মাধ্যমিকে ৪১ শতাংশ শিক্ষকের প্রশিক্ষণ নেই
অনলাইন ডেস্ক: বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে শিক্ষকতা পেশায় যোগদানের পূর্বশর্ত হিসেবে পেশাগত প্রশিক্ষণ নেওয়া বাধ্যতামূলক হলেও বাংলাদেশে চিত্রটি সম্পূর্ণ বিপরীত। এখানে আগে চাকরিতে নিয়োগ দেওয়া হয়, তারপর মেলে প্রশিক্ষণের সুযোগ। এই কাঠামোগত ত্রুটির কারণে দেশের মাধ্যমিক পর্যায়ের প্রায় ৪১ শতাংশ শিক্ষকই এখনও শিক্ষকতার মতো মৌলিক পেশাগত প্রশিক্ষণ ছাড়া শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করছেন।
শুধু মাধ্যমিকই নয়, মাদ্রাসা ও এমপিওভুক্ত উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়েও বিশালসংখ্যক শিক্ষক কোনো ধরনের ফাউন্ডেশন প্রশিক্ষণ পাননি। সব মিলিয়ে বর্তমানে সরকারি বেতন-ভাতা (এমপিও) পাওয়া প্রায় আড়াই লাখ শিক্ষক প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ছাড়াই শিক্ষাদান করছেন। আজ সোমবার (৫ অক্টোবর) বিশ্ব শিক্ষক দিবস ২০২৬-এর দিনে ব্যানবেইসের নথিতে উঠে এসেছে এ চিত্র।
উল্লেখ্য, এ বছর বিশ্ব শিক্ষক দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে— ‘শিক্ষকদের পাশে দাঁড়ানো: পেশার সুরক্ষা, মর্যাদা উন্নয়ন ও আমাদের ভবিষ্যৎ গঠনে ৬০ বছরের অঙ্গীকার’। দিবসটি উপলক্ষে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও সরকার সেরা শিক্ষক নির্বাচনসহ একাধিক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।
বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) সর্বশেষ ২০২৫ সালের উপাত্ত অনুযায়ী, দেশে মাধ্যমিক পর্যায়ে মোট শিক্ষক রয়েছেন ৩ লাখ ৪ হাজার ৬৪৬ জন। এদের মধ্যে প্রশিক্ষিত শিক্ষকের হার ৫৯.৪৮ শতাংশ। অর্থাৎ ৪০.৫২ শতাংশ বা প্রায় ১ লাখ ২৩ হাজার শিক্ষক কোনো প্রশিক্ষণের আওতায় আসেননি। লিঙ্গভিত্তিক বিচারে পুরুষ শিক্ষকদের ৬২.৭০ শতাংশ এবং নারী শিক্ষকদের ৫২.৭৯ শতাংশ প্রশিক্ষিত।
মাদ্রাসা শিক্ষার পরিস্থিতি আরও সংকটজনক। মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৬৭৫ জন মাদ্রাসা শিক্ষক রয়েছেন, যাদের মধ্যে মাত্র ১০ থেকে ১২ শতাংশ শিক্ষক প্রশিক্ষিত। বিগত ২০২৪ সালে এই হার ছিল মাত্র ৯.১৯ শতাংশ।
অন্যদিকে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা (মাউশি) অধিদপ্তর সূত্রের বরাতে জানা যায়, এমপিওভুক্ত উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে ১ লাখ ১০ হাজার ১৫১ জন শিক্ষকের মধ্যে প্রায় ২০ শতাংশ শিক্ষকের এখনও কোনো প্রশিক্ষণ নেই।
শিক্ষাবিদ ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিয়োগের পর প্রশিক্ষণের দীর্ঘসূত্রতার কারণে শিক্ষকরা শ্রেণিকক্ষে আধুনিক শিক্ষণদক্ষতা ও পেডাগোজি প্রয়োগ করতে ব্যর্থ হচ্ছেন, যার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ছে শিক্ষার গুণগত মানের ওপর।
বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে. চৌধুরী বলেন, "শিক্ষক নিয়োগের আগেই প্রশিক্ষণের বাধ্যবাধকতা করা হলে প্রার্থীরা নিজ উদ্যোগে প্রশিক্ষণ নিতে উৎসাহী হবেন। পাশাপাশি যাদের বর্তমানে প্রশিক্ষণ নেই, তাদের দ্রুত প্রশিক্ষণের আওতায় আনতে হবে এবং সেই অর্জিত জ্ঞান বাস্তবে শ্রেণিকক্ষে প্রয়োগ হচ্ছে কি না, তা সরকারের নজরদারিতে রাখা জরুরি।"
এদিকে ঘাটতি পূরণে ‘মাধ্যমিক শিক্ষায় শিখন ত্বরান্বিতকরণ’ (লেইস) প্রকল্পের মাধ্যমে ৩ লাখ ৬৭ হাজার ৪৯০ জন শিক্ষককে প্রশিক্ষণ দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। তবে শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই সাময়িক উদ্যোগ কোনো দীর্ঘমেয়াদি বা মৌলিক ‘ফাউন্ডেশন কোর্স’ নয়।