চন্দ্রগ্রহণকে কাজে লাগিয়ে চতুর ক্রিস্টোফার কলম্বাসের জীবন বাঁধার গল্প

প্রকাশ: বুধবার, ১২ আগস্ট ২০২৬, ০১:৩৩ অপরাহ্ণ
চন্দ্রগ্রহণকে কাজে লাগিয়ে চতুর ক্রিস্টোফার কলম্বাসের জীবন বাঁধার গল্প
জ্যামাইকায় চন্দ্রগ্রহণকে চাল হিসেবে ব্যবহার করেন ক্রিস্টোফার কলম্বাস

অনলাইন ডেস্ক: নিজের চতুর্থ সমুদ্র অভিযানে বেরিয়ে মারাত্মক এক বিপদের মুখোমুখি হয়েছিলেন বিখ্যাত ইউরোপীয় নাবিক ক্রিস্টোফার কলম্বাস। ১৫০৪ সালের শুরুর দিকে কারিগরি ত্রুটির কারণে তিনি ও তাঁর নাবিকদল তৎকালীন জনবিচ্ছিন্ন জ্যামাইকা দ্বীপে আটকা পড়েন। শুরুতে স্থানীয় তাইনো উপজাতির সাথে বিভিন্ন ইউরোপীয় সাধারণ তৈজসপত্র ও যন্ত্রপাতির বিনিময়ে খাবার জোগাড় হলেও দিন দিন সংকট গভীর হতে থাকে।

দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা, খাদ্য সংকট এবং কলম্বাসের নিজস্ব দলের ভেতরে দানা বাঁধা অসন্তোষের মুখে ধৈর্য হারায় দ্বীপবাসী আদিবাসীরা। একপর্যায়ে তারা ইউরোপীয়দের সব ধরনের খাবার দেওয়া বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ফলে প্রত্যন্তদ্বীপে চরম অনাহার ও সুনিশ্চিত মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়াতে হয় কলম্বাস ও তাঁর সহযাত্রীদের।

উদ্ধারকারী কোনো জাহাজের আশু আশাই না পেয়ে চতুর কলম্বাস তাঁর বিজ্ঞানের জ্ঞানের ওপর ভরসা রাখেন। তিনি সঙ্গে থাকা বিখ্যাত জার্মান জ্যোতির্বিজ্ঞানী ইয়োহান মুলার (রেজিওমন্টানাস) প্রণীত 'আলমানাক পেরপেতুয়াম' নামের এক বিশেষ জ্যোতির্বিজ্ঞান তালিকার সাহায্য নেন।

নথি বিশ্লেষণ করে কলম্বাস জানতে পারেন, ১৫০৪ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি রাতে জ্যামাইকার আকাশে একটি পূর্ণগ্রাস চন্দ্রগ্রহণ ঘটবে। বায়ুমণ্ডলে আলোর প্রতিফলনের কারণে পৃথিবী সূর্যের আলো ঢেকে দিলে চাঁদ সাময়িকভাবে 'ব্লাড মুন' বা গাঢ় রক্তিম লাল রূপ ধারণ করবে।

এই বৈজ্ঞানিক সত্যকে কেন্দ্র করে চমৎকার এক মনস্তাত্ত্বিক চাল চালেন কলম্বাস। গ্রহণের মাত্র তিন দিন আগে তিনি জ্যামাইকার তাইনো উপজাতির প্রধানদের ডেকে পাঠান। অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তিনি দাবি করেন, স্বর্গের খ্রিস্টান ঈশ্বর আদিবাসীদের খাদ্য বন্ধের ব্যবহারে দারুণ ক্ষুব্ধ হয়েছেন। তাই ঈশ্বর তাদের ওপর গজব পাঠাচ্ছেন এবং সংকেত হিসেবে আজ রাতেই আকাশের চাঁদকে উধাও করে রক্তবর্ণ বানিয়ে দেবেন।

পরিকল্পিত রাতে আঁধার ঘনিয়ে আসার পরপরই কলম্বাসের দাবির সঙ্গে হুবহু মিলে যায় প্রকৃতির দৃশ্যপট। চাঁদের দ্যুতি হারিয়ে তা ধীরে ধীরে গাঢ় লাল রঙ ধারণ করে। আকাশের এই অলৌকিক ও ভীতিকর দৃশ্য দেখে চরম আতঙ্কে ভেঙে পড়ে তাইনোরা। তারা মনে করে, এটি ঈশ্বরের অভিশাপ। ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে তারা কলম্বাসের পায়ে পড়ে এই বিপর্যয় থেকে বাঁচানোর জন্য আকুল আর্জি জানায়।

ইতিহাসবিদ ও কলম্বাসের ছেলে হার্নান্দোর লেখা আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ অনুযায়ী, চতুর কলম্বাস তৎক্ষণাৎ সিদ্ধান্ত না দিয়ে নিজের কক্ষে ঢুকে পড়েন এবং জানান যে তিনি ঈশ্বরের কাছে ক্ষমা চাইবেন। তবে ঘরে বসে তিনি মূলত সূক্ষ্মভাবে চন্দ্রগ্রহণ কাটতে থাকার সময় হিসেব করছিলেন। ঠিক যে মুহূর্তে চাঁদ থেকে পৃথিবীর ছায়া সরতে শুরু করবে, তার কিছুক্ষণ আগেই তিনি বেরিয়ে এসে ঘোষণা দেন, তাঁর ঈশ্বর তাঁদের অনুশোচনায় সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং খাবার দেওয়া শুরু করলে চাঁদ আগের রূপ ফিরে পাবে।

মুহূর্তের মধ্যেই আকাশ আবার স্বাভাবিক রূপ পায় এবং আলো ছড়াতে শুরু করে চাঁদ। বিজ্ঞানের এই নিখুঁত প্রয়োগে বিশ্বাস করে আদিবাসীরা কলম্বাসকে অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী মনে করে এবং পরম শ্রদ্ধায় প্রচুর খাদ্য সরবরাহ শুরু করে। সেই রসদের ওপর ভর করেই বেঁচে থাকেন নাবিকরা, যতদিন না কয়েক মাস পর একটি উদ্ধারকারী জাহাজ এসে পৌঁছায়।

মন্তব্য করুন