সন্তানের অতিরিক্ত সোশ্যাল মিডিয়া আসক্তি কাটাবেন যেভাবে

প্রকাশ: মঙ্গলবার, ০৯ জুন ২০২৬, ০৬:৪২ অপরাহ্ণ
সন্তানের অতিরিক্ত সোশ্যাল মিডিয়া আসক্তি কাটাবেন যেভাবে

অনলাইন ডেস্ক:বর্তমান যুগে সোশ্যাল মিডিয়া বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তরুণ প্রজন্মের জীবনের একটি বড় অংশজুড়ে রয়েছে। অনেক কিশোর-কিশোরী এটি স্বাভাবিকভাবে বিনোদন বা যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করলেও, একটি বড় অংশ মারাত্মক আসক্তিতে জড়িয়ে পড়ছে। চিকিৎসকদের মতে, সোশ্যাল মিডিয়ায় আসক্তি এখন আর সাধারণ কোনো সাধারণ অভ্যাস বা শখ নয়, এটি একটি গুরুতর মানসিক সমস্যা যা তরুণদের জীবনকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। বিশ্বজুড়ে যখন এই নিয়ে তোলপাড় চলছে, তখন আপনার ঘরের সন্তানটিও কিন্তু এই একই ঝুঁকির মধ্যে থাকতে পারে। তাই সে আসক্তির দিকে যাচ্ছে কি না তা বুঝতে বাবা-মায়ের এখনই সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।

আজ মঙ্গলবার (৯ জুন) সকাল ১১টা ১৫ মিনিটে অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত ‘সুস্বাস্থ্য, মানসিক বিকাশ ও সমসাময়িক জীবনশৈলী’ এবং ‘প্যারেন্টিং গাইডলাইন, শিশু মনস্তত্ত্ব ও ডিজিটাল আসক্তি ট্র্যাকিং উইং’ বিভাগের বিশেষ যৌথ বুলেটিংয়ে সন্তানের সোশ্যাল মিডিয়া আসক্তি এবং তা থেকে মুক্তির উপায় নিয়ে বিস্তারিত খতিয়ান তুলে ধরা হলো।

সাধারণত সন্তানের আচরণে নিচের পরিবর্তনগুলো দেখলে বাবা-মায়ের বুঝতে হবে সে সোশ্যাল মিডিয়া আসক্তিতে ভুগছে—

পড়ালেখা, খেলাধুলা বা বাস্তব জীবনের দৈনন্দিন দায়িত্বে চরম অবহেলা করা।

জোর বা শাসন করেও কোনোভাবে সামাজিক মাধ্যমের ব্যবহার বন্ধ করতে না পারা।

ইন্টারনেট বা ফোন হাতের কাছে না থাকলে প্রচণ্ড রাগ, খিটখিটে মেজাজ, চিৎকার বা তীব্র মানসিক যন্ত্রণা প্রকাশ করা।

ঘরের সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে গোপনে বা মাঝরাতে লুকিয়ে ফোন ব্যবহার করা।

স্বাভাবিক ঘুম, খাওয়া-দাওয়া ও শারীরিক ব্যায়ামের রুটিন পুরোপুরি নষ্ট হওয়া।

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, একজন সাধারণ মানুষ দিনে গড়ে অন্তত ৩৪৪ বার নিজের ফোন চেক করে। কিশোর-কিশোরী বা তরুণরা রাতে ফোন পাশে নিয়ে ঘুমানোর কারণে তাদের গভীর ঘুম হয় না। এই অনিদ্রা ও অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইমের ফলে সমাজ ও পরিবারে যেসব জটিল সমস্যা দেখা দিচ্ছে :

