সাবধান ভারত, ক্ষমতার সমীকরণ বদলাতে আসছে জেন জি
প্রকাশ: বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬, ১১:০১ পূর্বাহ্ণ
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:আপাতত শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ করিয়ে আন্দোলন কিছুটা প্রশমিত করতে পেরেছে ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকার। তবে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ নামে পরিচিত এই তরুণদের আন্দোলন কেবল একটি সরকারি সিদ্ধান্ত বদলেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং ভারত বর্ষের প্রথাগত ও ঐতিহ্যবাহী সব রাজনৈতিক দলের সামনেই এক বৈপ্লবিক পরিবর্তনের বড় ইঙ্গিত তৈরি করেছে।দুর্নীতি ও অনিয়ম গোপন করে কিংবা জনগণের সামনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত না করে পার পাওয়ার দিন যে শেষের পথে, তা স্পষ্ট করে দিয়েছে রাজপথের এই প্রতিবাদ। ২০২৯ সালের জাতীয় সাধারণ নির্বাচনের সময় এই ‘জেন জি’ (Generation Z) প্রজন্মই হবে ভারতের সবচেয়ে প্রভাবশালী ও বড় ভোটার গোষ্ঠী। কেবল জনসংখ্যার বিচারে নয়, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নির্ধারণের মূল চালিকাশক্তিও হবে তারা। টানা ৩৭ দিনের অহিংস আন্দোলন দিয়ে এই তরুণ প্রজন্ম পুরো বিশ্ব ও জাতিকে নিজেদের সাংগঠনিক সক্ষমতা দেখিয়ে দিয়েছে।গবেষণা ও জনসংখ্যা জরিপ অনুযায়ী, ২০২৯ সালের মধ্যে ভারতে ১৮ থেকে ৩২ বছর বয়সী জেন জি প্রজন্মের জনসংখ্যা প্রায়৩৮ কোটিতে গিয়ে পৌঁছাবে। যার মধ্যে থাকবে প্রায় ১৯ কোটি ৯০ লাখ পুরুষ এবং ১৮ কোটি ১০ লাখ নারী। এর মাধ্যমে তারা ভারতের একক বৃহত্তম প্রাপ্তবয়স্ক প্রজন্মে পরিণত হবে। এমনকি ২০২৯ সালের মধ্যে তারা তাদের পূর্বসূরি ‘মিলেনিয়াল’ প্রজন্মকেও (৩৫ কোটি ৭০ লাখ) ছাড়িয়ে যাবে।
এই পরিবর্তনের গুরুত্ব শুধু সংখ্যার বিচারে সীমাবদ্ধ নয়। দেশের মোট শিক্ষার্থী, প্রথমবার ভোট দিতে যাওয়া তরুণ, ক্যারিয়ারের শুরুতে থাকা পেশাজীবী এবং নতুন পরিবারের বড় একটি অংশ আসছে এই প্রজন্ম থেকে। এর ফলে কর্মসংস্থান, মানসম্মত শিক্ষা, জীবনযাত্রার ব্যয়, আবাসন সুবিধা, জলবায়ু পরিবর্তন এবং সুশাসনের মতো মৌলিক বিষয়গুলো ভারতীয় রাজনীতিতে নতুন করে মুখ্য হয়ে উঠবে। জেন জি’র পেছনেই আসছে আরও বিশাল আকারের ‘জেন আলফা’ প্রজন্ম, যাদের জনসংখ্যা হবে ৪১ কোটি ৭০ লাখের বেশি।যদিও চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নতির কারণে ভারতে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর আয়ুষ্কাল বৃদ্ধিতে ভোটার তালিকায় তরুণদের শতকরা অনুপাত কিছুটা কমেছে (১৯৮৮ সালে ১৮-২৯ বছর বয়সী ভোটার ছিল ৩৮.৩%, যা ২০২৯ সালে ২৭.৮%-এ নামতে পারে), তবুও কেবল শতকরা হিসাব দিয়ে জেন জি-কে বিচার করলে ভুল করবে রাজনৈতিক দলগুলো।
১৯৮১-১৯৯৬ সময়ে জন্ম নেওয়া মিলেনিয়ালরা এনালগ থেকে ডিজিটালে রূপান্তর দেখলেও, ১৯৯৭-২০১২-এর জেন জি’দের জন্মই হয়েছে ডিজিটাল প্রযুক্তির আধুনিক যুগে। তারা আধুনিক প্রযুক্তি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অত্যন্ত দক্ষ এবং মুহূর্তেই নিজেদের তথ্য হালনাগাদ করে নিতে পারে। সনাতন রাজনীতিতে সরাসরি না থাকলেও তারা সামাজিকভাবে অত্যন্ত সচেতন। জলবায়ু পরিবর্তন, মানবাধিকার, লিঙ্গ সমতা এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের দাবিতে তারা অত্যন্ত সোচ্চার।যেকোনো সরকার বা প্রতিষ্ঠানের কাছে তারা সততা, স্বচ্ছতা ও শতভাগ জবাবদিহিতা আশা করে। নিজের দাবি আদায়ের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে অল্প সময়ে বিশ্বজুড়ে গণমত গড়ে তোলা এবং সংগঠিত হওয়ার নজির তারা এর আগেও শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ ও নেপালে দেখিয়েছে, আর এবার দেখাল ভারতেও।যন্তর-মন্তরে টানা ৩৭ দিনের ঐতিহাসিক সফল আন্দোলনের ঢেউ ইতিমধ্যে পুরো ভারতে ছড়িয়ে পড়েছে। এই সাফল্য জেন জি-কে আরও বেশি আত্মবিশ্বাসী ও সোচ্চার করেছে। তাই আগামী ২০২৯ সালের ভারতের লোকসভা নির্বাচন হতে যাচ্ছে প্রথাগত রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য চরম এক অগ্নিপরীক্ষা। যেসব রাজনীতিবিদ বা দল তরুণদের আধুনিক ভাষা ও চিন্তা যত দ্রুত বুঝতে পারবে, রাজনীতিতে তাদের টিকে থাকাও ততটা সহজ হবে। অন্যথায়, ডিজিটাল প্রজন্মের এই বিশাল শক্তিকে অবহেলা করলে দলগুলোকে ভবিষ্যতে নিশ্চিতভাবে পস্তাতে হবে।
|