নারীকে পণ্য করা বিনোদন জগতের দীর্ঘ সমস্যা: নিত্য মেমন

প্রকাশ: রবিবার, ০৭ জুন ২০২৬, ০৪:৪৬ অপরাহ্ণ
নারীকে পণ্য করা বিনোদন জগতের দীর্ঘ সমস্যা: নিত্য মেমন

বিনোদন প্রতিবেদক : মুক্তির প্রথম দিন থেকেই বক্স অফিসে টাকার পাহাড় গড়ছে দক্ষিণি মেগা সুপারস্টার রাম চরণ (Ram Charan) অভিনীত বহুল প্রতীক্ষিত প্যান-ইন্ডিয়া সিনেমা ‘পেড্ডি’ (Peddi)। তবে বাণিজ্যিক এই আকাশচুম্বী সাফল্যের সমান্তরালে সিনেমাটি এক বিশাল সামাজিক ও নৈতিক বিতর্কের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। ছবিতে প্রধান নারী চরিত্রে অভিনয় করা বলিউড স্টার জাহ্নবী কাপুরের (Janhvi Kapoor) চরিত্রটির অসংলগ্ন ও সস্তা উপস্থাপন নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয়েছে তীব্র সমালোচনা ও নিন্দার ঝড়। সাধারণ দর্শক থেকে শুরু করে বোদ্ধা মহলের স্পষ্ট অভিযোগ, পুরো সিনেমা জুড়ে জাহ্নবীকে কোনো শক্তিশালী অভিনয় বা ব্যক্তিত্বের ছোঁয়া দেওয়া হয়নি; বরং তাঁকে কেবলই ‘আই ক্যান্ডি’ (Eye Candy) বা দর্শকদের সস্তা দৃষ্টি আকর্ষণের উপাদান ও পণ্য হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।

আজ রবিবার (৭ জুন) বিকেল ৪টা ৩২ মিনিটে অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত ‘তারকা কথন, গ্ল্যামার ও বিনোদন’ এবং ‘প্যান-ইন্ডিয়া চলচ্চিত্র বাজার, লিঙ্গ বৈষম্য ও নারী অবমাননা ট্র্যাকিং, আন্তর্জাতিক বিনোদন সংবাদ ও বক্স অফিস পর্যবেক্ষণ উইং’ বিভাগের বিশেষ যৌথ বুলেটিংয়ে ‘পেড্ডি’ সিনেমার এই সংবেদনশীল বিতর্ক এবং নিত্য মেমনের বিস্ফোরক সাক্ষাৎকারের খতিয়ান বিস্তারিত তুলে ধরা হলো।

‘পেড্ডি’ সিনেমাটি নিয়ে বিশ্বজুড়ে চলমান এই তুমুল জলঘোলা পরিস্থিতির মধ্যেই বিষয়টি নিয়ে অত্যন্ত স্পষ্ট ও সাহসী বক্তব্য রেখেছেন ভারতের অন্যতম প্রভাবশালী ও গুণী অভিনেত্রী নিত্য মেমন (Nithya Menen)। তাঁর মতে, চলচ্চিত্রে নারীদের কেবল ভোগের সামগ্রী বা পণ্য হিসেবে ব্যবহারের এই নোংরা প্রবণতা শুধু দক্ষিণি (South Indian) চলচ্চিত্রেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি মূলত পুরো বৈশ্বিক বিনোদন জগতেরই একটি দীর্ঘদিনের পুরোনো ও গভীর মানসিক সমস্যা।

সম্প্রতি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ‘ভ্যারাইটি ইন্ডিয়া’কে দেওয়া একটি বিশেষ ও এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকারে নিত্য মেমন বলেন, “চলচ্চিত্রের অতিরিক্ত ও উগ্র বাণিজ্যিকীকরণের (Commercialization) ফলেই আজকের এই অবক্ষয়মূলক প্রবণতা তৈরি হয়েছে। দর্শকদের সস্তায় থিয়েটারে আকৃষ্ট করতে এবং বক্স অফিসে নিশ্চিত সাফল্য পেতে অনেক সময় কিছু বাণিজ্যিক নির্মাতারা এমন সব সুড়সুড়িমূলক দৃশ্য জোর করে ঢুকিয়ে দেন, যেখানে মূল নারী চরিত্রকে কাহিনীর প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি যৌন আবেদনময় (Hyper-sexualized) করে উপস্থাপন করা হয়।”

