ইতিহাসের সবচেয়ে বড় রকেট ‘স্টারশিপ’ ওড়াচ্ছে স্পেসএক্স
স্পেসএক্সের তৈরি স্টারশিপ রকেটের মূলত দুটি প্রধান অংশ রয়েছে—ওপরের অংশটিকে বলা হয় ‘স্টারশিপ’ এবং নিচের অংশটি হলো ‘সুপার হেভি’। মহাকাশবিজ্ঞানের নতুন এই অভিযানে দুই অংশেরই সম্পূর্ণ অত্যাধুনিক সংস্করণ ‘ভার্সন ৩’ ব্যবহার করা হচ্ছে। পুরো রকেটটির সম্মিলিত মোট উচ্চতা ১২৪ মিটার, যা স্পেসএক্সের তৈরি আগের সংস্করণের চেয়ে প্রায় ১ মিটার বেশি। এটি মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার বর্তমান ‘স্পেস লঞ্চ সিস্টেম’ (SLS) তো বটেই, এমনকি ১৯৬০ ও ৭০-এর দশকে চাঁদে প্রথম মানুষ পাঠানো অ্যাপোলো মিশনের বিখ্যাত ‘স্যাটার্ন ৫’ রকেটের (১১১ মিটার) উচ্চতাকেও অনেকখানি ছাড়িয়ে গেছে।
উচ্চতার পাশাপাশি এই রকেটের শক্তিও বিজ্ঞানীদের চমকে দিয়েছে। উৎক্ষেপণের তীব্র মুহূর্তে এটি প্রায় ৭৫ হাজার কিলোনিউটন ধাক্কা বা থ্রাস্ট (Thrust) তৈরি করতে সক্ষম হবে, যা নাসার এসএলএস রকেটের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ। যুক্তরাজ্যের শেফিল্ড ইউনিভার্সিটির খ্যাতনামা গবেষক অ্যালিস্টারের মতে, এই রকেটের সবগুলো ইঞ্জিন যখন তাদের পূর্ণ শক্তিতে চালু হবে, তখন তা ইউরোপের শিল্পোন্নত দেশ জার্মানির পুরো দেশের উৎপাদিত মোট বিদ্যুতের চেয়েও বেশি শক্তি একযোগে তৈরি করবে।
গত বছরের অক্টোবরে স্টারশিপের একাদশতম সফল পরীক্ষা চালানো হয়েছিল। এরপর থেকে রকেটের সামগ্রিক নকশায় ও অ্যারোডাইনামিক্সে বড় ধরনের বৈজ্ঞানিক পরিবর্তন এনেছে স্পেসএক্স। এবারের দ্বাদশতম পরীক্ষায় রকেটের দুই অংশেই প্রথমবারের মতো ব্যবহার করা হচ্ছে স্পেসএক্সের নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি অত্যাধুনিক ‘র্যাপ্টর ভার্সন ৩’ ইঞ্জিন।
রকেটের নিচের অংশ অর্থাৎ সুপার হেভি অংশে গ্রিড ফিনের সংখ্যা চার থেকে কমিয়ে তিন করা হলেও এগুলোর আকার আগের চেয়ে প্রায় ৫০ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। এটি রকেটটিকে বায়ুমণ্ডলের তীব্র চাপ ভেদ করে পৃথিবীতে আবার সোজা হয়ে নিরাপদে ফিরিয়ে আনতে ল্যান্ডিংয়ের সময় সাহায্য করবে। অন্যদিকে ওপরের স্টারশিপ অংশে যুক্ত করা হয়েছে বিশাল আকৃতির নতুন জ্বালানি ট্যাংক, মহাকাশের কক্ষপথে স্বয়ংক্রিয়ভাবে জ্বালানি ভরার আধুনিক প্রযুক্তি এবং পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে পুনরায় প্রবেশের সময় ঘর্ষণজনিত উত্তাপ প্রতিরোধী উন্নত মানের থার্মাল টাইলস।
স্পেসএক্সের এই দানবীয় অভিযানের দিকে অত্যন্ত কড়া নজর রাখছে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা। ২০২৮ সালের মধ্যে মানবজাতিকে আবারও চাঁদের মাটিতে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার যে মহাপরিকল্পনা নাসা হাতে নিয়েছে (আর্টেমিস মিশন), তার মূল সাফল্য অনেকটাই নির্ভর করছে স্পেসএক্সের এই স্টারশিপের কার্যকারিতার ওপর।
ইলন মাস্কের মূল ও দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য মঙ্গলে মানব বসতি স্থাপন করা হলেও আপাতত নাসার ‘আর্টেমিস’ চন্দ্রাভিযানের জন্য এটি একটি অন্যতম বড় ভরসা। চাঁদের মাটিতে নভোচারী নামানোর জন্য নাসা যৌথভাবে স্পেসএক্সের ‘স্টারশিপ’ এবং আমাজনের প্রতিষ্ঠাতা জেফ বেজোসের ‘ব্লু অরিজিন’ ল্যান্ডারকে নির্বাচন করেছে। নাসার সাম্প্রতিক প্রকাশিত কৌশলগত নথি অনুযায়ী, ২০২৮ সালের ‘আর্টেমিস-৪’ অভিযানে নভোচারীরা প্রথমে নাসার নিজস্ব এসএলএস রকেটে চড়ে মহাকাশে যাবেন। পরে সেখানে স্পেসএক্স বা ব্লু অরিজিনের ল্যান্ডারের সঙ্গে ডকিং বা যুক্ত হয়ে তারা চাঁদের দক্ষিণ মেরুর মাটিতে পা রাখবেন।
আমেরিকার সিলিকন ভ্যালির প্রযুক্তি বিশ্বে অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি কৌশল হলো ‘দ্রুত ব্যর্থ হও, দ্রুত শেখো’ (Fast failure, fast learning) নীতি, আর স্পেসএক্স মূলত এই নীতিতেই মনেপ্রাণে বিশ্বাসী। এর আগের ১১টি পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণের মধ্যে ছয়টি আংশিক বা পূর্ণ সফল হয়েছে এবং পাঁচটি ধ্বংস বা ব্যর্থ হয়েছে।
লন্ডনের কিংস্টন ইউনিভার্সিটির গবেষক পিটার শ বলেন, ‘রকেটবিজ্ঞান বা এর ইঞ্জিনিয়ারিং অত্যন্ত জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ একটি বিষয়। এখানে কাজ করতে গেলে শুরুতে ব্যর্থতা আসবেই। তবে স্পেসএক্সের বিশেষত্ব হলো—তারা প্রতিটি ব্যর্থতা থেকে নিখুঁত ডেটা সংগ্রহ করে দ্রুততম সময়ে নিজেদের ভুল সংশোধন করে ঘুরে দাঁড়ায়।’ গবেষকদের মতে, এবারের পরীক্ষাটি কোনো সাধারণ প্রাথমিক নমুনা বা প্রটোটাইপ নয়; এটি মূলত কমার্শিয়াল বা চূড়ান্ত উৎপাদন মডেলের প্রথম বাস্তবসম্মত পরীক্ষা। এখন স্পেসএক্সের সামনে সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক চ্যালেঞ্জ হলো—এই বিশাল ও জটিল প্রযুক্তিকে শতভাগ নির্ভরযোগ্য ও পুনর্নবীকরণযোগ্য করে তোলা।
জান্নাত সকালাবেলা