চাকরি হারাচ্ছেন পুলিশের ৬৩ শীর্ষ কর্মকর্তা

প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৫৭ পূর্বাহ্ণ
চাকরি হারাচ্ছেন পুলিশের ৬৩ শীর্ষ কর্মকর্তা
বাংলাদেশ পুলিশ

নিজস্ব প্রতিবেদক: পলায়ন, নাশকতা সৃষ্টি, কর্মস্থলে অসদাচরণ এবং ক্ষমতার অপব্যবহারজনিত দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট অভিযোগে চাকরি হারাতে যাচ্ছেন পুলিশের বিভিন্ন স্তরের ৬৩ জন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। এদের বড় একটি অংশ বিভিন্ন জেলায় দায়িত্ব পালনকারী সাবেক পুলিশ সুপার (এসপি), ডিআইজি এবং অতিরিক্ত ডিআইজি পদমর্যাদার কর্মকর্তা।

ইতিমধ্যে ঢাকা জেলার সাবেক এসপি মো. আসাদুজ্জামানসহ ছয়জন কর্মকর্তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে। ২০২৪ ও ২০২৫ সালে দীর্ঘ সময় কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার অভিযোগে গঠিত বিভাগীয় মামলায় অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় সরকার এই কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। এছাড়া ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এদের অনেকের বিরুদ্ধেই ক্ষমতার চরম অপব্যবহারের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।

একের পর এক পুলিশ কর্মকর্তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করার বিষয়ে সরকার ও প্রশাসন বিশ্লেষক এবং বাংলাদেশ সরকারের সাবেক সচিব এ কে এম আব্দুল আউয়াল মজুমদার কালবেলাকে বলেন, “সরকার নিশ্চয়ই আইনকানুন মেনেই অপরাধী কর্মকর্তাদের বরখাস্তের সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে। এতে পুলিশ প্রশাসনে কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না। তবে বিচার করতে গিয়ে যেন কারও প্রতি অন্যায় করা না হয় সেদিকে সতর্ক থাকতে হবে। একজন সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে আমি চাইব যেন অবিচার না হয়। কিন্তু যারা রাজনৈতিক পরিচয়ে বেশি বাড়াবাড়ি করেছেন তাদের যেন শাস্তি হয়, সেটা নিশ্চিত করতে হবে।”

পলাতক যাদের চাকরি যাচ্ছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট থেকে পলাতক রয়েছেন এমন ৩৩ জনকে চাকরি থেকে চূড়ান্তভাবে বরখাস্তের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর বাইরেও গত দুই বছরে পলাতক থাকার দায়ে শতাধিক পুলিশ কর্মকর্তা চাকরি হারিয়েছেন।

চাকরি হারানোর প্রক্রিয়ায় থাকা শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছেন— রংপুরের সাবেক অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার (পুলিশ সুপার পদে পদোন্নতিপ্রাপ্ত) মো. শাহ নূর আলম পাটওয়ারী (যাঁর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে রায়ও ঘোষণা করা হয়েছে), সাবেক এসপি মো. আলী আশরাফ ভূঞা, রাজশাহী রেঞ্জের সাবেক পুলিশ সুপার জেসমিন কেকা ও আয়েশা সিদ্দিকা, চট্টগ্রামের রেঞ্জের সাবেক ডিআইজি নূরে আলম মিনা, ডিএমপির সাবেক ডিআইজি কাজী মনিরুজ্জামান এবং এ কে এম এহসানউল্লাহ।

এ ছাড়াও পলাতক তালিকার উল্লেখযোগ্যদের মধ্যে রয়েছেন— ডিআইজি বিপ্লব বিজয় তালুকদার, অতিরিক্ত ডিআইজি টুটুল চক্রবর্তী, মোহাম্মদ ফরিদ উদ্দিন, মো. আনিসুর রহমান, প্রলয় কুমার জোয়ারদার, সৈয়দ নুরুল ইসলাম, হাসানুজ্জামান মোল্যা, ডিএমপির সাবেক যুগ্ম পুলিশ কমিশনার এস এম মেহেদী হাসান, নারায়ণগঞ্জের সাবেক এসপি গোলাম মোস্তফা রাসেল, পুলিশ সুপার পদোন্নতিপ্রাপ্ত হাসান আরাফাত, গাজীপুর ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশের সাবেক এসপি মো. রহমত উল্লাহ চৌধুরী, লক্ষ্মীপুরের সাবেক এসপি মো. তারেক বিন রশিদ এবং ট্যুরিস্ট পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি শ্যামল কুমার মুখার্জী। এদের মধ্যে নারায়ণগঞ্জের সাবেক এসপি গোলাম মোস্তফা রাসেলকে বরখাস্তের আদেশ চূড়ান্ত করতে রাষ্ট্রপতির কাছে সার-সংক্ষেপ পাঠানো হয়েছে।

