কৃষি উন্নয়ন ও খাদ্যনিরাপত্তা জোরদার: ৭৯টি বীজ সংরক্ষণাগার নির্মাণ করছে বিএডিসি
অনক আলী হোসেন শাহিদী : কৃষকের হাতে সময়মতো মানসম্মত বীজ পৌঁছে দেওয়া, বীজ সংরক্ষণের সক্ষমতা বাড়ানো এবং কৃষিপণ্যের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির মাধ্যমে দেশের খাদ্যনিরাপত্তা ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের (বিএডিসি) চলমান ‘কৃষক পর্যায়ে বিএডিসির বীজ সরবরাহ কার্যক্রম জোরদারকরণ’ শীর্ষক বিশেষ প্রকল্পটি। কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রত্যক্ষ উদ্যোগে বাস্তবায়নাধীন এই প্রকল্পের আওতায় নির্ধারিত ৭৫টি বীজ সংরক্ষণাগারের মধ্যে ইতোমধ্যে ২৭টির নির্মাণকাজ সফলভাবে শেষ করে হস্তান্তর করা হয়েছে। চলতি বছরের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে মোট ৫০টি সংরক্ষণাগার নির্মাণ সম্পন্ন করে তা পুরোপুরি হস্তান্তরের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য রয়েছে। এছাড়া অবশিষ্ট ২৫টির নির্মাণকাজ আগামী ২০২৭ সালের মে মাসের মধ্যে শেষ করার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
মূল প্রকল্পের নির্ধারিত ৭৫টি বীজ সংরক্ষণাগারের বাইরে নতুন করে আরও চারটি বীজ সংরক্ষণাগার নির্মাণের প্রশাসনিক অনুমোদন দেওয়া হয়েছে এবং ইতোমধ্যে সেগুলোর নির্মাণকাজের কার্যাদেশও প্রদান করা হয়েছে। ফলে মূল প্রকল্পের নির্ধারিত স্থাপনাগুলোর পাশাপাশি নতুন এই চারটি নির্মিত হলে মোট ৭৯টি আধুনিক বীজ সংরক্ষণাগার গড়ে তোলার বিশাল সুযোগ সৃষ্টি হবে। প্রকল্পের সামগ্রিক ব্যয় সাশ্রয় এবং অবকাঠামোগত সক্ষমতা বৃদ্ধির এই যুগান্তকারী উদ্যোগ তৃণমূলের কৃষকের কাছে মানসম্মত বীজ সরবরাহের কার্যক্রমকে আরও বেশি গতিশীল করবে বলে জোরালো প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।
প্রকল্পটির প্রকল্প পরিচালক মো. মাহমুদুল আলম এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে গণমাধ্যমকে এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মাঠ পর্যায়ে প্রকল্পের ভূমি উন্নয়নের কাজ ইতিমধ্যে শতভাগ সম্পন্ন হয়েছে। পাশাপাশি সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ, আরসিসি রাস্তা তৈরি এবং মাঠপর্যায়ের বীজ ডিলারদের প্রশিক্ষণের কার্যক্রমও অত্যন্ত সন্তোষজনকভাবে এগিয়ে চলছে। প্রকল্পের বিভিন্ন নির্মাণকাজ সরেজমিনে পরিদর্শন করেও আশানুরূপ অগ্রগতির তথ্য পাওয়া গেছে।
খাদ্যনিরাপত্তায় বিএডিসির কৌশলগত ভূমিকা
বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদন ও সামগ্রিক খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বিএডিসি দীর্ঘদিন ধরে অত্যন্ত সুদৃঢ় ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। মানসম্মত বীজ উৎপাদন, সংগ্রহ, যথাযথ সংরক্ষণ ও সঠিক সময়ে কৃষক পর্যায়ে সরবরাহের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি দেশের কৃষির উৎপাদনভিত্তি শক্তিশালী করতে সহায়তা করে। সাধারণ কৃষকের উৎপাদন ব্যয়ের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ বীজের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। তাই মানসম্মত বীজ সহজলভ্য করা এবং সঠিক সময়ে এর সরবরাহ নিশ্চিত করা কৃষকের নিজস্ব উৎপাদন পরিকল্পনা ও আর্থিক আয়ের ওপর অত্যন্ত ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
