বড় ধরনের সামরিক সংঘাতের আশঙ্কায় কাঁপছে ইউরোপ

প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৪৩ পূর্বাহ্ণ
বড় ধরনের সামরিক সংঘাতের আশঙ্কায় কাঁপছে ইউরোপ
ইউরোপজুড়ে সম্ভাব্য সামরিক সংঘাত মোকাবিলায় জরুরি প্রস্তুতি ও মহড়া (ফাইল ছবি)।

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ইউরোপের রাজনীতি ও সামরিক অঙ্গনে এখন বিরাজ করছে চরম উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা। পোল্যান্ড ও লিথুয়ানিয়ার মধ্যবর্তী অত্যন্ত সংবেদনশীল ‘সুওয়ালকি করিডোর’-এর কাছাকাছি রাশিয়ার ঘনিষ্ঠ মিত্র বেলারুশের সাম্প্রতিক বৃহৎ সামরিক মহড়া ন্যাটো জোটের দীর্ঘদিনের সবচেয়ে দুর্বল ভৌগোলিক বিন্দুতে নতুন করে বড় ধরনের যুদ্ধের আশঙ্কা তৈরি করেছে। এই তীব্র ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে সম্ভাব্য রুশ আগ্রাসন এবং সাইবার হামলা বা নাশকতাসহ নানা ধরনের ‘হাইব্রিড আক্রমণ’ মোকাবিলায় অভূতপূর্ব সামরিক ও বেসামরিক প্রতিরক্ষামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে ইউরোপীয় দেশগুলো।

সম্ভাব্য রুশ হুমকি মোকাবিলায় ইউরোপীয় সরকারগুলো অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে নানামুখী কৌশল বাস্তবায়ন করছে। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ জ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে গোপন গোয়েন্দা ব্রিফিং শেষে দেশের গুরুত্বপূর্ণ সব জাতীয় অবকাঠামো রক্ষায় বিশেষ সুরক্ষামূলক ব্যবস্থার ঘোষণা দিয়েছেন। অন্যদিকে পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড ট্রাস্ক অত্যন্ত কঠোর সতর্কবার্তা দিয়ে বলেছেন যে, রাশিয়া ন্যাটো ভূখণ্ডে ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে তা নিছক ‘দুর্ঘটনা’ হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা করতে পারে। সম্ভাব্য যেকোনো সংকট বা যুদ্ধাবস্থার জন্য নাগরিকদের ঘরে ক্যানড খাদ্য ও পানীয় জল মজুত রাখার আহ্বান জানিয়েছে পোলিশ প্রশাসন। যুক্তরাজ্যের সেনাপ্রধানও বর্তমান সময়কে গত কয়েক দশকের মধ্যে অন্যতম বিপজ্জনক সময় হিসেবে অভিহিত করেছেন।

ইউরোপের অন্যতম প্রধান সামরিক শক্তি জার্মানিও বসে নেই। দেশের জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থা ও হাসপাতালগুলোকে যেকোনো আকস্মিক পরিস্থিতির জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত করা হচ্ছে। জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রেডরিশ মার্জ ইউরোপ মহাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও শান্তি রক্ষায় বর্তমান সময়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও নির্ণায়ক বলে উল্লেখ করেছেন। এমনকি ঐতিহ্যগত সামরিক নিরপেক্ষতার নীতি বজায় রাখা সুইজারল্যান্ডও নতুন জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল গ্রহণ করেছে, যেখানে যেকোনো সশস্ত্র আক্রমণ প্রতিরোধে সম্পূর্ণ স্বাবলম্বী হওয়ার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পোল্যান্ডে একটি স্থায়ী মার্কিন সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের অগ্রগতির কথা জানিয়েছেন এবং এর আগে সিআইএ পরিচালককে গোপন মিশনে মস্কোয় পাঠিয়ে ন্যাটো ভূখণ্ডে হামলা না চালাতে কড়া সতর্কবার্তা পাঠান।

সুওয়ালকি করিডোর কেন্দ্রিক ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি বিশ্লেষকদের মতে, পোল্যান্ড ও লিথুয়ানিয়ার মধ্যকার মাত্র ৬৫ মাইল দীর্ঘ সুওয়ালকি করিডোরটি বাল্টিক রাষ্ট্রগুলোকে (লিথুয়ানিয়া, লাটভিয়া ও এস্তোনিয়া) ন্যাটোর মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করেছে। রাশিয়া বা বেলারুশ যদি কৌশলগত কারণে এই করিডোরের সামান্য অংশও জবরদখল করে, তবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চূড়ান্ত প্রতিক্রিয়ার ওপরই পুরো ন্যাটো জোটের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে। পুতিনের মূল উদ্দেশ্য হলো—ন্যাটোর সদস্য দেশগুলো কোনো ছোট ভূখণ্ডের জন্য রাশিয়ার সঙ্গে সরাসরি পরমাণু যুদ্ধের মতো চরম ঝুঁকিতে যাবে কি না, সেই অনিশ্চয়তা তৈরি করা। যদিও ন্যাটো মহাসচিব এ ধরনের যেকোনো উসকানিমূলক পদক্ষেপে কঠোর জবাব দেওয়ার হুশিয়ারি দিয়েছেন, তবুও মার্কিন রাজনৈতিক অঙ্গনের টানাপোড়েন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

পাশাপাশি, সরাসরি প্রথাগত যুদ্ধ ঘোষণা না করে সাইবার আক্রমণ, নাশকতা, অগ্নিসংযোগ ও ড্রোনের মাধ্যমে অবকাঠামো অস্থিতিশীল করার মতো ‘গ্রে জোন’ অপতৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে রুশ গোয়েন্দারা। সম্প্রতি মার্কিন আদালতও বিশ্বজুড়ে এ ধরনের নাশকতার ষড়যন্ত্রের অভিযোগে পাঁচজনকে অভিযুক্ত করেছে।

ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে শিক্ষা ও ইউরোপের আত্মনির্ভরতার তাগিদ ইউক্রেন যুদ্ধ ইউরোপের সামরিক চিন্তাভাবনায় এক বিশাল পরিবর্তন এনেছে। এই যুদ্ধ ইউরোপীয়দের শিখিয়েছে যে, আধুনিক সংঘাতে শুধু সামরিক অস্ত্র বা গোলাবারুদই যথেষ্ট নয়; বরং বিদ্যুৎ সরবরাহ কেন্দ্র, হাসপাতাল, পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা সচল রাখাই জাতীয় প্রতিরক্ষার অন্যতম প্রধান শর্ত। ইউক্রেনের এই তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ন্যাটো সংকটকালে সমাজ ও রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা বজায় রাখার নতুন নির্দেশিকা প্রকাশ করেছে।

একই সঙ্গে মার্কিন নিরাপত্তার ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীলতা নিয়ে ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে শঙ্কা দিন দিন বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রকে যেহেতু একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্য এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলেও নিজেদের সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখতে হয়, তাই ইউরোপের সুরক্ষায় মার্কিন প্রতিশ্রুতি নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে। কোল্ড ওয়ার বা স্নায়ুযুদ্ধের পরবর্তী দীর্ঘ শান্তিকালীন যুগের অবসান ঘটেছে অনুধাবন করে ইউরোপীয় দেশগুলো এখন উপলব্ধি করছে যে, পুতিনের আগ্রাসী কৌশল চিরতরে ব্যর্থ করতে হলে নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা নিজেদেরই নিজ দায়িত্বে বহুগুণ মজবুত করতে হবে।

মন্তব্য করুন