নতুন ভূমি অ্যাপ ও জিও ফেন্সিং প্রযুক্তিতে কতটুকু কমবে দুর্নীতি?
নিজস্ব প্রতিবেদক: দীর্ঘদিন ধরে ঘুষ, দুর্নীতি, দালালচক্র ও নানামুখী প্রশাসনিক জটিলতায় জর্জরিত দেশের ভূমি সেবাখাত। এর ফলে প্রয়োজনীয় সেবা পেতে প্রতিনিয়ত চরম ভোগান্তি ও হয়রানি পোহাতে হচ্ছে সাধারণ জনগণকে। এমন পরিস্থিতিতে ভূমি সেবাখাতের সব ধরনের অনিয়ম গোড়া থেকে উপড়ে ফেলতে যুগান্তকারী প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। জিও-ফেন্সিং প্রযুক্তি, বিশেষায়িত ‘ভূমি অ্যাপ’, অনলাইন নামজারি এবং মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের কর্মস্থলে উপস্থিতি পর্যবেক্ষণের মতো কড়া ডিজিটাল ব্যবস্থার মাধ্যমে এ খাতে দুর্নীতি ও জনভোগান্তি শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
তবে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) সাম্প্রতিক এক চাঞ্চল্যকর জরিপের তথ্য তুলে ধরে চলচ্চিত্র ও গণমাধ্যম সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভূমি খাতে দুর্নীতি আগের তুলনায় আরও উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। ফলে প্রযুক্তিগত সেবা দ্রুততর ও আধুনিক করলেও দেশের ভূমি অফিসের বহু বছরের শিকড় গেড়ে বসা ঘুষ ও অনিয়মের সংস্কৃতি ভাঙা এখনও সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন এই ডিজিটাল রূপান্তর প্রসঙ্গে বলেন, "সরকারের মূল লক্ষ্য হচ্ছে সেবাগ্রহীতার সঙ্গে ভূমি অফিসের কর্মকর্তাদের সরাসরি যোগাযোগ (ফিজিক্যাল কন্টাক্ট) সম্পূর্ণ কমিয়ে আনা। এর মাধ্যমে ভূমি সেবাকে আরও সহজ, দ্রুত ও স্বচ্ছ করা সম্ভব। দেশের যত বেশি মানুষ ডিজিটাল মাধ্যমে ঘরে বসে সেবা নেবেন, দুর্নীতি, মধ্যস্বত্বভোগী ও হয়রানির সুযোগ তত দ্রুত কমে আসবে।"
সরকারি তথ্যমতে, সরকারের নতুন চালু করা ‘ভূমি অ্যাপ’-এ এরই মধ্যে ১ লাখের বেশি সক্রিয় ব্যবহারকারী যুক্ত হয়েছেন। এই একটি অ্যাপের মাধ্যমেই এখন ঘরে বসে ভূমি উন্নয়ন কর (খাজনা) পরিশোধ, ই-মিউটেশনের (নামজারি) আবেদন ও এর অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ, জমির সঠিক রেকর্ড যাচাই, খতিয়ান ও মৌজা মানচিত্র সংগ্রহ, অনলাইনে যেকোনো হয়রানির বিরুদ্ধে অভিযোগ দাখিল এবং উত্তরাধিকার সম্পত্তি হিসাব নির্ধারণসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সেবা পাওয়া যাচ্ছে।
ডিজিটাল এই সেবা সাধারণ গ্রামীণ মানুষের কাছে সহজলভ্য করতে দেশজুড়ে ৮৯৩টি বিশেষ ডিজিটাল সেবা কেন্দ্র অনুমোদন দিয়েছে সরকার। এছাড়া গ্রামীণ এলাকায় সচেতনতা বাড়াতে স্থানীয় প্রশাসন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় উপাসনালয়ের মাধ্যমে ব্যাপক প্রচারণা চালানো হচ্ছে। অনলাইন সেবা ব্যবহারে সাধারণ মানুষকে উৎসাহ দিতে বিনামূল্যে তথ্যপত্র ও ভিডিও টিউটোরিয়াল সরবরাহ করা হচ্ছে। তবে এসব প্রশংসনীয় উদ্যোগের পরও গ্রামীণ এলাকার একটি বড় অংশ এখনও প্রযুক্তির মারপ্যাঁচ না বোঝায় দালালের ওপর নির্ভরশীল থেকে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু প্রযুক্তির উন্নয়ন করলেই হবে না, এর পাশাপাশি ব্যাপক জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং আইনের কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত না হলে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না।
মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের ফাঁকিবাজি ও উপস্থিতি নিশ্চিত করতে ‘ভূমি দৃষ্টি’ নামে নতুন একটি জিও-ফেন্সিংভিত্তিক আধুনিক প্ল্যাটফর্ম চালুর চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে অফিস চলাকালে কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী তার নির্ধারিত কর্মক্ষেত্রের সীমানার বাইরে গেলে তা স্যাটেলাইটের মাধ্যমে তাৎক্ষণিকভাবে কেন্দ্রীয় ডিজিটাল ড্যাশবোর্ডে ধরা পড়বে। সরকার একই সঙ্গে ডিজিটাল ক্যাডাস্ট্রাল জরিপ, কেন্দ্রীয় ভূমি তথ্যভাণ্ডার তৈরি এবং ভূমি নিবন্ধন ব্যবস্থাকে (রেজিস্ট্রেশন) ভূমি তথ্যব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বয়ের কাজ দ্রুত এগিয়ে নিচ্ছে। পাশাপাশি ভূমি অধিগ্রহণের (অ্যাকুইজিশন) ক্ষতিপূরণের টাকা যেন দালাল ছাড়াই সরাসরি প্রকৃত মালিকের ব্যাংক হিসাবে পৌঁছে যায়, সে জন্য সরকারের সমন্বিত ‘আইবিএএস++’ (iBAS++) প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে এটিকে সংযুক্ত করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, ভূমি খাতের অন্ধকার চিত্রটি ফুটিয়ে তুলেছে টিআইবির সর্বশেষ মাঠপর্যায়ের জরিপ। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভূমি সেবা গ্রহণ করতে গিয়ে দেশের ৬৬.২ শতাংশ পরিবার কোনো না কোনো ধরনের দুর্নীতি ও হয়রানির শিকার হয়েছেন, যা ২০২৩ সালে ছিল ৫১ শতাংশ। এছাড়া ৪৭.৬ শতাংশ সেবাগ্রহীতা সরাসরি ঘুষ দিতে বাধ্য হয়েছেন। এতে প্রতি ভুক্তভোগী পরিবারে গড়ে অবৈধ অর্থ বা ঘুষ পরিশোধের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১১ হাজার ৩১০ টাকা। জরিপে আরও উঠে এসেছে, ভূমি খাতে শুধু ঘুষের মাধ্যমেই সারা দেশে প্রায় ৩ হাজার ৮১ কোটি টাকার অবৈধ লেনদেন হয়েছে, যা দেশের সামগ্রিক সরকারি সেবা খাতগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ।
এর বাইরে, বর্তমানে দেশে বিচারাধীন থাকা ৪৭ লাখের বেশি মামলার একটি বিশাল বড় অংশই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ভূমি-সংক্রান্ত বিরোধ ও জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত বলে জানিয়েছেন আইন বিশেষজ্ঞরা। তারা স্পষ্ট জানিয়েছেন, কেবল প্রযুক্তির ব্যবহারই যথেষ্ট নয়; বরং প্রযুক্তির কার্যকর প্রয়োগের পাশাপাশি প্রশাসনের জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা এবং দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমেই ভূমি খাতে এই ঐতিহাসিক পরিবর্তন আনা সম্ভব।
|