চীনের সর্বোচ্চ সাহিত্য পুরস্কার জিতলেন ডেলিভারিম্যান কবি ওয়াং জিবিং

প্রকাশ: শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬, ০৮:৩৮ অপরাহ্ণ
চীনের সর্বোচ্চ সাহিত্য পুরস্কার জিতলেন ডেলিভারিম্যান কবি ওয়াং জিবিং
চীনের মর্যাদাপূর্ণ লু শুন সাহিত্য পুরস্কারজয়ী ডেলিভারিম্যান কবি ওয়াং জিবিং। (ছবি: সংগৃহীত)

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত শহরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে চলে তাঁর মোটরবাইক। লক্ষ্য নির্ধারিত সময়ে ক্ষুধার্ত গ্রাহকের হাতে খাবার পৌঁছে দেওয়া। আর এই কঠিন কাজের ফাঁকে রাস্তার পাশে বাইক থামিয়ে কিংবা ছোট বিরতির মুহূর্তে সাধারণ কাগজের টুকরোয় যিনি টুকে রাখতেন শ্রমজীবী মানুষের জীবনবোধের গল্প, সেই ৫৬ বছর বয়সী ডেলিভারিম্যান ওয়াং জিবিং এবার জয় করে নিয়েছেন চীনের সর্বোচ্চ ও মর্যাদাপূর্ণ জাতীয় সাহিত্য সম্মাননা।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক বিশেষ প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, নিজের অত্যন্ত আলোচিত ও জনপ্রিয় কবিতা সংকলন ‘লো ফ্লাইট’ (Low Flight)-এর জন্য ওয়াং জিবিং অর্জন করেছেন সম্মানজনক ‘লু শুন সাহিত্য পুরস্কার’। আধুনিক চীনা সাহিত্যের জনক লু শুনের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রবর্তিত এই রাষ্ট্রীয় পুরস্কারটি সমগ্র চীনে সাহিত্যের সর্বোচ্চ মর্যাদাপূর্ণ সম্মাননাগুলোর একটি হিসেবে গণ্য হয়।

চীনের জিয়াংসু প্রদেশে জন্ম নেওয়া ওয়াংয়ের জীবন কোনো রূপকথা নয়, বরং চরম কষ্টের বাস্তবতায় গড়া। শৈশবে পরিবারের অনটন ও আর্থিক সংকটের মুখে পড়ে মাত্র কিশোর বয়সেই প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা থামিয়ে দিতে হয় তাঁকে। জীবনধারণের তাগিদে কখনো তিনি ইট-বালুর নির্মাণশ্রমিক, কখনো শহরের বর্জ্য সংগ্রাহক আবার কখনো রাস্তার ধারের হকার হিসেবে হাড়ভাঙা খাটুনি খেটেছেন। পরবর্তীতে ২০১৯ সালে তিনি অ্যাপভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠানে খাবার সরবরাহকারীর (ফুড ডেলিভারিম্যান) চাকরি নেন।

উপায়হীন জীবনসংগ্রামের কঠিন মুহূর্তগুলোতেও বই পড়া এবং সাহিত্যচর্চার দুর্লভ অনুরাগ থেকে বিচ্যুত হননি ওয়াং। গত এক দশক ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিয়মিত নিজের কবিতা ও মননশীল প্রবন্ধ প্রকাশ করে আসছিলেন তিনি। তাঁর লেখার মূল সুরই ছিল সাধারণ মেহনতি মানুষের জীবনের দুঃখ-ক্লেশ, অদম্য স্বপ্ন এবং সমাজের অলক্ষ্যে থেকে যাওয়া অকথিত গল্পগুলো।

২০২২ সালে তাঁর লিখিত ‘ম্যান ইন আ হারি’ (Man in a Hurry) কবিতাটি চীনে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে ও তুমুল আলোড়ন সৃষ্টি করে। গ্রাহকের ভুল ঠিকানা দেওয়ার কারণে দীর্ঘ সময় খাবার নিয়ে রাস্তায় ঘুরে বেড়ানোর ব্যক্তিগত তেতো অভিজ্ঞতা থেকেই কবিতাটি রচনা করেছিলেন তিনি।

চলতি বছর পুরস্কৃত ‘লো ফ্লাইট’ কাব্যগ্রন্থটি মূলত চীনের প্রায় ২০০ জন সাধারণ খাবার সরবরাহকারী কর্মীর সাক্ষাৎকার, সাক্ষাৎকারভিত্তিক অভিজ্ঞতা ও নিজস্ব চেতনার আলোকে রচিত। গ্রন্থটির বহুল পঠিত ও উদ্ধৃত একটি পঙ্‌ক্তি হলো—

"কে বলে ডানা মেললেই উঁচুতে ওড়া? নিচুতে ওড়াও তো এক ধরনের ওড়া।"

পুরস্কার জয়ের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে ওয়াং জানান, বিজয়ী হিসেবে নিজের নাম ঘোষণার পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত তিনি দারুণ মানসিক উদ্বেগে ছিলেন। তবে এই বৈশ্বিক ও জাতীয় স্বীকৃতি তাঁর সাধারণ জীবনযাত্রায় কোনো ধরনের পরিবর্তন আনবে না।

ওয়াংয়ের ভাষায়, "শুধু জীবিকা নির্বাহের উদ্দেশ্যে এই ডেলিভারির কাজ করা আমার জন্য এখন আর বাধ্যতামূলক বিষয় নয়। কিন্তু আমি এ কাজের পরিবেশ ও মানুষের কাছাকাছি থাকাটা ভীষণ উপভোগ করি। এটি আমাকে ভেতরে-বাইরে চাঙ্গা রাখে। বিশাল কোনো পরিবর্তন নয়, আমি সাধারণ মানুষের সাধারণ জীবনটাই বেছে নিতে চাই।"

বিবিসি সূত্রে জানা যায়, চলতি ২০২৬ সালের ডিসেম্বর মাসেই যুক্তরাষ্ট্রের একটি শীর্ষস্থানীয় প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান থেকে ‘লো ফ্লাইট’ কাব্যের আনুষ্ঠানিক ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশ হতে যাচ্ছে, যার মাধ্যমে তাঁর রচিত কবিতা পৌঁছে যাবে আন্তর্জাতিক পাঠকমহলেও। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীনে শ্রমজীবী ও সাধারণ মেহনতি শ্রেণিদল থেকে উঠে আসা এমন লেখক ও কবিদের জোয়ার তৈরি হয়েছে। সাবেক পার্সেল কর্মী হু আনিয়ান, খনিশ্রমিক চেন নিয়ানশি এবং কৃষক-কবি ইউ শিউহুয়ার পর ওয়াং জিবিংয়ের এই অভূতপূর্ব অর্জন চীনের সমকালীন সাহিত্যাঙ্গনে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করল।

মন্তব্য করুন