ঈশ্বরদীতে আধুনিক অটো মিলের দাপটে বন্ধ পাঁচ-ষষ্ঠাংশ হাসকিং মিল
· অটো মিলের দাপট: ঈশ্বরদীর পাঁচ-ষষ্ঠাংশ হাসকিং মিলই এখন বন্ধ
· ঈশ্বরদীতে অস্তিত্ব সংকটে ছোট চালকল: বন্ধ হয়ে গেছে ৬ ভাগের ৫ ভাগ মিলই
· ঈশ্বরদীর হাসকিং মিলে ধস: প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে বন্ধ পাঁচ-ষষ্ঠাংশ
· অটো রাইস মিলের গ্রাসে ঈশ্বরদীর ঐতিহ্যবাহী হাসকিং মিল
· পাঁচ-ষষ্ঠাংশ চালকল বন্ধ: ঈশ্বরদীতে হাজারো শ্রমিকের পেশা বদলের লড়াই
· চাতাল আছে, চাল নেই: ঈশ্বরদীর ছোট চালকলগুলোতে এখন শুধুই নীরবতা
মো. হাসান ইসলাম, পাবনা জেলা প্রতিনিধি:
উত্তরের শস্যভান্ডার খ্যাত পাবনার ঈশ্বরদীতে এক সময় অত্যন্ত প্রাণবন্ত ছিল ছোট ছোট চালকল বা হাসকিং মিলগুলো। কিন্তু আধুনিক অটো রাইস মিলের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পটি এখন পুরোপুরি মুখ থুবড়ে পড়েছে। লোকসানের মুখে পড়ে অনেক মিল মালিক ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছেন, কেউ কেউ মিল ভাড়া দিয়েছেন, আবার কেউবা টিকে থাকার শেষ চেষ্টায় চাতালগুলোতে চালের পরিবর্তে ধানের চিটা থেকে গুঁড়া তৈরি করছেন। আর কর্মসংস্থান হারিয়ে জীবিকার তাগিদে পেশা বদলাতে বাধ্য হচ্ছেন হাজারো চাতাল শ্রমিক।
ধান উৎপাদনকারী অঞ্চল হওয়ায় এক সময় ঈশ্বরদী উপজেলাজুড়ে প্রচুর হাসকিং মিল গড়ে উঠেছিল। বিশেষ করে ঈশ্বরদী শহর থেকে রূপপুর যাওয়ার পথে আঞ্চলিক মহাসড়কের দুই পাশে চোখ মেললেই দেখা যেত সারিসারি হাসকিং মিলের চাতাল। মাত্র কয়েক বছর আগেও এই উপজেলায় প্রায় ৬০০টি হাসকিং মিল সচল ছিল, যা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ২০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের জোগান দিত।
তবে সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে উপজেলায় নতুন করে ১৭টি বড় বড় অটো রাইস মিল চালু হয়েছে। বর্তমানে এই অটো রাইস মিলগুলো পুরোদমে ব্যবসা সফল হলেও হাসকিং মিলগুলোর প্রায় পাঁচ-ষষ্ঠাংশই (ছয় ভাগের পাঁচ ভাগ) বন্ধ হয়ে গেছে। আর যে অল্প কয়েকটি মিল এখনো কোনোমতে টিকে রয়েছে, সেগুলোর অর্থনৈতিক অবস্থাও অত্যন্ত নাজুক। ফলে ঈশ্বরদীর এক সময়ের ঐতিহ্যবাহী ও সম্ভাবনাময় এই গ্রামীণ শিল্পটি এখন চরম অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে।
মোছা. সাজেদা হাসকিং মিল শ্রমিক জানান, আমার সংসারে আজ উপার্জন করার মতো কোনো পুরুষ মানুষ নেই। আমার মেয়ে ও জামাই দুজনেই মারা গেছে; তাদের রেখে যাওয়া এই এতিম নাতি-নাতনিগুলো এখন আমার কাছেই থাকে। আমার স্বামীও আজ বৃদ্ধ ও অক্ষম, কোনো কাজ করে আয় করার ক্ষমতা তার নেই। এই পরিস্থিতিতে হাসকিং মিলের কাজটাই আমাদের পুরো পরিবারের বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন।
তিনি আরও বলেন, এই হাসকিং মিলটা বন্ধ হয়ে গেলে এই পিতৃহীন-মাতৃহীন অবুঝ বাচ্চাগুলোকে নিয়ে আমি কোথায় যাবো? যেদিন মিলে কাজ থাকে, সেদিন কোনো রকমে আমাদের পেট চলে। আর যেদিন কাজ থাকে না, সেদিন আমার এই এতিম নাতি-নাতনিগুলো না খেয়ে থাকে, ওদের মুখে দুমুঠো অন্ন তুলে দেওয়ার সাধ্যও আমার থাকে না।
আমার নিজের কোনো ছেলেও নেই যে এই বয়সে আমাদের কামাই করে খাওয়াবে। এই হাসকিং মিলটাই আমাদের বেঁচে থাকার শেষ সম্বল। যদি এই শেষ সম্বলটুকুও বন্ধ হয়ে যায়, তবে সন্তানদের নিয়ে আমাদের না খেয়ে মরা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না।
মো. মোশারফ হাসকিং মিল শ্রমিক বলেন, কষ্টের কথা আর কী কবো ভাই, এই হাসকিং মিল ১২ মাসের মধ্যে মোটে ৩ মাস চলে। ছাওয়াল-পাওয়াল নিয়ে খুব কষ্টে দিন কাটাচ্ছি। কাম-কাজ নাই, দুড্যা ভাত মুখে তুলে দিতেই হিমশিম খাচ্ছি, আর তেনাগের লেখাপড়া করানো তো আমাগের চোহে এখন বিলাসিতা!
