দেশকে অস্থিতিশীল করার নেপথ্যে কারা: নিরাপত্তা ঝুঁকি ও রাজনৈতিক উত্তেজনা
অনলাইন ডেস্ক : হঠাৎ করেই দেশজুড়ে এক অস্বস্তিকর ও গুমোট পরিস্থিতি লক্ষ করা যাচ্ছে। একের পর এক প্রকাশ্য হত্যাকাণ্ড, গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বোমা সদৃশ বস্তু উদ্ধারের আতঙ্ক, পুলিশের যানবাহনে সম্ভাব্য হামলার তথ্যে সর্বোচ্চ সতর্কতা এবং রাজনৈতিক ময়দানে নতুন করে বিষোদ্গার—সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষের মনে দেখা দিয়েছে গভীর উৎকণ্ঠা। ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক গণ অভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তির ঠিক প্রাক্কালে কেন এই অস্থিরতা? এর পেছনে কি দেশের রাজনীতিকে আবার পেছনে ঠেলে দেওয়ার কোনো গভীর চক্রান্ত কাজ করছে?
গত শনিবার (১ আগস্ট) পুলিশ সদর দফতর থেকে মাঠপর্যায়ের সব ইউনিটকে পার্কিং করা ও ডিউটিরত যানবাহনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ সতর্কতার নির্দেশ দেওয়া হয়। গোয়েন্দা সূত্রে উগ্রবাদী বা দুষ্কৃতকারীদের হামলার পূর্বাভাসের ভিত্তিতে এই জরুরি বার্তা পাঠানো হয়। এর পরপরই মিরপুর-১০ ও ফার্মগেট মেট্রো স্টেশনসহ বিভিন্ন স্থানে বোমা সদৃশ বস্তুর উপস্থিতি আতঙ্ক আরও বাড়িয়ে দেয়। যদিও পরবর্তী সময়ে জানা গেছে সেগুলোতে কোনো বিস্ফোরক ছিল না, তবে অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, এগুলো নিছক রসিকতা নয়; বরং বড় কোনো নাশকতার আগে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি ও নিরাপত্তার ফাঁকফোকর পরখ করার ‘টেস্ট কেস’ হতে পারে।
অন্যদিকে, দেশের অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটছে। পুলিশ সদর দফতরের তথ্য অনুযায়ী, গত তিন মাসে সারা দেশে ৯২৪টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে কেবল জুন মাসেই খুন হয়েছেন ৩২৬ জন। ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকাতেই এক মাসে ২৩টি হত্যা মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। দিনদুপুরে কুপিয়ে ও গুলি করে মানুষ হত্যার ঘটনা জনমনে ব্যাপক নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করেছে।
এই সার্বিক নিরাপত্তা সংকটের আগুনে ঘি ঢালছে হঠাৎ চড়ে যাওয়া রাজনৈতিক পারদ। গত এক মাসে হবিগঞ্জে এনসিপির জুলাই পদযাত্রাকে কেন্দ্র করে হামলা-মামলার ঘটনা ও রাজনৈতিক নেতাদের অশালীন ভাষার ব্যবহার আবার সংঘাতময় দিনগুলোর কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত ছয় মাস বয়সী বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির কঠোর ও আক্রমণাত্মক অবস্থান অনেককেই অবাক করছে। সংসদে যে সমঝোতা ও সৌহার্দ্যের আবহ তৈরি হয়েছিল, তা হঠাৎ উধাও হয়ে যাওয়ায় প্রশ্ন উঠছে—তৃতীয় কোনো অগণতান্ত্রিক শক্তি কি অন্তরালে থেকে উসকানি দিচ্ছে?
বিগত দেড় বছরে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলের পর বর্তমান নির্বাচিত সরকার যখন দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতি ও ধ্বংসস্তূপ সামলে ওঠার চেষ্টা করছে, ঠিক তখনই এই রাজনৈতিক অস্থিরতা জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী রূপ নিচ্ছে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, বাংলাদেশে যখনই গণতান্ত্রিক চর্চা ফিরে আসার সুযোগ তৈরি হয়, তখনই পর্দার আড়ালের ষড়যন্ত্রকারীরা ডালপালা বিস্তার করে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক প্রতিহিংসা ও অহেতুক হানাহানি কেবল অপরাধীদের সুযোগ করে দিচ্ছে তা নয়, বরং দেশকে আবার এক অনাকাঙ্ক্ষিত অস্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এই মুহূর্তে সরকার, বিরোধী দল এবং সাধারণ নাগরিক—সবাইকে চরম ধৈর্য ও সহনশীলতার পরিচয় দিতে হবে। আগস্ট অভ্যুত্থানের চেতনাকে ধারণ করে দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় ঐক্যের পরিবেশ বজায় না রাখলে বিপন্ন হবে অর্জিত গণতন্ত্র ও সাধারণ মানুষের অধিকার।
|