মোরেলগঞ্জে অনিয়মের বেড়াজালে ফকিরবাড়ি আদর্শ মাধ্যমিক বিদ্যালয়
মোরেলগঞ্জ (বাগেরহাট) প্রতিনিধি: বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জে অনিয়মের বেড়াজালে জড়িয়ে পড়েছে ফকিরবাড়ী আদর্শ মাধ্যমিক বিদ্যালয়। বিদ্যালয়টিতে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী পদে মো. হাছিব শাহ ফকিরের নিয়োগ ভুয়া বলে অভিযোগ উঠেছে। এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী দপ্তরসহ বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়, সাবেক চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী মো. আবুল বাশার শাহ ফকিরের অবসরে যাওয়ার বিষয়টি সম্পূর্ণ গোপন রেখে এবং এমপিও তালিকায় তাঁর নাম থাকা অবস্থায় সম্পূর্ণ গোপনে তড়িঘড়ি করে উক্ত পদে মো. হাছিব শাহ ফকিরকে ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে অবৈধ নিয়োগ প্রদান করা হয়।
বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের কর্মচারীদের পদ শূন্য হওয়ার বিধান, কর্মচারী নিয়োগ বিধিমালা ২০০৯-এর ম্যানেজিং কমিটি প্রবিধানমালার বিশেষ সভা ও সাধারণ সভার বিধান এবং ২০১৮ সালের এমপিও নীতিমালা অনুসারে ২০২০ সালে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী পদে মো. হাছিব শাহ ফকিরের নিয়োগ ও এমপিওভুক্তি বৈধ ছিল কি না, বিষয়টি নিয়ে সচেতন এলাকাবাসী যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে প্রশ্ন তুলেছেন। এছাড়া জ্যৈষ্ঠতা লঙ্ঘন করে বিধিবহির্ভূতভাবে মো. আবু তালেব হোসেন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব নিয়ে ওই কর্মচারীর যোগদানপত্র গ্রহণ করেছিলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের ইএমআইএস (EMIS) সেলের অনলাইন পোর্টাল থেকে জানা যায়, গত ২৬/০২/২০২০ তারিখের নিয়োগ বোর্ডের সুপারিশ এবং ২৭/০২/২০২০ তারিখের পরিচালনা কমিটির সভার সিদ্ধান্ত অনুসারে মো. হাছিব শাহ ফকিরকে নিয়োগপত্র প্রদান করেছিলেন তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সাহিদা আক্তার এবং ২৮/০২/২০২০ তারিখে তাঁর যোগদানপত্র গ্রহণ করেন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. আবু তালেব হোসেন।
তবে এ বিষয়ে সাবেক ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সাহিদা আক্তারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, ২০১৯ সালের নভেম্বর ও ডিসেম্বর এবং ২০২০ সালের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে নিয়মিত ম্যানেজিং কমিটি গঠন সংক্রান্ত জটিলতা বিদ্যমান ছিল। তিনি ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক থাকাকালে উক্ত শূন্য বা সৃষ্ট পদে নিয়োগের জন্য পত্রিকায় কোনো বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেননি বা নিয়োগ পরীক্ষাও গ্রহণ করেননি। নিয়োগপত্রে ব্যবহৃত তাঁর স্বাক্ষর ও সিল জাল বা ভুয়া বলে দাবি করেন তিনি। তৎকালীন ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি বা অন্য কেউ এ বিষয়ে তাঁর সঙ্গে কোনো আলোচনা করেননি। এমনকি তিনি জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারের কাছে ডিজির নমিনির চিঠি চেয়ে আবেদন করেননি এবং তা গ্রহণও করেননি। ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে সহকারী প্রধান শিক্ষকের পদ থেকে তিনি অব্যাহতি নেন।
এদিকে ২০২১ সালে পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর (শিক্ষা মন্ত্রণালয়) কর্তৃক পরিচালিত মিনিস্ট্রি অডিট রিপোর্ট ২০২৪ সালে প্রকাশ করা হয়। এতে উল্লেখ করা হয়, ডিজির নমিনির ভুয়া চিঠি ব্যবহার করে ২০২০ সালে মো. হাছিব শাহ ফকিরকে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। ফলে তাঁর নিয়োগ ভুয়া এবং গত ০১/০৭/২০২০ তারিখ থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত উত্তোলিত সকল অর্থ সরকারি কোষাগারে ফেরত প্রদান করতে হবে। অডিট রিপোর্টে বিদ্যালয়টিতে অন্য কোনো নন-এমপিও কর্মচারী কর্মরত থাকার প্রমাণ মেলেনি।
অভিযোগ রয়েছে, একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট বিপুল অর্থের বিনিময়ে এই ভুয়া নিয়োগ প্রদান করে এবং ২০২০ সালের জুলাই মাসে তাঁকে এমপিওভুক্ত করায়। পরবর্তীতে এই ভুয়া নিয়োগকে বৈধতা দিয়ে সিন্ডিকেটকে দায়মুক্ত রাখার জন্য বর্তমান প্রধান শিক্ষক ও জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার যৌথভাবে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে ব্রডশীট জবাব প্রদান করেন। ব্রডশীট জবাব প্রদানের পূর্বেও সাহিদা আক্তারের কাছ থেকে কোনো বক্তব্য নেওয়া হয়নি।
ব্রডশীট জবাব প্রসঙ্গে বাগেরহাটের তৎকালীন জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার এস.এম ছায়েদুর রহমান জানান, বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সময়মতো প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সরবরাহ না করায় সময়মতো জবাব পাঠানো সম্ভব হয়নি। বর্তমান ভারপ্রাপ্ত জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার মোহা: সাদেকুল ইসলাম বলেন, "২০২০ সালের নিয়োগের বিষয়ে আমি অবগত নই। ২০২৫ সাল থেকে দায়িত্ব পালনের পর বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ যেভাবে জবাব প্রস্তুত করেছে, সেভাবেই ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে তা পাঠানো হয়েছে।"
এদিকে খুলনা অঞ্চলের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত উপপরিচালক (তৎকালীন বাগেরহাট জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার) মো. কামরুজ্জামান জানান, নিয়োগ ও এমপিওভুক্তির ক্ষেত্রে যদি ভুয়া ডিজির নমিনির চিঠি ব্যবহার করা হয়ে থাকে, তবে আইনানুসারে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। সাবেক ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সাহিদা আক্তার যদি কোনো কিছু অবগত না থাকেন, তবে তাঁর পদত্যাগের পর যে শিক্ষক দায়িত্ব পালন করেছিলেন এবং অনলাইনে আবেদনের জন্য পাসওয়ার্ড যার কাছে ছিল, সেই শিক্ষকই সম্পূর্ণ দায়ী থাকবেন; এতে শিক্ষা অফিসের কোনো দায় থাকবে না।
এআইএল/সকালবেলা