বেরোবিতে ছাত্রদল-শিবির সংঘর্ষ, রংপুরে দিনভর উত্তেজনা
আবু রায়হান, রংপুর ব্যুরো: বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে (বেরোবি) ‘জুলুমের বিরুদ্ধে জুলাই’ প্রদর্শনীতে জুডিশিয়াল কিলিং বিষয়ক ব্যানার সরানোকে কেন্দ্র করে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে শিক্ষকসহ উভয় পক্ষের অন্তত ২০ জন আহত হয়েছেন। সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ক্যাম্পাসে বহিরাগত প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। একই সাথে ঘটনাটি তদন্তে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
সোমবার (৩ আগস্ট) রাত ৯টা থেকে রাত ১টা পর্যন্ত ক্যাম্পাসের স্বাধীনতার স্মারক চত্বর ও মূল ফটক এলাকায় এসব সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পরে এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) দিনভর পুরো রংপুর নগরী জুড়েই থমথমে পরিস্থিতি ও তীব্র উত্তেজনা বিরাজ করে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ইসলামী ছাত্রশিবির 'জুলুমের বিরুদ্ধে জুলাই' প্রদর্শনীর আয়োজন করে। সেখানে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত ও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত কয়েকজন বিএনপি ও জামায়াত নেতার ছবিসংবলিত একটি ব্যানার টাঙানো হয় এবং একে ‘জুডিশিয়াল কিলিং’ হিসেবে দাবি করা হয়। রাত ৯টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সভাপতি ইয়ামিন ও সাধারণ সম্পাদক জহীর রায়হানের নেতৃত্বে নেতা-কর্মীরা সেখানে গিয়ে ওই ব্যানার সরাতে পাঁচ মিনিটের সময় বেঁধে দেন। শিবিরের নেতা-কর্মীরা তাতে অপারগতা জানালে বাকবিতণ্ডার একপর্যায়ে সংঘর্ষের সূচনা ঘটে। দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও হামলার ঘটনায় পুরো ক্যাম্পাস রণক্ষেত্রে পরিণত হয়।
সংঘর্ষের খবরে রাত সাড়ে ১০টার দিকে ক্যাম্পাসে আসেন উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম শওকত আলী। তিনি অবরুদ্ধ নেতাদের উদ্ধার করে উভয় পক্ষের দায়িত্বশীল নেতা ও শহরের জ্যেষ্ঠ রাজনীতিবিদদের নিয়ে সিন্ডিকেট কক্ষে বৈঠক করেন। বৈঠকে সমঝোতা হলেও পরবর্তীতে রাত পৌনে ১টার দিকে প্রধান ফটকের সামনে পুনরায় সংঘাত বাঁধে। পরে রংপুর মহানগর অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার তোফায়েল আহমদের নেতৃত্বে বিপুল পুলিশ ও গোয়েন্দা সদস্য ঘটনাস্থলে পৌছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন।
এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ফেরদৌস রহমান, সাবেক শিবির সভাপতি সোহেল রানাসহ অন্তত ২০ জন আহত হয়েছেন। প্রক্টর অধ্যাপক ফেরদৌস রহমান বলেন, "আমাকে না জানিয়ে ছাত্রদল ব্যানার সরানোর চেষ্টা করলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এ ঘটনায় আমি নিজেও ইটের আঘাতে আহত হয়েছি। পরিস্থিতি বিবেচনায় তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।"
সংঘর্ষের প্রতিবাদে মঙ্গলবার উভয় পক্ষই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে অবস্থিত শহীদ আবু সাঈদ চত্বরে পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি ঘোষণা করে। অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আবু সাঈদ চত্বরে ১৪৪ ধারা জারির আবেদন জানালে মহানগর পুলিশ উভয় পক্ষের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে তাদের সমাবেশের স্থান পরিবর্তন করায়।
বিকেল চারটা থেকে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের পাশাপাশি জেলা ও মহানগর ছাত্রদল, যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা-কর্মীরা প্রধান ফটক এলাকায় লাঠিসোটা নিয়ে অবস্থান নেন। সেখান থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়। রংপুর জেলা যুবদলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক জহির আলম নয়ন অভিযোগ করে বলেন, "ছাত্রশিবির বিগত ১৭ বছর লুকিয়ে থেকে ছাত্রলীগের আশ্রয়ে রাজনীতি করেছে। এখন তারা আবারও ক্যাম্পাসে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড শুরু করেছে। সাধারণ শিক্ষার্থীদের সাথে নিয়ে তাদের শক্ত হাতে প্রতিরোধ করা হবে।" অন্যদিকে, বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদল সভাপতি মোহাম্মদ ইয়ামিন অভিযোগ করেন, যুদ্ধাপরাধীদের ছবি প্রদর্শনী থেকে নামাতে বলায় শিবির কর্মীরা তাদের ওপর সশস্ত্র হামলা চালিয়েছে।
অপরদিকে, বিকেল ছয়টায় নগরীর লালবাগ থেকে পাল্টাসূচ্যে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করে মহানগর ছাত্রশিবির। মিছিলটি শাপলা চত্বরে গিয়ে সংক্ষিপ্ত সমাবেশের মাধ্যমে শেষ হয়। সমাবেশে মহানগর ছাত্রশিবিরের সভাপতি আনিসুর রহমান অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, "১৭ বছরের বিচারহীনতা ও জঘন্য হত্যাকাণ্ডের চিত্র তুলে ধরতে এই প্রদর্শনী করা হয়েছিল। কিন্তু ছাত্রদল ছাত্রলীগের মতো দখলদারি ও সন্ত্রাসী কায়দায় তা পণ্ড করার চেষ্টা করেছে।" শাখা শিবিরের সভাপতি রাকিব মুরাদ জানান, তাঁদের অন্তত ১৫ জন নেতা-কর্মী হামলায় আহত হয়েছেন।
রংপুর মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার তোফায়েল আহমেদ জানান, প্রশাসন ও দলগুলোর জ্যেষ্ঠ নেতাদের সহায়তায় বলপ্রয়োগ ছাড়াই পরিস্থিতি শান্ত করা সম্ভব হয়েছে। বর্তমানে ক্যাম্পাসের আশপাশে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য ড. এম শওকত আলী জানান, সার্বিক ঘটনা তদন্তে কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে কার্যকর প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
এআইএল/সকালবেলা
|