উত্তরাঞ্চলের ভাগ্য পরিবর্তনে তিস্তা মেগা প্রকল্পের প্রাথমিক কাজ শুরু

প্রকাশ: বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:২৭ অপরাহ্ণ
উত্তরাঞ্চলের ভাগ্য পরিবর্তনে তিস্তা মেগা প্রকল্পের প্রাথমিক কাজ শুরু
তিস্তা নদী ও আশপাশের এলাকা (ফাইল ছবি)

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা: উত্তরাঞ্চলের কোটি মানুষের বহুল প্রতীক্ষিত তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে বর্তমান বিএনপি সরকারের দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবে রূপ নিতে শুরু করেছে। সরকারের সুনির্দিষ্ট তৎপরতার অংশ হিসেবে এই মেগা প্রকল্পের মূল প্রশাসনিক ও কারিগরি দিক বাস্তবায়নের প্রাথমিক কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারে দেওয়া তিস্তা-সংক্রান্ত মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের অঙ্গীকার পূরণে বর্তমান সরকার অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। মহাপরিকল্পনার মূল কাজ শুরুর আগে প্রয়োজনীয় কারিগরি ও অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা নিরূপণের লক্ষ্যে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে পরিকল্পনা কমিশনে প্রায় ২৩ কোটি টাকার একটি সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের এই উদ্যোগ অনুমোদন পেলে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের মাধ্যমে বিশ্বমানের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ করা হবে, যা মেগা প্রকল্পটির স্বচ্ছ ও টেকসই বাস্তবায়ন নিশ্চিত করবে। সরকারের এই মহাপরিকল্পনার মূল লক্ষ্য উত্তরাঞ্চলের স্থায়ী বন্যা ও নদীভাঙন সমস্যার দীর্ঘমেয়াদি সমাধান করা এবং উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলকে দেশের মূল অর্থনৈতিক চালিকাশক্তিতে রূপান্তর করা।

প্রস্তাবিত মহাপরিকল্পনার আওতায় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজের ওপর সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে—

  • ১১০ কিলোমিটার নদীতীর রক্ষা এবং ৬৭টি গ্রোয়েন বা স্পার নির্মাণ ও সংস্কার।

  • ১১০ কিলোমিটার নদী ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে নাব্যতা ও স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ ফিরিয়ে আনা।

  • ২২৪ কিলোমিটার শক্তিশালী বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ এবং বাঁধের ওপর পাকা সড়ক নির্মাণ।

  • নদীশাসনের মাধ্যমে নদীসংলগ্ন প্রায় ১৭০ বর্গকিলোমিটার নতুন জমি পুনরুদ্ধার করে তা কৃষি ও শিল্প কাজে ব্যবহার করা।

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (বাউবো) মহাপরিচালক প্রকৌশলী মো. রুহুল আমিন এই বিষয়ে বলেন, সরকারের এই সমন্বিত পরিকল্পনা কেবল নদী রক্ষাই করবে না, বরং আঞ্চলিক সংযোগ ও সেচব্যবস্থায় নতুন মাত্রা যোগ করবে। প্রস্তাবিত ২২৪ কিলোমিটার দীর্ঘ বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ও এর ওপর তৈরি সড়ক উত্তরাঞ্চলের অনুন্নত যোগাযোগব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ পাল্টে দেবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

ন নদী বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ এজাজ জানান, নদীর পলি ব্যবস্থাপনা ও গতিপ্রকৃতি নিখুঁতভাবে বিবেচনা করে ড্রেজিং কার্যক্রম পরিচালনা করলে তা সফল হবে। বুয়েটের পানিসম্পদ কৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আতাউর রহমান বলেন, উজান-ভাটির পানিপ্রবাহ ও কাঠামোগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মাধ্যমেই এই প্রকল্প দীর্ঘমেয়াদি সুফল বয়ে আনবে।

পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. এ কে এম সাহাবুদ্দিন জানান, তিস্তা মহাপরিকল্পনাকে দ্রুত বাস্তবে রূপ দিতে এই সমীক্ষা অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখবে। এর মাধ্যমে ব্যারেজ, নদীশাসন, ড্রেজিং, বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও পানি সংরক্ষণসহ প্রতিটি কম্পোনেন্টের সুফল নিশ্চিত করা হবে। এছাড়া পরিকল্পনা বিভাগের সচিব এস এম শাকিল আখতার জানিয়েছেন, সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে প্রস্তাবটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে এবং অনুমোদিত হলে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় দ্রুত পরবর্তী ধাপে এগোনো সম্ভব হবে।

সম্প্রতি জাতীয় সংসদে পানিসম্পদ মন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে সরকারের নেওয়া সুনির্দিষ্ট রূপরেখা ও দৃঢ় সঙ্কল্পের কথা তুলে ধরেন। এর পরেই মূলত প্রকল্পের কাজে এই গতি আসে।

রংপুর, লালমনিরহাট, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধার মতো প্রান্তিক জেলাগুলোর অর্থনীতি যুগ যুগ ধরে তিস্তা নদীর ভাঙনের শিকার হয়ে আসছে। শুষ্ক মৌসুমে পানির তীব্র অভাব এবং বর্ষায় ভয়াবহ ভাঙনে গৃহহীন হতো লাখো মানুষ। বিশেষজ্ঞদের মতে, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে এই অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রায় আমূল পরিবর্তন আসবে এবং উত্তরবঙ্গের অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা অর্জনে এটি একটি যুগান্তকারী মাইলফলক হয়ে থাকবে।

মন্তব্য করুন