কেন আপনার ধনী ব্যক্তিকে বিয়ে করা উচিত
আজ সোমবার (৮ জুন) দুপুর ১২টা ১৪ মিনিটে অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত ‘আধুনিক জীবনধারা, সম্পর্ক ও মনস্তত্ত্ব, সমসাময়িক ক্যারিয়ার ডায়েরি’ এবং ‘আদালতের ডায়েরি, বিবাহবিচ্ছেদ ট্র্যাকিং, বৈবাহিক আইন ও পরামর্শ উইং’ বিভাগের বিশেষ যৌথ বুলেটিংয়ে আইনজীবী লেনা নগুয়েনের সেই ভাইরাল বক্তব্যের ভেতরের মনস্তাত্ত্বিক ও লজিস্টিক কারণগুলো বিস্তারিত তুলে ধরা হলো।
আইনজীবী লেনা নগুয়েন, যিনি দীর্ঘ ক্যারিয়ারে পারিবারিক আদালতে মানুষের ভালোবাসা ম্লান হয়ে যাওয়া এবং কেবল তীব্র আর্থিক সংগ্রামের কারণে সুন্দর সুন্দর সম্পর্ক তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তে কালো ছায়া প্রত্যক্ষ করেছেন, তিনি অত্যন্ত যুক্তি দিয়ে বলেন—বিয়ে যতটা না একটি মানসিক প্রতিশ্রুতি, তার চেয়েও অনেক বেশি একটি গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক বা লজিস্টিক ব্যবস্থা। তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, “একটু গভীরভাবে ভাবুন তো, আপনি খুব ভালোবেসে কাউকে বিয়ে করলেন এবং সময়ের ব্যবধানে দেখলেন আপনার সন্তানদের মধ্যে অপার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু পর্যাপ্ত টাকা না থাকায় আপনি তাদের ভালো স্কুলে বা উচ্চশিক্ষার জন্য সঠিক সময়ে সঠিক ভরণপোষণ করতে পারছেন না। একজন অভিজ্ঞ বিবাহবিচ্ছেদ আইনজীবী হিসেবে, আমি বাস্তব জীবনে ঠিক এই করুণ মুহূর্তটি প্রতিদিন ঘটতে দেখছি, যা মানুষ সামাজিক লজ্জার ভয়ে সহজে স্বীকার করতে চায় না। তাই স্পষ্ট ভাষায়, বিয়ে আদতে একটি বিশেষ ব্যবসায়িক চুক্তি ছাড়া আর কিছুই নয়।”
আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় বিয়েকে সবসময় একটি অতি-আবেগীয় ও অবাস্তব দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে অভ্যস্ত করা হয়েছে। সিনেমা-নাটক বা রোমান্টিক কমেডি ঘরানার চলচ্চিত্রে সবসময় দেখানো হয় নিজের মনকে বা প্রেমকে অনুসরণ করতে এবং এর সাথে জড়িত বৈষয়িক বা অর্থ-সম্পত্তির বিষয়গুলোকে খুব ছোট করে দেখতে। কিন্তু রুপালি পর্দার সেই ফর্মুলা বাস্তব জীবনের কঠিন পিচে এসে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মুখ থুবড়ে পড়ে। লেনা নগুয়েন বলেন, “আমরা ভালোবাসার জন্য বিয়ে করার এই সনাতন ধারণাটিকে এমন অবাস্তবভাবে রোমান্টিক করে তুলি, যেন এটি একজন মানুষের নেওয়া সবচেয়ে মহৎ ও ত্যাগের সিদ্ধান্ত। ‘নিজের মনকে অনুসরণ করুন, অর্থকে উপেক্ষা করুন, সৃষ্টিকর্তা সবকিছু ঠিক করে দেবেন’—এসব শুনতে ও পড়তে দারুণ চমৎকার লাগে, কিন্তু রূঢ় বাস্তবতা একেবারেই ভিন্ন ও নিষ্ঠুর হয়ে দাঁড়ায়।”
যুক্তি ও সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে চিন্তা করলে দেখা যায়, সন্তান লালন-পালনের জন্য শুধু মানসিক বা আবেগীয় ইনভেস্টমেন্ট যথেষ্ট নয়। আপনার সন্তান কি কখনো বড় হয়ে এটা মন থেকে মেনে নিতে পারবে যে, সে বন্ধুদের সাথে কোনো ভালো শিক্ষাসফরে (Study Tour) বা দেশের বাইরে যেতে পারছে না কারণ তার বাবা-মা অনেক ভালোবেসে বিয়ে করেছিল, কিন্তু তাদের পকেটে টাকা নেই? কোনো পরিমাণ ভালোবাসাই টাকার এই