এই বাস্তবতায় ‘কৃষক পর্যায়ে বিএডিসির বীজ সরবরাহ কার্যক্রম জোরদারকরণ’ প্রকল্পটি কেবল গতানুগতিক কিছু অবকাঠামো নির্মাণের উদ্যোগ নয়; এটি মূলত কৃষিউৎপাদনের সরবরাহ ব্যবস্থাকে টেকসই করার একটি সুদূর প্রসারী প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ। বীজ সংরক্ষণের উপযুক্ত আধুনিক ব্যবস্থা থাকলে মৌসুমভিত্তিক চাহিদা অনুযায়ী বীজ মজুত ও সুষ্ঠু বিতরণের সুযোগ বহুগুণ বাড়ে। একই সঙ্গে উন্নত সংরক্ষণ ও বিপণন ব্যবস্থা সুনিশ্চিত হলে বীজের প্রাপ্যতার ব্যবস্থাপনা, পরিবহন পরিকল্পনা এবং আঞ্চলিক চাহিদার সঙ্গে সরবরাহের চমৎকার সমন্বয় সহজ হতে পারে।
২৮২ কোটি ৬১৯ লাখ টাকার বেশি সরকারি বিনিয়োগ
কৃষি মন্ত্রণালয়ের সার্বিক তত্ত্বাবধানে বিএডিসি কর্তৃক বাস্তবায়িত এই প্রকল্পটি ২০২৩ সালের ১২ সেপ্টেম্বর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি বা সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষ কর্তৃক অনুমোদিত হয়। প্রকল্পের নির্ধারিত মেয়াদকাল ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৭ সালের জুন মাস পর্যন্ত। এর মূল অনুমোদিত প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ২৮২ কোটি ৬১ লাখ ৭১ হাজার টাকা, যা সম্পূর্ণভাবে সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে (জিওবি) বাস্তবায়িত হচ্ছে।
প্রকল্পের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো মাঠ পর্যায়ে বীজ বিপণন কার্যক্রমের পরিধি সম্প্রসারণের জন্য সর্বমোট ২৫ হাজার ৫০০ মেট্রিক টন ধারণক্ষমতা সম্পন্ন আধুনিক সংরক্ষণাগার নির্মাণ করা। পাশাপাশি বীজ ডিলারদের পেশাদার প্রশিক্ষণ প্রদান, বীজের বাজার ব্যবস্থা নিবিড়ভাবে যাচাই করা, কার্যকর বিপণন কৌশল নির্ধারণ এবং সংরক্ষণাগার ও কার্যালয়ের সার্বিক রক্ষণাবেক্ষণসহ প্রয়োজনীয় উপকরণ সরবরাহের মাধ্যমে বিএডিসির বীজ বিপণন বিভাগের দাপ্তরিক সক্ষমতা বহুগুণ বৃদ্ধি করা এই প্রকল্পের অন্যতম মূল উদ্দেশ্য।
প্রকল্পটির বিভিন্ন কার্যক্রম বিএডিসির সরাসরি আওতাধীন ২২টি জেলার বীজ বিপণন অঞ্চল, ৪২টি জেলা বীজ বিক্রয়কেন্দ্র এবং ৩৬টি উপজেলা বীজ বিক্রয়কেন্দ্রের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। সব মিলিয়ে প্রায় ১০০টি বিপণন ও বিক্রয়কেন্দ্রের বিশাল কাঠামোর আওতায় এই কার্যক্রম মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়িত হচ্ছে।
নির্মাণকাজে অগ্রগতি, ডিসেম্বরের মধ্যে ৫০টি হস্তান্তরের লক্ষ্য
প্রকল্প পরিচালক মো. মাহমুদুল আলম জানান, উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব বা ডিপিপি (DPP) অনুযায়ী মোট ৭৫টি বীজ সংরক্ষণাগার নির্মাণের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে ২৭টির নির্মাণকাজ ইতোমধ্যে শেষ করে তা ব্যবহার উপযোগী করার জন্য হস্তান্তর করা হয়েছে। চলতি বছর অর্থাৎ ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে আরও ২৩টির নির্মাণকাজ শেষ করে তা হস্তান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে। এতে করে আগামী ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে মোট ৫০টি সংরক্ষণাগারের নির্মাণ ও হস্তান্তর কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে সম্পন্ন হবে। এছাড়া অবশিষ্ট ২৫টির নির্মাণকাজ ২০২৭ সালের মে মাসের মধ্যে শেষ করার চূড়ান্ত লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
মূল ৭৫টির বাইরে সম্প্রতি নতুন অনুমোদিত হওয়া অতিরিক্ত চারটি সংরক্ষণাগার নির্মাণের কার্যাদেশও ইতোমধ্যে প্রদান করা হয়েছে। প্রকল্প সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, এসব নতুন স্থাপনার নির্মাণকাজ খুব দ্রুতই শুরু হবে। প্রকল্পের অর্থ ও সম্পদ সাশ্রয়ের নীতি পুরোপুরি অনুসরণ করে অবকাঠামো উন্নয়নের এই অভিনব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দেশের বীজ সংরক্ষণ ও সুষম বিতরণের সক্ষমতা আরও বহুলাংশে বৃদ্ধি পাবে।
