সোনাগাজীতে এক মিনিটের টর্নেডোর তাণ্ডবে ৩০ পরিবার লন্ডভন্ড
এম. জহিরুল হক মিলন, ফেনী প্রতিনিধি: ফেনীর সোনাগাজী উপজেলার মতিগঞ্জ ইউনিয়নে মাত্র এক মিনিট স্থায়ী এক প্রলয়ঙ্করী ও শক্তিশালী টর্নেডোর আকস্মিক তাণ্ডবে লন্ডভন্ড হয়ে গেছে পুরো এলাকা।
আজ রোববার (১৯ জুলাই) সকাল সাড়ে ১১টার দিকে আঘাত হানা এই টর্নেডোর বর্বরোচিত ছোবলে গ্রামের অন্তত ৩০টি প্রান্তিক ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ঘরবাড়ি, সীমানাপ্রাচীর ও ফলজ-বনজ গাছপালার ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী ও বাসিন্দারা জানান, আজ সকাল সাড়ে ১১টার দিকে কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই হঠাৎ করেই এক বিকট ও কানফাটানো শব্দের সৃষ্টি হয়। মুহূর্তের মধ্যে একটি শক্তিশালী কুণ্ডলী পাকানো ঘূর্ণি টর্নেডো গ্রামের ওপর দিয়ে ধেয়ে যায়। মাত্র এক মিনিটেরও কম সময় স্থায়ী এই তাণ্ডবে পুরো গ্রামের অসংখ্য আধাপাকা ও কাঁচা বসতঘরের টিনের চাল কাগজ বা খড়ের মতো আকাশে উড়ে যায়। ঝড়ের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে, অনেক ঘরের ভারী টিন ও আসবাবপত্র বাতাস উধাও করে নিয়ে অন্তত ৩০০ থেকে ৪০০ গজ দূরে চকের মধ্যে আছড়ে ফেলে।
আকস্মিক এই দুর্যোগে ঘরের দেওয়াল ধসে পড়ার ভয়ে এবং চরম আতঙ্কে ওনারা ঘরের ভেতরের কোলের শিশু ও বৃদ্ধদের নিয়ে খোলা আকাশের নিচে নিরাপদ জায়গায় ছুটে যান।
স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ সূত্রে জানা গেছে, এই এক মিনিটের টর্নেডোর আঘাতে গ্রামের জয়নাল আবদিন, নূর নবী, কামাল উদ্দিন, চেমনা খাতুন, মো. আলম, হোসনে আরা, আবুল হোসেন, বিবি আমেনা, শহিদুল ইসলাম, মো. রাজ্জাক, আমির হোসেন, মো. হারুন, মো. এনামুল হক, খুরশীদ আলম, আবদুর শুক্কুর, ওমর ফারুক, মো. শহিদ, মো. নাহিদ ও মোহাম্মদ ফারুকসহ অন্তত ৩০টি দরিদ্র পরিবারের মাথা গোঁজার শেষ আশ্রয়স্থল ও উপার্জনের গাছপালা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে।
ক্ষতিগ্রস্ত জয়নাল আবদিন ওনার কান্নাবিজড়িত কণ্ঠে সাংবাদিকদের বলেন, "এনজিও থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে এবং আত্মীয়-স্বজনদের কাছ থেকে ধারদেনা করে অনেক কষ্টে ভাঙা ঘরটি নতুন করে নির্মাণ করেছিলাম। মাত্র এক মিনিটের এই রাক্ষুসে টর্নেডো আমার সব শেষ করে দিল। এখন এই চলমান বর্ষা ও বৃষ্টির মধ্যে ওনাদের নিয়ে কোথায় আশ্রয় নেব, সেই দুশ্চিন্তায় বুক ফেটে যাচ্ছে।" আরেক হতভাগ্য নারী চেমনা খাতুন আক্ষেপ করে বলেন, "ঘরের নির্মাণকাজ এখনো পুরোপুরি শেষও করতে পারিনি। এর মধ্যেই চোখের পলকে সব তছনছ হয়ে গেল। আমার ঘরের টিনগুলো কোন দিকে উড়ে গেছে তাও খুঁজে পাচ্ছি না।"
মতিগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক সফল চেয়ারম্যান আমিন উদ্দিন দোলন ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে বলেন, "টর্নেডোটি খুব অল্প সময় স্থায়ী হলেও ঘূর্ণনের তীব্রতা বেশি থাকায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অনেক বড় হয়েছে। অনেক দরিদ্র ও দিনমজুর পরিবার এখন খোলা আকাশের নিচে বাস করছে। আমি সোনাগাজী উপজেলা প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানাচ্ছি, যেন দ্রুত ওনাদের সঠিক তালিকা তৈরি করে জরুরি খাদ্য ও ঢেউটিন দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানো হয়।"
এ বিষয়ে সোনাগাজী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রিগ্যান চাকমা সংবাদ মাধ্যমকে নিশ্চিত করে জানান, “টর্নেডোর খবর পাওয়ামাত্রই স্থানীয় ইউপি সদস্য ও পিআইও অফিসকে ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়েছে। বর্তমানে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর একটি সঠিক ও পুঙ্খানুপুঙ্খ তালিকা প্রস্তুতের কাজ চলমান রয়েছে। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে ওনাদের পুনর্বাসন ও প্রয়োজনীয় সব ধরনের জরুরি সরকারি সহায়তা প্রদান করা হবে।”
|