ময়লার ভাগাড় থেকে দৃষ্টিনন্দন বাগান 'রূপান্তর': প্রশংসায় প্রধানমন্ত্রী

প্রকাশ: রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ০২:৪৫ অপরাহ্ণ
ময়লার ভাগাড় থেকে দৃষ্টিনন্দন বাগান 'রূপান্তর':  প্রশংসায় প্রধানমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক: একসময় যা ছিল দুর্গন্ধময় বর্জ্যের বিশাল পাহাড়, চারপাশের বিষাক্ত পরিবেশ আর নিত্যদিনের যাতায়াতকারী কোটি মানুষের চরম দুর্ভোগের কারণ—দুই দশকের সেই সুপরিচিত নারকীয় দৃশ্যপট বদলে আজ সেখানে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে হাজার হাজার সবুজ তরুলতা ও শোভাবর্ধক উদ্ভিদ। ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের আমিনবাজার থেকে হেমায়েতপুর পর্যন্ত প্রায় চার কিলোমিটার এলাকাজুড়ে গড়ে তোলা হয়েছে নান্দনিক পরিবেশবান্ধব বাগান ‘রূপান্তর’।

দীর্ঘদিনের এই বিষাক্ত বর্জ্যস্তূপকে মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে আধুনিক ও মনোরম সবুজে রূপান্তর করার অবিশ্বাস্য উদ্যোগকে দেশের অন্য সব জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) জন্য এক অনন্য অনুকরণীয় উদাহরণ হিসেবে অভিহিত করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে এই ঐতিহাসিক পরিবেশগত সাফল্যের জন্য তিনি ঢাকা জেলা প্রশাসক ফরিদা খানমসহ সাভার উপজেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট সব কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিশেষ ধন্যবাদ জানান।

রবিবার (১৮ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ১১টায় আমিনবাজার এলাকায় একটি নিমগাছের চারা রোপণের মাধ্যমে বহুপ্রতীক্ষিত ‘রূপান্তর’ প্রকল্পের শুভ আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “সঠিক পরিকল্পনা, সময়োপযোগী পদক্ষেপ ও সদিচ্ছা থাকলে একটি অবহেলিত ও দূষিত এলাকাকে জনকল্যাণে কীভাবে সুন্দরভাবে পরিবর্তন করা যায়—আমিনবাজারের এই অনন্য উদ্যোগ তার চমৎকার প্রমাণ। আপনারা যারা স্থানীয় এলাকাবাসী, তারা ভালো করেই জানেন দুই মাস আগেও এই গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কের কী দুর্বিষহ অবস্থা ছিল। অথচ মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে দৃশ্যপট কতটা পাল্টে গেছে! এখন এই চার কিলোমিটার এলাকার মানুষ সুন্দর পরিবেশ দেখার পাশাপাশি বিষমুক্ত বাতাসে স্বস্তির নিশ্বাস নিতে পারছেন।”

বক্তব্যের সময় প্রধানমন্ত্রী এই অর্জিত সবুজ সৌন্দর্য টিকিয়ে রাখতে স্থানীয় জনগণের সরাসরি সহযোগিতার ওপর তাগিদ দেন। তিনি মহাসড়ক সংলগ্ন শিল্প-কারখানার মালিকদের সঙ্গে সমন্বয় করে ফাঁকা জায়গাগুলোর নিয়মিত পরিচর্যার দায়িত্ব তাদের ওপর ভাগ করে দিতে জেলা প্রশাসককে পরামর্শ দেন। একই সঙ্গে অঞ্চলটিকে স্থায়ীভাবে বর্জ্যমুক্ত ও শতভাগ পরিবেশবান্ধব রাখতে স্থানীয় সংসদ সদস্যদের সার্বিক সহায়তার আহ্বান জানান।