সোশ্যাল মিডিয়ায় নিখুঁতভাবে সম্পাদিত ও অবাস্তব ছবি দেখে কিশোর-কিশোরীরা নিজেদের বাস্তব জীবনের সাথে তুলনা করে। এর ফলে তাদের কচি মনে হীনমন্যতা, তীব্র বিষণ্ণতা, একাকীত্ব ও সামাজিক উদ্বেগ তৈরি হয়।এক বৈশ্বিক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারের পর প্রায় ৪০ শতাংশ মেয়ে ও ১৪ শতাংশ ছেলে নিজেদের শরীর নিয়ে হীনমন্যতায় ভোগে। এর ফলে না খেয়ে কৃত্রিমভাবে দ্রুত ওজন কমানোর মতো বিপজ্জনক খাদ্যাভ্যাস (যেমন অ্যানোরেক্সিয়া) ও শারীরিক অসুস্থতা দিন দিন বাড়ছে। দিনরাত ফোনের নোটিফিকেশন চেক করার তীব্র আকাঙ্ক্ষার কারণে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় মনোযোগ কমছে এবং পরীক্ষার রেজাল্ট খারাপ হচ্ছে। পাশাপাশি তারা বাস্তব জীবনের রক্তমাংসের বন্ধু ও পরিবারের চেয়ে ভার্চুয়াল লাইক-কমেন্টকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। চাঞ্চল্যকর গবেষণায় দেখা গেছে, বর্তমানে ১০ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের মৃত্যুর দ্বিতীয় প্রধান কারণ হলো আত্মহত্যা। প্রতিদিন গড়ে ২ ঘণ্টার বেশি সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার এবং বিভিন্ন গ্রুপে সাইবারবুলিং-এর শিকার হয়ে অনেক কোমলমতি তরুণ-তুর্কি আত্মহত্যার মতো চরম পথ বেছে নিচ্ছে।

আন্তর্জাতিক শিশু স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, সুস্বাস্থ্যের জন্য একজন কিশোর বা তরুণ-তরুণীর দিনে সর্বোচ্চ দুই ঘণ্টার মধ্যে স্ক্রিন টাইম (ডিভাইস ব্যবহার) সীমিত রাখা উচিত।

সন্তানকে এই মানসিক আসক্তি থেকে বের করে আনতে কেবল বকাঝকা, মারধর বা জোর করে ফোন কেড়ে নেওয়াই যথেষ্ট নয়, বরং বৈজ্ঞানিক কিছু কৌশল অবলম্বন করতে হবে :সন্তানের প্রতিদিনের ফোন ব্যবহারের একটি নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দিন এবং তাকে ভার্চুয়াল লাইফে আত্মনিয়ন্ত্রণ শেখানো জরুরি। সন্তান যেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা শুধু রিলস বা নিউজফিড স্ক্রল না করে, বরং প্রয়োজনে বা নির্দিষ্ট কোনো শিক্ষণীয় উদ্দেশ্যে ইতিবাচকভাবে ইন্টারনেট ব্যবহার করে, সেদিকে নজর রাখুন।পড়াশোনা, খাবার টেবিল বা ঘুমানোর সময় ফোনের সব ধরণের নোটিফিকেশন বন্ধ রাখার পারিবারিক অভ্যাস গড়ে তুলুন।আসক্তি যদি কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তবে বাইরের পেশাদার সাহায্য নিতে হবে। অনেক সময় লজ্জা না পেয়ে মানসিক চিকিৎসকের (কাউন্সেলর) পরামর্শ বা উপযুক্ত থেরাপির ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

বিশেষজ্ঞরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলছেন, বড় বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো তাদের প্ল্যাটফর্মের ক্ষতিকর ও আসক্তিপূর্ণ দিকগুলো খুব ভালো করে জেনেও কেবল নিজেদের কর্পোরেট মুনাফার স্বার্থে কিশোর-কিশোরীদের টার্গেট করে কন্টেন্ট সাজিয়ে যাচ্ছে। তাই সন্তানদের এই ফাঁদ থেকে নিরাপদ ও সুস্থ রাখতে এই মুহূর্তে কঠোর পারিবারিক সচেতনতা ও বন্ধুসুলভ আচরণের কোনো বিকল্প নেই।

জান্নাত সকালবেলা

মন্তব্য করুন