নিজের সোজাসাপ্টা বক্তব্যের জন্য পরিচিত নিত্য মেমন আরও বলেন, “নারীদের এভাবে পর্দায় উপস্থাপন করাটা বাণিজ্যিকভাবে দ্রুত কাজ করে এবং দর্শকদের একাংশের মাঝে আগ্রহ বাড়ায় বলেই এই ফর্মুলা বারবার ব্যবহার করা হচ্ছে। এটি কি মাত্রাতিরিক্ত? অবশ্যই মাত্রাতিরিক্ত। তবে আমার মনে হয়, এ ক্ষেত্রে শুধু পরিচালকদের দোষ দিলে হবে না; অভিনেতা-অভিনেত্রীদেরও নিজেদের কাজের একটি শক্ত সীমারেখা (Boundary) নির্ধারণ করা উচিত। কোনো দৃশ্য বা পোশাক পরায় যদি তাঁরা সামান্যতম অস্বস্তি বোধ করেন, তবে খোদ পরিচালকের মুখের ওপর স্পষ্টভাবে ‘না’ বলার নৈতিক সাহস থাকা প্রয়োজন।”

তারকাদের অসহায়ত্বকে উড়িয়ে দিয়ে নিত্য বলেন, “একজন শিল্পী বা অভিনেতা ইন্ডাস্ট্রিতে সম্পূর্ণ অসহায় বা পুতুল হয়ে থাকেন—এটা আমি একেবারেই বিশ্বাস করি না। আপনি আপনার যৌক্তিক মতামত ও অসম্মতি অবশ্যই জানাতে পারেন। আসল প্রশ্ন হলো, আপনার নিজের কাছে কোন বিষয়টি বেশি গুরুত্বপূর্ণ—খ্যাতি নাকি আত্মসম্মান? ক্যারিয়ারে এমন বহু বড় বাজেট বা বড় তারকার সিনেমা আমি অনায়াসে ছেড়ে দিয়েছি, কারণ আমি পর্দায় নির্দিষ্ট কিছু সস্তা বা যৌন আবেদনময় কাজ করতে রাজি নই। কিন্তু তাতে আমার বিন্দুমাত্র আক্ষেপ নেই। কারণ আমি সস্তা খ্যাতির চেয়ে নিজের ব্যক্তিগত মূল্যবোধ ও আদর্শকে অনেক বেশি গুরুত্ব দিই।”

উল্লেখ্য, ‘পেড্ডি’ সিনেমাটি থিয়েটারে মুক্তির পর থেকেই জাহ্নবী কাপুরের চরিত্র ‘আচিয়াম্মা’ (Achiyamma) ঘিরে সমালোচকদের কড়া রিভিউ আসতে শুরু করে। অনেক দর্শকের অভিযোগ, মেয়েটির চরিত্রের গভীরতা বা সংলাপের চেয়ে তাঁর শারীরিক সৌন্দর্য ও শরীরী আবেদনকে ক্যামেরায় বেশি ফোকাস করা হয়েছে। সবচেয়ে বড় আঘাতটি আসে সিনেমার একটি সুনির্দিষ্ট দৃশ্যকে কেন্দ্র করে; যেখানে দেখা যায়, রাম চরণের চরিত্র ‘পেড্ডি’ নায়িকা আচিয়াম্মার স্পষ্ট অনাগ্রহ ও অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাঁর প্রতি জোরপূর্বক রোমান্টিক আগ্রহ দেখাতে থাকে এবং এক পর্যায়ে নারীর সম্মতি ছাড়াই (Without Consent) একটি বলপূর্বক চুম্বনের দৃশ্য স্ক্রিনে দেখানো হয়। এই অংশটিই টক্সিক ম্যাসকুলিনিটি বা নারীর ওপর বলপ্রয়োগের শামিল বলে সবচেয়ে বেশি সমালোচনার জন্ম দেয়।

সমালোচনার মুখে অবশেষে নতি স্বীকার করে আজ রবিবার প্রকাশ্যে ও আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চেয়েছেন সিনেমার পরিচালক বুচি বাবু সানা (Buchi Babu Sana)। সেই সাথে বিশ্বজুড়ে দর্শকদের প্রতি সম্মান জানিয়ে বিতর্কিত দৃশ্যগুলোতে কাঁচি চালানো বা পরিবর্তন আনার বড় ঘোষণাও দিয়েছেন তিনি। বুচি বাবু সানা জানান, “নারীকে অসম্মান করা বা বস্তু হিসেবে উপস্থাপন করার কোনো উদ্দেশ্য আমাদের ছিল না। দর্শকদের একাংশের তীব্র ও যৌক্তিক আপত্তিকে সম্মান জানিয়ে আমরা সমালোচিত কিছু দৃশ্য থিয়েটার প্রিন্ট থেকে দ্রুত পরিবর্তন বা ডিলিট করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।” পরিচালকের এই নমনীয় সিদ্ধান্তের পর বিতর্কের তীব্রতা কিছুটা কমবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

জান্নাত সকালবেলা

মন্তব্য করুন