মার্কিন লবিস্টদের যুক্তি হলো, এর মাধ্যমে আমেরিকার পরমাণু ব্যবসার একটি বিশাল আর্থিক লাভ হবে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র এই চুক্তি না করলে সৌদি আরব হয়তো বিকল্প হিসেবে রাশিয়া বা চীনের কাছ থেকে আরও সহজে এই স্বায়ত্তশাসিত প্রযুক্তি পেয়ে যাবে, যা ওয়াশিংটনের ভূ-রাজনীতির জন্য ক্ষতিকর।

তবে চুক্তির বিরোধিতাকারীরা একটি গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি বাণিজ্যিক ও কৌশলগত লাভের জন্য এভাবে আন্তর্জাতিক নিয়ম শিথিল করে পারমাণবিক চুক্তি সম্পন্ন করে, তবে অদূর ভবিষ্যতে বিশ্বজুড়ে পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ (নন-প্রলিফারেশন) করা সম্পূর্ণ অসম্ভব হয়ে পড়বে।

মন্তব্য করুন