তবে অবকাঠামোর নির্মাণকাজ সুচারুভাবে সম্পন্ন করার পাশাপাশি নবনির্মিত স্থাপনাগুলোকে অত্যন্ত কার্যকরভাবে ব্যবহার করা, উপযুক্ত সংরক্ষণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং কৃষকের প্রকৃত চাহিদা অনুযায়ী মানসম্মত বীজ সরবরাহের সঙ্গে এগুলোর সঠিক সমন্বয় ঘটানোও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
ভূমি উন্নয়ন শতভাগ সম্পন্ন
প্র প্রকল্পের ডিপিপি অনুযায়ী ভূমি উন্নয়নের মোট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত ছিল ১৩ হাজার ৪৬৮ ঘনমিটার। প্রকল্প পরিচালকের দেওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজটি শতভাগ সম্পন্ন হয়েছে।
পাশাপাশি সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ১৩ হাজার ৬৪২ দশমিক ৮ রানিং মিটার। এর মধ্যে ইতিমধ্যে ১২ হাজার ৫০০ রানিং মিটারের নির্মাণকাজ সফলভাবে শেষ হয়েছে। বাকি থাকা অবশিষ্ট কাজ চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে পুরোপুরি শেষ করার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় মোট ৫৪টি গেট নির্মাণের কাজও শতভাগ সম্পন্ন হয়েছে। অন্যদিকে, ৬ হাজার ৫২২ বর্গমিটার আরসিসি রাস্তা নির্মাণের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ইতোমধ্যে ৩ হাজার ৫০০ বর্গমিটার রাস্তার নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। অবশিষ্ট রাস্তা তৈরির কাজও ডিসেম্বরের মধ্যে সম্পন্ন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এই সমস্ত অবকাঠামো সংরক্ষণাগারগুলোর কার্যকর ব্যবহার, পণ্য ও বীজ পরিবহন, সার্বিক নিরাপত্তা এবং সার্বিক বীজ বিপণন কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য অত্যন্ত সহায়ক হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যদি এই নির্মাণকাজগুলো শেষ করা সম্ভব হয়, তবে প্রকল্পের অন্যান্য আনুষঙ্গিক কার্যক্রমও সুসমন্বিতভাবে এগিয়ে নেওয়া অনেক সহজ হবে।
প্রশিক্ষণ পাচ্ছেন ১৭ হাজার ২০০ বীজ ডিলার
তৃণমূলের সাধারণ কৃষকের কাছে মানসম্মত বীজ পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে স্থানীয় বীজ ডিলাররা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও কার্যকর সংযোগ হিসেবে কাজ করেন। তাই এই প্রকল্পে ডিলারদের পেশাদার প্রশিক্ষণ কার্যক্রমকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ডিপিপি অনুযায়ী, সর্বমোট ৩৪৪টি ব্যাচে দেশের ১৭ হাজার ২০০ জন নিবন্ধিত বীজ ডিলারকে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়ার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। প্রকল্প পরিচালকের তথ্য অনুযায়ী, ইতিমধ্যে ২৪৮টি ব্যাচে মোট ১২ হাজার ৯০০ জন ডিলারের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম অত্যন্ত সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। বাকি থাকা অবশিষ্ট ডিলারদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম আগামী ২০২৭ সালের মে মাসের মধ্যে সম্পূর্ণ শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এই প্রশিক্ষণের মূল উদ্দেশ্য হলো ডিলারদের মাঝে বীজের গুণগত মান সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা তৈরি করা, আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা শেখানো, সঠিক বাজারজাতকরণ পদ্ধতি এবং কৃষক পর্যায়ে নির্ভুলভাবে বীজ সরবরাহের দক্ষতা বৃদ্ধি করা। ডিলারদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি পেলে সার্বিক বীজ বিপণন ব্যবস্থার কার্যকারিতা বহুগুণ উন্নত হওয়ার পাশাপাশি প্রকৃত কৃষকের হাতে প্রয়োজনীয় বীজ পৌঁছানোর প্রক্রিয়াটি আরও অনেক বেশি সুসংগঠিত হতে পারে।
অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির সঙ্গে প্রকল্পের সম্পর্ক
কৃষির সার্বিক উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং সাধারণ কৃষকের আর্থিক আয় বাড়ানোর সঙ্গে মানসম্মত ও ভেজালমুক্ত বীজের সরবরাহ সরাসরি এবং গভীরভাবে সম্পর্কিত। সঠিক সময়ে মানসম্মত বীজ হাতে পেলে কৃষক সময়মতো অনুকূল আবহাওয়া অনুযায়ী নিজেদের চাষাবাদের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা করতে পারেন। বীজ সংরক্ষণ ও বিপণন ব্যবস্থা উন্নত হলে স্থানীয় চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে নিখুঁত সমন্বয় সাধনের সুবর্ণ সুযোগ বাড়ে। এতে সামগ্রিক কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা জোরালো করার বিশাল সম্ভাবনা তৈরি হয়।
এই প্রকল্পের সামগ্রিক অর্থনৈতিক গুরুত্ব মূলত কয়েকটি প্রধান ক্ষেত্রে বিবেচনা করা যেতে পারে। প্রথমত, উন্নত সংরক্ষণ ক্ষমতা বীজ মজুত ও বিতরণের ব্যবস্থাপনা বহুগুণ শক্তিশালী করতে পারে। দ্বিতীয়ত, আঞ্চলিক বিপণন কেন্দ্রের সক্ষমতা বৃদ্ধি পেলে কৃষকের কাছে বীজ পৌঁছানোর সময় ও ব্যবস্থাপনা বা পরিবহন ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে কমানোর সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। তৃতীয়ত, ডিলার প্রশিক্ষণ ও আধুনিক বাজার ব্যবস্থার উন্নয়ন বীজের প্রাপ্যতা এবং সামগ্রিক বিপণন কার্যক্রমের কার্যকারিতা অনেক বাড়িয়ে দিতে সহায়তা করতে পারে।
তবে এই সমস্ত সম্ভাব্য সুফল বাস্তবে পুরোপুরি অর্জিত হবে কি না, তা সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করবে সংরক্ষণাগারগুলোর যথাযথ ও কার্যকর ব্যবহার, বীজের উচ্চ গুণগত মান বজায় রাখা, সঠিক সময়ে সুষম সরবরাহ, চাহিদাভিত্তিক সঠিক মজুত ব্যবস্থাপনা এবং প্রকল্প-পরবর্তী নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের ওপর। অর্থাৎ কেবল কংক্রিটের অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি প্রান্তিক কৃষকের দোরগোড়ায় প্রকৃত সুফল পৌঁছে দেওয়াই হবে এই প্রকল্পের সাফল্যের প্রধান ও একমাত্র মাপকাঠি।
দীর্ঘমেয়াদে দেশের কৃষি উৎপাদন সন্তোষজনকভাবে স্থিতিশীল রাখতে পারলে বহির্বিশ্ব থেকে খাদ্য আমদানির ওপর নির্ভরতার চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। কৃষকের উৎপাদন ও সামগ্রিক আয় বৃদ্ধি পেলে দেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতেও একটি সুদূরপ্রসারী ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তবে এ ধরনের সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক ফলাফল মূলত নির্ভর করবে উৎপাদনশীলতা, সঠিক বাজারদর, কৃষকের সহজে বীজপ্রাপ্তি এবং প্রকল্পের বাস্তব কার্যকারিতার ওপর।
প্রকল্প পরিচালকের দক্ষতা ও বাস্তবায়ন ব্যবস্থাপনা
প্র প্রকল্পের বিভিন্ন অবকাঠামোগত কাজ, ডিলারদের প্রশিক্ষণ এবং নির্ধারিত সময়সীমা সুচারুভাবে সমন্বিত করে বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থাপনাগত দায়িত্ব। প্রকল্প পরিচালক মো. মাহমুদুল আলমের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ভূমি উন্নয়ন ও গেট নির্মাণের কাজ শতভাগ সম্পন্ন হয়েছে; পাশাপাশি আধুনিক সংরক্ষণাগার নির্মাণ, সীমানাপ্রাচীর স্থাপন, আরসিসি রাস্তা নির্মাণ এবং ডিলার প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে দৃশ্যমান অগ্রগতি সাধিত হয়েছে।
