প্রাপ্তবয়স্ক সন্তান বাবা-মায়ের সম্পত্তি নয়: বোম্বে হাইকোর্টের ঐতিহাসিক রায়

প্রকাশ: বুধবার, ১২ আগস্ট ২০২৬, ০৫:৪৮ অপরাহ্ণ
প্রাপ্তবয়স্ক সন্তান বাবা-মায়ের সম্পত্তি নয়: বোম্বে হাইকোর্টের ঐতিহাসিক রায়
ভারতের বোম্বে হাইকোর্ট ভবন।

প্রাপ্তবয়স্ক সন্তান বাবা-মায়ের সম্পত্তি নয়। নিজের জীবন নিয়ে যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্ণ অধিকার তাদের রয়েছে।"—পছন্দের যুবকের সঙ্গে ঘর ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া ২১ বছর বয়সী এক তরুণীকে জোর করে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা খারিজ করে এমনই ঐতিহাসিক নির্দেশ দিয়েছেন ভারতের বোম্বে হাইকোর্ট।

ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি রবীন্দ্র ভি ঘাটে এবং বিচারপতি গৌতম এ আনখাদের সমন্বয়ে গঠিত বোম্বে হাইকোর্টের দ্বি-বেঞ্চ স্পষ্ট জানিয়েছেন, পারিবারিক আবেগ বা সামাজিক রীতিনীতি কখনোই একজন প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের মৌলিক বা ব্যক্তিগত স্বাধীনতার ওপর চাপিয়ে দেওয়া যায় না।

ঘটনার প্রেক্ষাপট ও মা-মেয়ের আইনি লড়াই:

মামলার বিবরণ অনুযায়ী, হায়দরাবাদের ওই তরুণী নিজের ইচ্ছায় বাড়ি ছেড়ে তাঁর পছন্দের এক যুবকের কাছে গিয়ে বসবাস শুরু করেন। পরবর্তীতে মেয়েটিকে উদ্ধারের জন্য তাঁর মা বোম্বে হাইকোর্টে একটি বন্দি প্রত্যক্ষীকরণ (Habeas Corpus) আবেদন দাখিল করেন। অন্য দিকে, তরুণীও পরিবারের তরফ থেকে বিয়ে সংক্রান্ত অন্যায্য চাপ এবং পুলিশের হয়রানি থেকে সুরক্ষা চেয়ে একই আদালতে আইনি লড়াইয়ে নামেন।

আদালতের মুখোমুখি হয়ে তরুণী জানান, তাঁর অমতে ১০ বছরের বড় এক চাচাতো ভাইয়ের সঙ্গে বিয়ের জন্য পরিবার থেকে প্রতিনিয়ত প্রচণ্ড চাপ দেওয়া হচ্ছিল। সেই চাপ ও মানসিক যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে তিনি বাড়ি ছাড়তে বাধ্য হন এবং নিজের পছন্দ করা মানুষটির সঙ্গেই বাকি জীবন কাটাতে চান।

আদালতের গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণের সারসংক্ষেপ:

  • সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদ: ভারতের সংবিধান প্রতিটি নাগরিককে ব্যক্তিগত স্বাধীনতার সুরক্ষা দিয়েছে। কোথায় থাকবেন, উচ্চশিক্ষা নেবেন কি না, কাকে বিয়ে করবেন বা বিয়ে আদৌ করবেন কি না—এগুলো সংবিধান স্বীকৃত মৌলিক অধিকার।

  • বাবা-মায়ের কর্তৃত্বের সীমাবদ্ধতা: বাবা-মা বা রাষ্ট্র, কেউই একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারীকে তাঁর স্পষ্ট অনিচ্ছার বিরুদ্ধে বাড়িতে ফিরতে বা অনিচ্ছাকৃত কোনো বিয়েতে বাধ্য করতে পারে না।

  • নিখোঁজ মামলা বাতিলের নির্দেশ: তরুণীর সাক্ষাৎকার নেওয়ার পর বিচারকেরা নিশ্চিত হন যে তিনি অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী এবং নিজের নেওয়া সিদ্ধান্তের পরিণতি সম্পর্কে পুরোপুরি সচেতন। ফলে আদালত তেলঙ্গানা পুলিশকে তরুণীর বিরুদ্ধে করা নিখোঁজ ডায়েরি বন্ধের নির্দেশ দেন।

বোম্বে হাইকোর্ট আরও নির্দেশ দিয়েছেন যে, ফৌজদারি বা আইনি কোনো ভয় দেখিয়ে বা প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ চাপ প্রয়োগ করে ওই তরুণীকে ফেরত পাঠাতে বাধ্য করা যাবে না। আদালতের এই পর্যবেক্ষণকে আধুনিক সমাজে প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকদের ব্যক্তিগত ও মৌলিক স্বাধীনতা সুরক্ষায় অত্যন্ত বৈপ্লবিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

মন্তব্য করুন