আগে যখন মিলডা জমজমাট চলতো, তখন কত ভালোভাবেই না দিনপার করছি। আর এখন আল্লাহ কোনো রকম জীবনড্যা বাঁচায়ে রাখছে, এই যা!
মোঃ মিরাজুল ইসলাম হাসকিং মিল শ্রমিক বলেন, আমরা গরিব মানুষ ভাই, আমাগের দিকে সরকার চায় না। চাইলে কি আর আজ আমাগের পেটে লাথি পড়তো? চোর-বাটপারি তো করি না, মেহনত করে খাই—আজ সেই কর্মডাও করতে পারছি না। কী কবো কন? মিল মালিকরা যদি না বাঁচে, তবে আমাগের মতো চাতাল শ্রমিকরা বাঁচবো কী করে? মালিকগের ভাত নাই, তো আমাগের পেটে পাথর!
ঈশ্বরদী উপজেলার জয়নগর এলাকার চালকলের মালিক মো. আবজাল হোসেন বলেন, আমি দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে হাসকিং মিলের মাধ্যমে চাল উৎপাদন ব্যবসার সাথে যুক্ত আছি। এক সময় আমাদের এই ব্যবসা অত্যন্ত লাভজনক ছিল। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে বাজারে আধুনিক অটো রাইস মিল চালু হওয়ার পর থেকে আমাদের হাসকিং মিলের অবস্থা ক্রমশ খারাপ হতে শুরু করে।
অটো রাইস মিলে আধুনিক প্রযুক্তির কারণে খুব অল্প সময়ে বিপুল পরিমাণ চাল উৎপাদন করা সম্ভব হয়, যা আমাদের হাসকিং মিলের সনাতন পদ্ধতিতে অনেক বেশি সময় ও শ্রম সাপেক্ষ। প্রযুক্তির এই অসম প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে এক পর্যায়ে একের পর এক হাসকিং মিল বন্ধ হতে থাকে। আর মিলগুলো বন্ধ হওয়ায় চাতালের হাজারো শ্রমিক জীবিকার তাগিদে অন্য সব পেশায় চলে যেতে বাধ্য হয়।
তিনি আরও বলেন, এমন চরম প্রতিকূলতার মাঝেও আমরা যারা এখনো এই পেশায় আছি, তারা হাসকিং মিলের চাল উৎপাদন ব্যবস্থাটিকে টিকিয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। তবে আমাদের এই একক চেষ্টা আর যথেষ্ট নয়। গ্রামীণ অর্থনীতির সাথে জড়িত এই শিল্পটিকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে এখন সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা জরুরি। সরকার যদি আমাদের জন্য স্বল্প সুদে বিশেষ ঋণ এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করে, তবেই আমরা এই ব্যবসায় টিকে থাকতে পারব। তা না হলে বর্তমানে যে কয়েকটি মিল কোনোমতে চালু আছে, সেগুলোও অচিরেই চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে।
আবদুল মালেক হাসকিং মিল মালিক বলেন, নব্বইয়ের দশক থেকে এই হাসকিং মিল ব্যবসার সাথে জড়িয়ে আছি; তখন আইকে রোডে এই ব্যবসা ছিল দারুণ জমজমাট। কিন্তু বর্তমানে আধুনিক অটো রাইস মিল চালু হওয়ায় আমাদের মতো ক্ষুদ্র ও ঐতিহ্যবাহী মিলগুলো ধুঁকে ধুঁকে মরছে, কাজ না থাকায় শ্রমিকরাও জীবিকার তাগিদে অন্য পেশায় চলে গেছে।
মূলত পুরো ব্যবসাই এখন বড়লোকদের হাতে চলে গেছে; আমাদের পুঁজি কম হওয়ায় অটো রাইস মিলের মতো আধুনিক ও ব্যয়বহুল যন্ত্রপাতি যেমন বসাতে পারছি না, তেমনি সরকারও বড় বড় অটো মিল মালিকদের লোন দিলেও আমাদের মতো ছোট ব্যবসায়ীদের কোনো লোন দেয় না।
কেবল অনেক আগে থেকে জড়িয়ে আছি বলেই আবেগ থেকে কোনো রকমে ব্যবসাটি ধরে রেখেছি; এখন মূলত সামান্য কিছু ধান কিনে অল্প চাউল উৎপাদন করি এবং বেশির ভাগ সময় ধানের চিটা থেকে গরুর খাদ্য ও গুঁড়ো তৈরি করে কোনোমতে স্বল্প পরিসরে টিকে আছি।