প্রকল্পের কাজের অগ্রগতি নিয়মিত পর্যালোচনা করা, কাজের অগ্রাধিকার যথাযথভাবে নির্ধারণ করা, সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী ও ঠিকাদারদের সঙ্গে নিয়মিত সমন্বয় করা এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অবশিষ্ট কাজ সম্পন্ন করার কার্যকর উদ্যোগ প্রকল্প পরিচালনার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এসব ক্ষেত্রে কার্যকর সমন্বয় ও তদারকি বজায় রাখা গেলে প্রকল্পের সময় ও আর্থিক ব্যয় ব্যবস্থাপনা আরও অনেক বেশি ফলপ্রসূ হতে পারে।
তবে প্রকল্প পরিচালকের দক্ষতার চূড়ান্ত মূল্যায়নে কেবল নির্মাণকাজের অগ্রগতির পরিসংখ্যান নয়, বরং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজের শতভাগ সমাপ্তি, নির্মাণের উচ্চ গুণগত মান বজায় রাখা, সরকারি অর্থের সঠিক ও সৎ ব্যবহার, প্রশিক্ষণের বাস্তব কার্যকারিতা এবং শেষ পর্যন্ত প্রকৃত কৃষকের কাছে মানসম্মত বীজ সরবরাহের দৃশ্যমান উন্নতিও সমানভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
বিএডিসি চেয়ারম্যানের প্রত্যাশা: সততা, নিষ্ঠা ও স্বচ্ছতা
বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের (বিএডিসি) চেয়ারম্যান মো. আজিজুল ইসলাম যেকোনো উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ সততা, পেশাগত নিষ্ঠা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর সবসময় বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। তাঁর সুদৃঢ় প্রত্যাশা হলো, প্রতিটি প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক যেন তাঁদের ওপর অর্পিত পবিত্র দায়িত্ব সর্বোচ্চ সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেন, সরকারি অর্থের শতভাগ যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করেন এবং প্রকল্পের নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জনে সবসময় আন্তরিক থাকেন।
যেকোনো সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ সফলভাবে শেষ করার পাশাপাশি কাজের কাঠামোগত মান নিশ্চিত করা এবং ব্যয়ের প্রতিটি খাতে স্বচ্ছতা বজায় রাখা অত্যন্ত অপরিহার্য। বিশেষ করে সরাসরি কৃষি খাতের যেকোনো প্রকল্পে নির্মাণকাজের গুণগত মানের সঙ্গে দেশের কোটি কোটি কৃষকের উৎপাদন ও জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তার প্রশ্ন সরাসরি জড়িত। তাই প্রকল্প পরিচালক থেকে শুরু করে মাঠ পর্যায়ের সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী এবং বাস্তবায়নকারী কর্মকর্তা-কর্মচারী প্রত্যেকেরই অত্যন্ত দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা জরুরি।
বিএডিসি চেয়ারম্যানের এ ধরনের সুনির্দিষ্ট প্রত্যাশা প্রকল্প বাস্তবায়নে সুশাসন, কঠোর আর্থিক শৃঙ্খলা ও কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করার প্রাতিষ্ঠানিক গুরুত্বকেই নতুন করে জোরালোভাবে তুলে ধরে।
কৃষিমন্ত্রীর বক্তব্য: খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা ও ক্ষুধামুক্ত বাংলাদেশ
এই প্রকল্পটির সুদূরপ্রসারী গুরুত্ব সম্পর্কে কৃষিমন্ত্রী মো. আমিন উর রশিদকে অবহিত করা হলে তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, সরকার ‘সবার আগে বাংলাদেশ’—এই মহান দেশপ্রেমের স্বপ্নকে সামনে রেখে দেশ গঠন ও জনগণের সামগ্রিক কল্যাণে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। দেশের মানুষের জন্য খাদ্য স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন, একটি ক্ষুধামুক্ত সুখী বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা এবং টেকসই খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা বর্তমান সরকারের অন্যতম প্রধান ও পবিত্র লক্ষ্য।
