নিজের জমির মাটি কেটে কারাগারে মসজিদের ইমাম

প্রকাশ: সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬, ০২:৪৮ অপরাহ্ণ
নিজের জমির মাটি কেটে কারাগারে মসজিদের ইমাম

মনজুরুল ইসলাম, লালমনিরহাট জেলা প্রতিনিধি: লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলায় পৈতৃক জমির মাটি কাটাকে কেন্দ্র করে এক ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান এবং ৭৫ বছর বয়সী সাবেক এক ইমামকে কারাদণ্ড দেওয়ার ঘটনায় এলাকায় তীব্র ক্ষোভ ও মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। প্রশাসনের দাবি— তিনি শর্ত ভঙ্গ করে অতিরিক্ত গভীরতায় মাটি কেটেছেন; তবে পরিবারের অভিযোগ— আগের ঘটনার পুরনো খননকেই নতুন অপরাধ হিসেবে দেখিয়ে তাঁকে দ্বিতীয়বার অন্যায়ভাবে শাস্তি দেওয়া হয়েছে।

দণ্ডিত আবিদুল ইসলাম উপজেলার লতাবর আদর্শপাড়া গ্রামের বাসিন্দা এবং স্থানীয় একটি মসজিদের সাবেক ইমাম। বর্তমানে তিনি জেলা কারাগারে রয়েছেন।

পরিবারের সদস্যরা জানান, বৃদ্ধ আবিদুল ইসলাম নিজের বাড়ি নির্মাণের জন্য পৈতৃক ভিটায় মাটি ভরাটের উদ্দেশ্যে গত ৪ জুন নিজ জমি থেকে কিছু মাটি কাটেন। ওই সময় ভ্রাম্যমাণ আদালত এসে অনুমতি ছাড়া মাটি কাটার দায়ে তাঁকে ৫ হাজার টাকা জরিমানা করেন। এরপর তিনি যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শামিমা আক্তার জাহানের কাছ থেকে লিখিত অনুমতি নেন। অনুমতিপত্রে আশপাশের জমির ক্ষতি না করে সর্বোচ্চ ২ ফুট গভীরতায় মাটি কাটার অনুমোদন দেওয়া হয়।

স্বজন ও স্থানীয়দের দাবি, ইউএনওর অনুমতি পাওয়ার পর আগের ৫ ফুট গভীর খনন করা অংশে আর কোনো মাটি কাটা হয়নি। তার পাশ দিয়ে নতুন করে নির্দেশিকা মেনে ২ ফুট গভীরতায় কাজ চলছিল। কিন্তু গত ২৬ জুন জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত এসে আগের সেই পুরনো ৫ ফুট গভীরতার খননটিকেই নতুন অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করেন। এই বিপুল পরিমাণ জরিমানার টাকা তাৎক্ষণিক পরিশোধ করতে না পারায় বৃদ্ধকে ১৫ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দিয়ে জেলা কারাগারে পাঠানো হয়।

অন্য দিকে জেলা প্রশাসনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ২৬ জুন উপজেলার চন্দ্রপুর এলাকায় সরকারি নির্দেশ অমান্য করে অবৈধভাবে মাটি উত্তোলনের অভিযোগ পেয়ে ঘটনাস্থলে যান এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট পারভেজ খান ও মো. মামুনুর রশিদ। সেখানে গিয়ে তাঁরা দেখতে পান, ২ ফুট মাটি কাটার অনুমতি থাকলেও আবিদুল ইসলাম প্রায় ৫ ফুট পর্যন্ত মাটি উত্তোলন করেছেন। ঘটনাস্থলে ট্রাক্টরসহ মাটি কাটার বিভিন্ন আলামতও পাওয়া যায়।

পরে 'বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০'-এর ১৫(১) ধারায় তাকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা ও অনাদায়ে ১৫ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। জেলা প্রশাসনের দাবি, জরিমানার অর্থ আদায়কে কেন্দ্র করে অভিযুক্তের কয়েকজন স্বজন স্থানীয় লোকজন জড়ো করে মোবাইল কোর্ট টিমকে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলে সাময়িক উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট পারভেজ খান বলেন, "এ বিষয়ে জানতে হলে জেলা প্রশাসকের সঙ্গে কথা বলতে হবে। আমাদের সংবাদমাধ্যমে সরাসরি বক্তব্য দেওয়ার অনুমতি নেই।"

এদিকে এই সাজার প্রতিবাদে গত শুক্রবার স্থানীয় বাসিন্দাদের ব্যানারে এলাকায় একটি বিশাল মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। মানববন্ধনে বক্তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "নিজেদের বাড়ি করার জন্য নিজেদের জমির মাটি কাটতে গিয়ে জেল খাটতে হচ্ছে— আমরা কোন দেশে বাস করছি?"

ইউএনওর লিখিত অনুমতি থাকার পরেও জেলা থেকে ম্যাজিস্ট্রেট এসে ৭৫ বছর বয়সী একজন বৃদ্ধ সাবেক ইমামকে এভাবে জরিমানা ও জেলে পাঠানোর তীব্র নিন্দা জানান এলাকাবাসী। একই সঙ্গে তাঁরা আবিদুল ইসলামের অবিলম্বে মুক্তি এবং এই ঘটনার একটি নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেন।

এআইএল/সকালবেলা

মন্তব্য করুন