হানিফ মহলদ্বার হাসকিং মিল মালিক বলেন, ৬০০টি হাসকিং মিলের মধ্যে বর্তমানে মাত্র ১০০টির মতো চালু আছে। এর মূল কারণ—অটো রাইস মিলের আধুনিক প্রসেসিং ও কালার সর্টিং মেশিনের উচ্চ মূল্য, যা আমাদের মতো ক্ষুদ্র মিলারদের পক্ষে কেনা সম্ভব নয়। কালার সর্টিং মেশিন না থাকায় সরকার আমাদের থেকে চাল সংগ্রহ করে না। আবার অন্য জায়গা থেকে চাল প্রসেস করিয়ে আনলে কেজিতে ১-২ টাকা খরচ বেড়ে যায়, যা সরকারি মূল্যে সরবরাহ করলে আমাদের লোকসান হয়।
এই সুযোগে বড় অটো রাইস মিল মালিকরা একচেটিয়া ব্যবসা করছে, যার প্রভাব পড়ছে ভোক্তা পর্যায়ে এবং চালের দাম প্রায়ই নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, সরকার যদি ক্ষুদ্র ও মাঝারি হাসকিং মিলগুলোর আধুনিকায়নে "কালার সর্টিং" বা "রাইস প্রসেসিং" মেশিনের ওপর বিশেষ ভর্তুকি প্রদান করে, তবে আমরা আবার প্রতিযোগিতায় ফিরতে পারব। এতে একদিকে যেমন হাসকিং মিলের ঐতিহ্য টিকে থাকবে, অন্যদিকে চালের বাজারে সুস্থ প্রতিযোগিতা তৈরি হয়ে দাম নিয়ন্ত্রণে আসবে।
হাসকিং মিল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. দুলাল মন্ডল বলেন, একসময় ঈশ্বরদীতে প্রায় ৬০০টি হাসকিং মিল ছিল, বর্তমানে টিকে আছে মাত্র ৬০টির মতো। সরকারের পর্যাপ্ত সহযোগিতা না থাকায় এই শিল্প ধীরে ধীরে বিলুপ্তির পথে। মিল চালু থাকুক বা বন্ধ থাকুক, আয়কর, খাজনা, ট্রেড লাইসেন্স, বিদ্যুৎ বিল, পৌরকরসহ বিভিন্ন খরচ বহন করতে হয়। অথচ ব্যবসার অবস্থা খুবই খারাপ।
একটি হাসকিং মিলে প্রায় ২০ জন শ্রমিকের কর্মসংস্থান হয়। মিলগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনেক শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছেন এবং অনেক ব্যবসায়ী লোকসানের কারণে ব্যবসা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন।
সরকার যদি সহজ শর্তে ঋণ ও স্বল্পসুদে অর্থায়নের ব্যবস্থা করে, তাহলে এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে। অন্যথায় অবশিষ্ট মিলগুলোও অচিরেই বন্ধ হয়ে যাবে।
উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা মো. শাহিনুর আলম বলেন, হাসকিং মিল শিল্প উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে অটো রাইস মিলের সঙ্গে প্রতিযোগিতা, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং শ্রমিক সংকটের কারণে এ শিল্প আজ সংকটের মুখে। অনেক হাসকিং মিল ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে, আবার অনেক মিল টিকে থাকার জন্য সংগ্রাম করছে।
এ অবস্থায় সরকার শিল্পটিকে পুনরুজ্জীবিত করতে সহজ শর্তে ঋণসহ বিভিন্ন সহায়তা প্রদান করছে। পাশাপাশি সচল মিলগুলোকে টিকিয়ে রাখা এবং বন্ধ হয়ে যাওয়া মিলগুলো পুনরায় চালুর লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে, যাতে ব্যবসায়ীরা নতুন উদ্যমে এ খাত পরিচালনা করতে পারেন।
|