কেন ১৯ বছর বয়সেই উইল নিবন্ধন করলেন সাংহাইয়ের এই তরুণ?
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: সম্পত্তি বা উত্তরাধিকার নিয়ে মা-বাবা ও সন্তানদের মধ্যকার বিরোধের গল্প নতুন কিছু নয়। তবে এবার চীনের সাংহাইয়ে সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী ও চমকপ্রদ একটি ঘটনা সামনে এসেছে, যা উইলের চিরাচরিত ধারণাকেই বদলে দিয়েছে। নিজের রক্তের সম্পর্কের মা-বাবাকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত করে ১৯ বছর বয়সী এক চীনা তরুণ তাঁর শৈশবের এক ঘনিষ্ঠ বন্ধুর নামে প্রায় ২ কোটি ইউয়ান বা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৩৬ কোটি টাকার সমপরিমাণ সম্পত্তি উইল করে দিয়েছেন।
গোপনীয়তা রক্ষার স্বার্থে ওই তরুণের পুরো নাম প্রকাশ না করে কেবল তাঁর পদবি ‘লি’ প্রকাশ করেছে চীনের স্থানীয় প্রশাসন। সম্প্রতি তাঁর করা এই ব্যতিক্রমী উইলটি দেশটির একটি আইনি কেন্দ্র থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে সত্যায়িত ও নিবন্ধিত হয়েছে।
সংবাদমাধ্যম ‘সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট’ জানিয়েছে, লির এই বিপুল সম্পত্তির মধ্যে সাংহাইয়ের একটি অভিজাত ফ্ল্যাট এবং উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ব্যাংক সঞ্চয় রয়েছে। লির মা-বাবার মধ্যে বহু বছর আগে বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে। এরপর তাঁরা দুজনেই নতুন করে বিয়ে করে আলাদা সংসার শুরু করেন। লির বর্তমান সম্পত্তিগুলো মূলত বিচ্ছেদের পর মা-বাবা তাঁর ভরণপোষণের জন্য তাঁর নামে লিখে দিয়েছিলেন।
লি জানান, তিনি বেশ কিছু ব্যক্তিগত কারণ এবং অত্যন্ত বাস্তবসম্মত চিন্তা থেকেই এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। প্রথমত, তিনি নিয়মিত বিভিন্ন ধরণের ঝুঁকিপূর্ণ ও অ্যাডভেঞ্চারাস খেলাধুলায় অংশ নেন। তাই ভবিষ্যতে যদি কোনো আকস্মিক বড় দুর্ঘটনা ঘটে, তবে তাঁর অবর্তমানে তাঁর উপার্জিত ও প্রাপ্ত সম্পত্তি যেন তাঁর নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী বণ্টন হয়, সেজন্য তিনি আগেভাগেই আইনি প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছেন। দ্বিতীয়ত, লি তাঁর বাবা ও মায়ের বর্তমান জীবনসঙ্গীদের কোনোভাবেই নিজের পরিবারের সদস্য বলে মনে করেন না। তিনি চান না যে তাঁর মৃত্যুর পর কোনোভাবে মা-বাবার নতুন পরিবারের সদস্যরা তাঁর সম্পত্তির অংশ পাক। এ কারণেই তিনি তাঁর শৈশবের পরম বিশ্বস্ত বন্ধুর নামে সব সম্পত্তি লিখে দিয়েছেন, যাকে তিনি বহু বছর ধরে চেনেন এবং যার ওপর তাঁর অন্ধবিশ্বাস রয়েছে।
চীনের প্রচলিত উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী, লি যেহেতু অবিবাহিত এবং তাঁর কোনো সন্তান নেই, তাই সাধারণ নিয়মে তাঁর আকস্মিক মৃত্যুর পর তাঁর জন্মদাতা মা-বাই হতেন সমস্ত সম্পত্তির বৈধ উত্তরাধিকারী। তবে দেশটির আইনে কোনো নাগরিক যদি বৈধভাবে উইলে অন্য কারো নাম উল্লেখ করে যান, তবে নিকটাত্মীয়দের বাইরে যেকোনো সাধারণ ব্যক্তিকেও সম্পত্তি দিয়ে যাওয়ার আইনি সুযোগ রয়েছে।
লি তাঁর এই উইলটি সাংহাইয়ের ‘চায়না উইল রেজিস্ট্রেশন সেন্টারে’ আইনগতভাবে নথিভুক্ত করেছেন। তবে এই কেন্দ্রের নিয়ম অনুযায়ী একটি বিশেষ শর্ত রয়েছে। উইলকারীর মৃত্যুর পর, যাকে সম্পত্তির উত্তরাধিকারী মনোনীত করা হয়েছে (এক্ষেত্রে লির বন্ধু), তাকে উইলকারীর মৃত্যুর ঠিক ৬০ দিনের মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে সেই সম্পত্তি গ্রহণ বা নিজের নামে করার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। নির্ধারিত এই ৬০ দিনের মধ্যে যদি বন্ধুটি সম্পত্তি গ্রহণ না করেন, তবে তিনি ওই বিশাল সম্পত্তির ওপর সমস্ত আইনগত দাবি হারাবেন।
লির এই ঘটনাটি চীনে চলমান আরও একটি সামাজিক ও মানসিক পরিবর্তনের ট্রেন্ডকে সামনে এনেছে। চায়না উইল রেজিস্ট্রেশন সেন্টারের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, আগের প্রজন্মের তুলনায় বর্তমানের চীনা তরুণ-তরুণীরা অনেক অল্প বয়সেই উইল বা ভবিষ্যৎ আর্থিক পরিকল্পনা করে রাখছেন।
তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে দেশটিতে উইল নিবন্ধনকারীদের গড় বয়স ৭৭ বছর থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে কমে ৬৭ বছরে নেমে এসেছে। কেন্দ্রের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ১৯৮০, ১৯৯০ এবং ২০০০ সালের পর জন্ম নেওয়া আধুনিক শিক্ষিত প্রজন্মের মানুষের মধ্যে আগেভাগেই সম্পত্তি, ডিজিটাল অ্যাসেট ও উত্তরাধিকার নিয়ে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা করার প্রবণতা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। লির এই যুগান্তকারী সিদ্ধান্তটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। অনেকেই নিজের আইনি অধিকারের সঠিক ব্যবহারের জন্য লির প্রশংসা করেছেন, আবার কেউ কেউ পরিবারের প্রতি এমন কঠোর আচরণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
|