‘চা গরম’ সিনেমার রবিন চরিত্র ও অভিনেতা রেজওয়ান পারভেজ
২০০৬ সালের দিকের কথা। তখন কুষ্টিয়ার স্থানীয় থিয়েটারে মঞ্চনাটক করতেন রেজওয়ান। কুষ্টিয়াতেই তখন নাটকটির শুটিং করছিলেন টুটুল। মঞ্চের এক কোণ থেকে লম্বা–চওড়া গড়নের রেজওয়ানকে ডেকে নেন নির্মাতা। শারীরিক গঠনের কারণে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পেয়ে যান তিনি। জীবনে প্রথমবার ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানো, ফলে উত্তেজনা ছিল আকাশচুম্বী। টিভিতে দেখাবে—এই খুশিতে কথাটি বন্ধুদেরও বলে রেখেছিলেন। বুকের ছাতি চওড়া করে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে নাটকটি দেখতে বসেছিলেন। কিন্তু নাটক শেষ হলেও পর্দায় রেজওয়ানের দেখা মিলল না। লজ্জায় মুখ লুকানোর জায়গা খুঁজছিলেন তিনি। আসলে নাটকে রেজওয়ানের চেহারাই দেখানো হয়নি! দেখানো হয়েছিল শুধু হানাদার বাহিনীর বুট জুতো। সেই বুট দেখে তো আর চেনার উপায় নেই।
২০০৫ সালের দিকে কুষ্টিয়ার এক কলেজে পড়তেন রেজওয়ান। একদিন এক বন্ধুকে খুঁজতে গিয়ে কলেজ থিয়েটারের মহড়ায় গিয়ে পড়েন। থিয়েটারের সদস্যরা যখন তাঁকে দলে যোগ দিতে বলেন, তিনি সরাসরি জানিয়েছিলেন, অভিনয় বাদে দল গোছানোর সব ধরনের সাহায্য করবেন, তবু যেন তাঁকে কোনোদিন মঞ্চে না তোলা হয়। শৈশব-কৈশোর থেকেই প্রচণ্ড লাজুক প্রকৃতির হওয়ায় অভিনয় করতে চাননি রেজওয়ান।
কিন্তু ভাগ্য তাঁকে ঠিকই আলোর মঞ্চে টেনে নিয়ে যায়। জীবনে প্রথমবার কুষ্টিয়ার ‘বোধন থিয়েটার’-এর একটি নাটকে অভিনয়ের সুযোগ পান। তবে কোনো পুরুষ চরিত্র নয়, রীতিমতো নারী চরিত্র! রেজওয়ান হাসতে হাসতে বলছিলেন, তখন লম্বা–চওড়াদের ধরে নারীর চরিত্রে দেওয়া হয়েছিল। তাঁকে নারী সেজে অভিনয় করতে হয়েছিল। মাত্র দুই-তিনটি সংলাপ ছিল, কিন্তু মঞ্চ থেকে নামার পর ভয়ে কাঁপছিলেন ও ঘামছিলেন তিনি। পরে অবশ্য মঞ্চে নিয়মিত কাজ করেছেন। ‘কোর্ট মার্শাল’সহ বেশ কয়েকটি জনপ্রিয় মঞ্চনাটকে তাঁকে দেখা গেছে।
কুষ্টিয়ার মঞ্চ কাঁপিয়ে ২০১২ সালে ঢাকায় আসেন রেজওয়ান। এখানে এসে ঐতিহ্যবাহী ‘আরণ্যক নাট্যদল’-এ যোগ দেন। দলের ‘রাঢ়াং’, ‘ময়ূর সিংহাসন’সহ বেশ কয়েকটি আলোচিত ও দর্শকপ্রিয় নাটকে তাঁকে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে দেখা গেছে। প্রখ্যাত নাট্যব্যক্তিত্ব মামুনুর রশীদের টিভি নাটক ‘আলতুর সাইকেল যাত্রা’য় ছোট একটি চরিত্রে প্রথম সুযোগ পান, যেখানে অবশেষে তাঁর চেহারা দেখা যায়। পরবর্তীতে বৃন্দাবন দাস ও সালাহউদ্দিন লাভলুর হাত ধরে আলাদা গতি পায় রেজওয়ানের ক্যারিয়ার। ‘বায়ুচড়া’সহ বেশ কয়েকটি মেগা নাটকে বড় চরিত্রে কাজের সুযোগ পান তিনি। এরপর আর তাঁকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।
শঙ্খ দাশগুপ্তর ‘চা গরম’ সিনেমায় ‘রবিন’ বা ‘রবিন চাঁদ মুর্মু’ চরিত্রটি রেজওয়ানকে রাতারাতি আমজনতার হৃদয়ে পৌঁছে দিয়েছে। রেজওয়ান মনে করেন, ‘রবিন’ চরিত্রটি তাঁর সমগ্র অভিনয়জীবনের একটি মাইলফলক এবং অভিনেতা হিসেবে তাঁর এযাবৎকালের সর্বোচ্চ প্রাপ্তি।
রেজওয়ানের মতে, রবিন চরিত্রটির মধ্যে কোনো কৃত্রিমতা ছিল না। চরিত্রটি তাঁর হৃদয়ে এতটাই গেঁথে গিয়েছিল যে শুটিং শেষ হওয়ার পরও নিজের স্বাভাবিক কথা বলার ধরন ও রবিনের চরিত্র থেকে বের হতে তাঁর বেশ দীর্ঘ সময় লেগেছিল। তবে এই চরিত্রটির ভাষা রপ্ত করা ছিল তাঁর জন্য জীবনের সবচেয়ে বড় সংগ্রাম। চা–শ্রমিকদের সেই বিশেষ আঞ্চলিক ভাষা ও টান রপ্ত করার জন্য তাঁকে দিনের পর দিন ইউটিউবে প্রচুর তথ্যচিত্র দেখতে হয়েছে।
‘চা গরম’ ছাড়াও ওটিটি প্ল্যাটফর্মে ‘ভাইরাস’ ও ‘কালপুরুষ’ সিরিজে অভিনয় করে নিজের জাত চিনিয়েছেন রেজওয়ান। এছাড়া ‘নকশীকাঁথার জমিন’ সিনেমা দিয়ে বড় পর্দায় অভিষেক ঘটার পর ‘মানিকের লাল কাঁকড়া’, ‘ঠিকানা বাংলাদেশ’, ‘মা’ এবং ‘হাওর’সহ বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্রে বৈচিত্র্যময় চরিত্রে অভিনয় করেছেন এই গুণী অভিনেতা।
জান্নাত সকালাবেলা