বস্তুগত অভাব পূরণ করতে পারে না। আইনজীবী লেনার মতে, “আমি যখন এই কথাটি প্রকাশ্যে বলি তখন অনেকেই আমাকে অপছন্দ করেন, কিন্তু সত্য হলো শিশুরা অত্যন্ত বস্তুবাদী হয়। এর মানে এই নয় যে তারা লোভী বা অতিরিক্ত আদুরে, বরং তারা অত্যন্ত গভীর পর্যবেক্ষণশীল। শিশুরা এই বাস্তব রুক্ষ জগতে বাস করে। তারা খুব কাছ থেকে দেখে তাদের কোন কোন সহপাঠী দামি ট্যুরে যায়, কারা নামী ইনস্টিটিউটে গানের ক্লাস করে, কারা ছুটিতে বিদেশে ভ্রমণ করে কিংবা কাদের জন্য দামি গৃহশিক্ষক রাখা হয়। শিশুরা নিজের সম্ভাবনা এবং সুযোগের মধ্যের আকাশ-পাতাল তফাতটা খুব সহজেই বুঝতে পারে।”
একটু বাস্তববাদী হয়ে ভাবুন, আপনার সন্তান হয়তো ভীষণ মেধাবী, কৌতূহলী, প্রতিভাবান এবং অফুরন্ত প্রাণশক্তিতে ভরপুর। সে হয়তো গণিত, কোনো বিশেষ খেলাধুলা কিংবা চিত্রশিল্পে বিশ্বমানের অসাধারণ যোগ্যতা রাখে। কিন্তু ঠিক তখনই আপনি বুঝতে পারলেন যে, কেবল আপনার পকেটের শূন্যতাই আপনার সন্তানকে তার সেই মহামূল্যবান স্বপ্ন থেকে চিরতরে দূরে সরিয়ে রাখছে। একজন বাবা বা মা হিসেবে তখন নিজের সন্তানকে একটা সীমাবদ্ধতার দেয়ালের মধ্যে স্বপ্ন দেখতে বাধ্য করা কতটা নির্মম হতে পারে, তা ভুক্তভোগী মাত্রই জানেন। শিশুরা বাবা-মায়ের অতীত প্রেমের গল্প নিয়ে সারাদিন মাথা ঘামায় না; তারা প্রধানত ভাবে তারা ঠিক কোন সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবেশে বড় হচ্ছে এবং তাদের ভবিষ্যতের জন্য কোন কোন বন্ধ দরজাগুলো খোলা আছে। কোনো শিশুই বিষণ্ন মনে ঘরে বসে ভাবে না যে, ‘ধ্যাত! ভালো কোনো সুযোগ না পেলেও অন্তত আমার বাবা-মা ভালোবেসে বিয়ে করেছিল!’ বরং তারা নিজেকে অন্যদের সাথে তুলনা করে ক্ষোভে ফেটে পড়ে।
আইনজীবী লেনা নগুয়েন তাঁর দীর্ঘ আলোচনার শেষ প্রান্তে এসে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভারসাম্যপূর্ণ বিশ্লেষণ দিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট করেছেন, এর মানে এই নয় যে আপনি নিজের আবেগ বা আত্মিক টানকে বিসর্জন দিয়ে কেবল একজন অসৎ বা মন্দ ধনী ব্যক্তির পেছনে ছুটবেন। কিন্তু আপনি যখন আপনার চূড়ান্ত জীবনসঙ্গী বা পার্টনার নির্বাচন করবেন, তখন অবশ্যই নিশ্চিত হয়ে নেবেন যে তাঁর আর্থিক স্থিতিশীলতা এবং জীবনযাত্রার মান আপনার বর্তমান বা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না। কারণ শেষ বিচারে এই পুঁজিবাদী দুনিয়ায় টাকাই আসল গতি নির্ধারণ করে। টাকা হয়তো পৃথিবীর সমস্ত মানসিক সুখ বা শান্তি রাতারাতি কিনে দিতে পারে না, কিন্তু এটি জীবনের প্রতি চরণের কঠিনতম পথগুলোকে অনেক বেশি সহজ ও মসৃণ করে তোলে। লেনা বলেন, “আপনি যখন সন্তান লালন-পালনের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করছেন, তখন টাকা কোনো বড় ব্যাপার নয়—এমন ভান করাটা কোনো রোমান্টিকতা নয়, বরং এটি চরম নির্বুদ্ধিতা। সম্পদ বা অর্থ ছাড়া মানুষের ভেতরের সুপ্ত সম্ভাবনা হলো ঠিক একটি ‘জ্বালানিবিহীন ফেরারি গাড়ি’র মতো; যা দেখতে অত্যন্ত সুন্দর, আকর্ষণীয় ও শক্তিশালী মনে হলেও বাস্তবে এক ইঞ্চিও সামনে এগোতে পারে না।” তাই আবেগ ও আর্থিক সক্ষমতার এই মেলবন্ধনই একটি সুখী দাম্পত্যের আসল মূলমন্ত্র।
জান্নাত সকালবেলা
|