প্রসঙ্গক্রমে প্রধানমন্ত্রী বিশেষভাবে উল্লেখ করেন, “ঢাকা জেলা প্রশাসক ফরিদা খানম এই অভিনব পরিবেশবান্ধব কাজের মাধ্যমে দেশের বাকি ৬৩ জেলার জেলা প্রশাসকদের সামনে এক চমৎকার ও দৃষ্টান্তমূলক পথ দেখিয়েছেন। আশা করি অন্য জেলার প্রশাসকেরাও নিজ নিজ এলাকায় এমন সবুজ উদ্যোগ নিতে উৎসাহিত হবেন।”

প্রশাসন সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, বিগত প্রায় দুই দশক ধরে রাজধানী ঢাকার আমিনবাজার সংলগ্ন এলাকায় মহাসড়কের পাশে অনিয়ন্ত্রিতভাবে ফেলা হাজার হাজার টন গৃহস্থালি ও শিল্প বর্জ্যে প্রায় ৩০ ফুট উঁচু এক বিশাল দুর্গন্ধময় ময়লার পাহাড় তৈরি হয়েছিল।

গত জুলাই মাসে মানিকগঞ্জের সিংগাইরে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ঐতিহ্যবাহী বর্ষাকালীন মহড়া পরিদর্শনে যাওয়ার পথে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্বয়ং এই ভয়াবহ বর্জ্যের ভাগাড় ও বাতাসের অসহনীয় দুর্গন্ধ প্রত্যক্ষ করেন। তিনি তাৎক্ষণিকভাবে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমকে এ বিষয়ে দ্রুত ও কার্যকর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার কড়া নির্দেশ দেন।

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার পরপরই ঢাকা জেলা প্রশাসক ফরিদা খানমের সার্বিক তত্ত্বাবধানে এবং সাভার উপজেলা পরিষদ ও সাভার পৌরসভার যৌথ সার্বক্ষণিক সহযোগিতায় টানা তিন মাসের পরিশ্রমে ওই এলাকার জমানো হাজার হাজার টন আবর্জনা পুরোপুরি অপসারণ করা হয়।

ময়লা পুরোপুরি সরানোর পর জমি পুনর্গঠন, ধস রোধে মাটির সুরক্ষায় দীর্ঘ প্যালাসাইডিং, পানি জমে থাকা বন্ধে ২০টি সারফেস ড্রেন ও একটি সার্ভিস শেড নির্মাণ করা হয়। মাটির ক্ষয় রোধের জন্য রোপণ করা হয় নেপিয়ার, দুর্বা ও বিন্নাসহ বিভিন্ন প্রজাতির শক্ত ঘাস।

প্রায় চার কিলোমিটার দীর্ঘ এবং ১০ থেকে ২৫ মিটার চওড়া এই সুবিন্যস্ত ‘রূপান্তর’ বাগানে ১,০৫০টি নিমগাছ, ৩,৮১৫টি সুপারি, ৬০টি ঐতিহ্যবাহী তালগাছ, ৬৫০টি মাধবীলতা, ৪৫টি সিজিয়াম ও ৭০০টি রঞ্জনসহ মোট ৬,৫৮৫টি নানা জাতের গাছ ও শোভাবর্ধক রোপণ করা হয়েছে।

শুধু গাছগাছালিই নয়, প্রকল্পটিকে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির মডেল বানাতে ২ কিলোওয়াট সোলার প্যানেল ও ১ কিলোওয়াট উইন্ড টারবাইনের মাধ্যমে নিজস্ব ৩ কিলোওয়াট সবুজ বিদ্যুৎ উৎপাদনের স্বয়ংসম্পূর্ণ ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়া রাতের বেলা যাতায়াতকারীদের নিরাপদ ভ্রমণ ও দৃষ্টিনন্দন আলোকসজ্জার জন্য স্থাপন করা হয়েছে ১২০টি আধুনিক বৈদ্যুতিক বাতি। এর ফলে রাজধানী ঢাকার মূল পশ্চিম প্রবেশমুখ আমিনবাজার এলাকাটি এখন পুরোপুরি দূষণমুক্ত, মনোরম ও নজরকাড়া সবুজ প্রান্তরে পরিণত হয়েছে।