দ্বিতীয় কারণ দর্শানোর নোটিশ ও তদন্তাধীন মামলা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের সময় বেআইনিভাবে ছাত্রদের ওপর গুলি চালানো ও ক্ষমতার অপব্যবহারকারী এসব কর্মকর্তার অধিকাংশই বর্তমানে পার্শ্ববর্তী দেশ কিংবা আমেরিকা ও ইউরোপে পালিয়ে আছেন। বারবার কর্মস্থলে যোগদানের বার্তা দেওয়ার পরও তারা সাড়া দেননি। ফলে প্রথম দফার পর দ্বিতীয় দফায় কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে আরও ৯ কর্মকর্তাকে। তাঁরা হলেন— সাবেক আরপিএমপি রংপুরের রুবাইয়াত জামান, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এস এম জাহাঙ্গীর হাছান (সাময়িক বরখাস্ত), শাহ আলম মো. আখতারুল ইসলাম, ইফতেখারুল ইসলাম, ডিএমপির অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার রওশানুল হক সৈকত, এস এম শামীম, সহকারী পুলিশ কমিশনার মফিজুর রহমান পলাশ, মোহাম্মদ ইমরুল এবং নাহিদ ফেরদৌস। গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যমতে, এদের কেউই দেশে নেই এবং কেউ কেউ সরকারবিরোধী নানা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছেন।

বর্তমানে ঢাকা হাইওয়ে পুলিশের সাবেক অ্যাডিশনাল ডিআইজি মীর মোদাচ্ছের হোসেন, গাইবান্ধার সাবেক এসপি মো. কামাল হোসেন, পুলিশ অধিদপ্তরের অ্যাডিশনাল ডিআইজি মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম, ডিএমপির উপ-কমিশনার মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন এবং গাইবান্ধা পিবিআইর সাবেক এসপি রাজীব ফরহানের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলার বিভিন্ন ধাপ চলমান রয়েছে।

নাশকতা ও অসদাচরণের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ সামগ্রিক কার্যক্রমে শৃঙ্খলাভঙ্গের দায়ে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে:

  • নাশকতার অভিযোগ: সাময়িক বরখাস্তকৃত এবং বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীতে সংযুক্ত মুহাম্মদ মেহেদী হাসান, মো. ফখরুল আলম এবং সৈয়দ ইফতেহার আলীর বিরুদ্ধে নাশকতা সৃষ্টির অভিযোগে বিভাগীয় মামলা ও পুনঃতদন্ত চলছে।

  • অসদাচরণ ও দুর্নীতি: ঠাকুরগাঁও ইন-সার্ভিস ট্রেনিং সেন্টারের সাবেক কমান্ড্যান্ট (পুলিশ সুপার) এস এম ফজলুল হক, রংপুরের সাবেক উপ-পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ শিবলী কায়সার, কক্সবাজারের সাবেক এসপি মুহাম্মদ রহমত উল্লাহ এবং ডিএমপির সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ অসদাচরণ ও দুর্নীতির অভিযোগে বরখাস্তের অপেক্ষায় রয়েছেন।

জুলাই-আগস্টে চলা গণহত্যার সঙ্গে সরাসরি জড়িত থাকার কারণে অনেক কর্মকর্তার বিভাগীয় মামলা সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চূড়ান্ত রায়ের পর তাদের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। অভিযুক্তদের চূড়ান্ত বরখাস্তের আগে সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) মতামত এবং রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের অনুমোদন নিতে হচ্ছে।

এদিকে, সাম্প্রতিক পদক্ষেপে চাকরি থেকে বরখাস্ত হওয়া ছয় কর্মকর্তা হলেন— ঢাকা জেলার সাবেক পুলিশ সুপার (এসপি) মো. আসাদুজ্জামান, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পলাশ রঞ্জন দে, পুলিশ সুপার মোহাম্মদ ছানোয়ার হোসেন, অতিরিক্ত ডিআইজি মোহাম্মদ জায়েদুল আলম, অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার রাজীব দাস এবং সাবেক পুলিশ সুপার আরিফুর রহমান মণ্ডল।

মন্তব্য করুন