রংপুরের জুলাই শহীদদের স্বজনদের আর্তনাদ, বিচার কবে মিলবে!
দুই বছর পরও নিহতদের পরিবারের একটাই প্রশ্ন, বিচার কবে হবে?
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬, ০১:২৬ অপরাহ্ণ
- দুই বছরেও শেষ হয়নি তদন্ত, বিচার অধরাই
- ১৯ জুলাই পুলিশের গুলিতে নিহত চারজন
- ১৮ জুলাই নিহত আরও একজন
- ছয় হত্যা মামলার তদন্ত শেষ না হওয়ায় ক্ষোভ স্বজনদের
- দ্রুত বিচার, রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও পুনর্বাসনের দাবি
আবু রায়হান, রংপুর ব্যুরো : জুলাই ফিরে এসেছে আবারও। ক্যালেন্ডারের হিসাবে পেরিয়ে গেছে দুই বছর। কিন্তু রংপুরের সেই রক্তাক্ত ১৮ ও ১৯ জুলাইয়ের স্মৃতি এখনো তাজা শহীদ পরিবারের কাছে। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে পুলিশের গুলিতে নিহত পাঁচজনের স্বজনেরা আজও অপেক্ষা করছেন বিচার পাওয়ার আশায়। মামলার তদন্ত শেষ হয়নি, আদালতে জমা পড়েনি অভিযোগপত্র। ফলে বিচার নিয়ে অনিশ্চয়তা, হতাশা ও ক্ষোভ দিন দিন আরও গভীর হচ্ছে।
২০২৪ সালের ১৯ জুলাই রংপুর সিটি করপোরেশন এলাকায় পুলিশের গুলিতে নিহত হন সবজি বিক্রেতা সাজ্জাদ হোসেন (২৯), ফল ব্যবসায়ী মেরাজুল ইসলাম মেরাজ (৩৭), স্বর্ণশ্রমিক মোসলেম উদ্দিন মিলন (৩৫) এবং বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব গ্লাস অ্যান্ড সিরামিকসের শিক্ষার্থী আব্দুল্লাহ আল তাহির (২৮)। এর আগের দিন ১৮ জুলাই নগরীর মডার্ন মোড় এলাকায় সংঘর্ষে নিহত হন অটোরিকশাচালক মানিক মিয়া।
দুই বছর পরও নিহতদের পরিবারের একটাই প্রশ্ন, বিচার কবে হবে?
শহীদ মেরাজুল ইসলামের মা আম্বিয়া বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, "সরকার কি জুলাই গণহত্যার বিচার করবে? ছেলেকে হারানোর দুই বছর হয়ে গেল, এখনও মামলার তদন্ত শেষ হয়নি। আমি কার কাছে বিচার চাইব? শুধু আশ্বাস দিয়ে গেছে সবাই। আমি কিছু চাই না, শুধু ছেলে হত্যার বিচার দেখে মরতে চাই।"
তিনি জানান, ছেলে নিহত হওয়ার পর শুরুতে বিভিন্ন জায়গা থেকে খোঁজখবর নেওয়া হলেও এখন আর কেউ আসেন না। ছেলে হারানোর পাশাপাশি ছেলের স্ত্রী ও নাতিদের থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন তিনি।
মেরাজের বড় বোন রাবেয়া বেগম অভিযোগ করেন, হত্যা মামলা প্রত্যাহারের জন্য তাদের পরিবারের ওপর বিভিন্নভাবে চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে। তিনি বলেন, "আমরা কোনো অর্থ চাই না। শুধু হত্যাকারীদের বিচার চাই।"
একইভাবে শহীদ সাজ্জাদ হোসেনের মা ময়না বেগমও আজও ভুলতে পারেননি সেই বিকেলকে। তিনি বলেন, ছেলে সেদিন জুমার নামাজ পড়ে বাজারে সবজি কিনতে গিয়েছিল। সন্ধ্যায় বাড়িতে ফিরেছিল সবজির ব্যাগ নয়, লাশ হয়ে।
ময়না বেগম সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, তার ছেলের হত্যার বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি নাতনি ও পুত্রবধূর ভবিষ্যৎ নিরাপদ করতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
সাজ্জাদের স্বজনরা জানান, তিনি ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। ভ্যানে শাক-সবজি বিক্রির পাশাপাশি রাজমিস্ত্রির কাজও করতেন। তার মৃত্যুর পর পুরো পরিবার চরম আর্থিক সংকটে পড়ে।
শহীদ মেরাজুল ইসলামের স্ত্রী নাজমিন ইসলাম জানান, যেদিন তার স্বামী নিহত হন, সেদিনই ছিল তাদের ১৮তম বিবাহবার্ষিকী।