কৃষিমন্ত্রীর সুনির্দিষ্ট বক্তব্য অনুযায়ী, এই লক্ষ্য সফলভাবে বাস্তবায়নে কৃষির সার্বিক উৎপাদন বৃদ্ধি, প্রতিটি কৃষকের দোরগোড়ায় মানসম্মত বীজ পৌঁছে দেওয়া এবং সামগ্রিক খাদ্যনিরাপত্তার শক্ত ভিত্তি গড়ে তোলার উদ্যোগ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সেই সর্বোত্তম বিবেচনায় ‘কৃষক পর্যায়ে বিএডিসির বীজ সরবরাহ কার্যক্রম জোরদারকরণ’ প্রকল্পটি অত্যন্ত সময়োপযোগী ও যুগান্তকারী একটি পদক্ষেপ। প্রকল্পটির সফল উন্নয়ন ও দ্রুত বাস্তবায়নে তিনি এবং তাঁর পুরো মন্ত্রণালয় থেকে সর্বাত্মক সহযোগিতা অব্যাহত রাখার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন।
কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সরকারের নীতিগত লক্ষ্যগুলো বাস্তবায়নে এ ধরনের জনবান্ধব প্রকল্পের কার্যকর বাস্তবায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কৃষকের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো, আধুনিক বীজ সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং মজবুত কৃষি অবকাঠামো শক্তিশালী করার উদ্যোগ দেশের খাদ্যনিরাপত্তার একটি দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই ভিত্তি গড়ে তুলতে অত্যন্ত সহায়ক।
বাস্তবায়ন ও জবাবদিহিই হবে সাফল্যের চাবিকাঠি
প্রকল্পটির নির্ধারিত মেয়াদ আগামী ২০২৭ সালের জুন মাসে আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। তার আগেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বাকি থাকা অবশিষ্ট সংরক্ষণাগারগুলোর নির্মাণ, সীমানাপ্রাচীর ও আরসিসি রাস্তার অসমাপ্ত কাজ এবং বীজ ডিলারদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শতভাগ শেষ করা সংশ্লিষ্ট বাস্তবায়নকারী সংস্থার জন্য একটি অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। একই সঙ্গে নতুন করে অনুমোদিত হওয়া অতিরিক্ত চারটি সংরক্ষণাগারের নির্মাণকাজ দ্রুত শুরু করা এবং সেগুলোর বাস্তবায়ন অগ্রগতির বিষয়টিও আলাদাভাবে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা একান্ত প্রয়োজন।
প্রকল্পটির কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পুরোপুরি নিশ্চিত করতে নিয়মিত অগ্রগতি মূল্যায়ন, প্রকৌশলগত মান যথাযথভাবে যাচাই, সর্বোচ্চ আর্থিক স্বচ্ছতা বজায় রাখা, নিয়ম মেনে সঠিক সময়ে বিল পরিশোধের আগে কাজের যথাযথ পরিমাপ ও যাচাই এবং নবনির্মিত স্থাপনাগুলোর দীর্ঘমেয়াদি কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি।
সবশেষে বলা যায়, কৃষক পর্যায়ে বিএডিসির বীজ সরবরাহ কার্যক্রম জোরদারকরণ প্রকল্পের প্রকৃত গুরুত্ব কেবল ৭৫টি সংরক্ষণাগার নির্মাণ কিংবা নতুন করে আরও চারটি সংরক্ষণাগার যুক্ত করার প্রাথমিক উদ্যোগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর মূল ও প্রকৃত লক্ষ্য হলো দেশের বীজ সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও বেশি সক্ষম ও আধুনিক করা, কৃষকের নিজস্ব উৎপাদন পরিকল্পনাকে সর্বাত্মক সহায়তা করা এবং জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তার ভিত্তিকে আরও অনেক বেশি সুদৃঢ় করা। সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা, পেশাগত দক্ষতা ও জবাবদিহিতার সঙ্গে যদি এই প্রকল্পটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে তা দেশের সার্বিক কৃষি উন্নয়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পথকে আরও অনেকদূর এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম হবে।