তিনি বলেন, "আমার জন্য নতুন থ্রি-পিস কিনে এনেছিলেন। রাতে একসঙ্গে বের হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেই দিনই পুলিশের গুলিতে তিনি মারা যান। এখন দুই সন্তানকে নিয়ে অনেক কষ্টে সংসার চালাচ্ছি। যে ভাতা পাই, তা দিয়ে চলা কঠিন। সবচেয়ে বড় কষ্ট, এখনও হত্যার বিচার শুরু হয়নি।"
স্বর্ণশ্রমিক মোসলেম উদ্দিন মিলনের স্ত্রী দিলরুবা আক্তার বলেন, স্বামী নিহত হওয়ার পর শুধু পরিবার নয়, তাদের নিরাপত্তাও হুমকির মুখে পড়ে। দাফনের পর যৌথ বাহিনীর অভিযানের কারণে কয়েকদিন আত্মগোপনে থাকতে হয়েছিল বলেও দাবি করেন তিনি।
তার ভাষায়, "আমার স্বামী আমাদের পরিবারের ছাদ ছিলেন। শুধু ভাতা বা অনুদান নয়, আমরা বিচার চাই। বিচার ছাড়া কোনো সান্ত্বনাই পূর্ণতা পাবে না।"
অন্যদিকে শহীদ আব্দুল্লাহ আল তাহিরের বাবা আব্দুর রহমান বলেন, তার ছেলে বৈষম্যহীন ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রের স্বপ্ন নিয়ে আন্দোলনে অংশ নিয়েছিল। তিনি বলেন, "আমার ছেলে দেশের জন্য জীবন দিয়েছে। তার আত্মা তখনই শান্তি পাবে, যখন এই হত্যাকাণ্ডের বিচার হবে এবং দেশে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে।"
নিহতদের স্বজনদের দাবি, ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর তারা একে একে ছয়টি হত্যা মামলা করেন। এসব মামলায় তৎকালীন প্রশাসন, পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীসহ মোট ২ হাজার ৬৩৬ জনকে আসামি করা হয়।
পুলিশের তথ্যমতে, এ পর্যন্ত সাবেক সমাজকল্যাণমন্ত্রী নুরুজ্জামান আহমেদসহ ১২৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে অভিযুক্ত কোনো ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা কিংবা প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। চারটি মামলার তদন্ত করছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।
রংপুর সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার সুমিত চৌধুরী জানান, তদন্তে গুলিবর্ষণকারীদের শনাক্ত করা হয়েছে এবং একজন আসামি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছেন। অভিযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিলের অনুমোদন পাওয়া গেলেও প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে সংস্থাটি।
তিনি বলেন, প্রয়োজনীয় অনুমোদন পাওয়া গেলে এক মাসের মধ্যেই আদালতে চার্জশিট দাখিল করা সম্ভব হবে।
এদিকে রংপুরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রুহুল আমিন বলেন, জেলা প্রশাসন নিয়মিত শহীদ পরিবারগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে এবং তাদের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে কাজ করছে। পাশাপাশি সরকারি কর্মসূচিগুলোতেও শহীদ পরিবারকে সম্পৃক্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
২০২৪ সালের ১৮ ও ১৯ জুলাই রংপুরে সংঘটিত সহিংসতায় নিহতদের স্বজনদের অভিযোগ, শুরুতে নানা আশ্বাস মিললেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তারা অনেকটাই উপেক্ষিত হয়ে পড়েছেন। বিচার প্রক্রিয়ার ধীরগতি, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ এখন তাদের নিত্যসঙ্গী।
জুলাইয়ের এই সময়ে তাদের প্রত্যাশা একটাই, দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে দ্রুত তদন্ত শেষ হোক, আদালতে অভিযোগপত্র জমা পড়ুক এবং হত্যাকাণ্ডের বিচার শুরু হোক। তাদের বিশ্বাস, ন্যায়বিচার নিশ্চিত হলেই প্রিয়জন হারানোর বেদনা হয়তো কখনো মুছে যাবে না, কিন্তু রাষ্ট্রের প্রতি আস্থার একটি ভিত্তি অন্তত ফিরে আসবে।
|