এঁটেল পোকার কামড়ে ৪২ দিন কোমায় যুক্তরাজ্যের নারী!
অনলাইন ডেস্ক: সামান্য একটি পোকামাকড়ের কামড় যে মানুষের জীবনকে কতটা নিদারুণ ও দুর্বিষহ করে তুলতে পারে, তার এক জলজ্যান্ত ও মর্মান্তিক উদাহরণ যুক্তরাজ্যের ওয়েলসের অ্যাংলেসি এলাকার বাসিন্দা ৫১ বছর বয়সী ভিক্টোরিয়া স্টেলাস।
২০১৯ সালে গ্রিসের সিরোস দ্বীপে পরিবারের সঙ্গে ছুটি কাটাতে গিয়ে একটি সাধারণ ‘এঁটেল পোকা’র (Tick) আক্রমণের শিকার হয়েছিলেন তিনি। আর সেই কামড় থেকেই শুরু হয় এক দীর্ঘ ও যন্ত্রণাদায়ক স্বাস্থ্যযুদ্ধ।
প্রথমে সাধারণ সর্দি-কাশি ও হালকা ফ্লু-সদৃশ জ্বর দিয়ে উপসর্গ শুরু হলেও, যুক্তরাজ্যে ফেরার পর রাতের বেলা তাঁর শরীরে তীব্র খিঁচুনি দেখা দেয়। অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় তাঁকে দ্রুত হেলিকপ্টারে করে লিভারপুলের বিশেষায়িত ওয়ালটন সেন্টারে ভর্তি করা হয়। সেখানে পরীক্ষার পর চিকিৎসকেরা নিশ্চিত হন—তিনি ‘টিক-বর্ন এনসেফালাইটিস’ (Tick-Borne Encephalitis или TBE) নামের বিরল ও ক্ষতিকারক এক ভাইরাসজনিত মস্তিষ্কের সংক্রমণে আক্রান্ত হয়েছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বাধ্য হয়ে চিকিৎসকেরা তাঁকে টানা ৪২ দিন ‘মেডিক্যালি ইনডিউসড কোমা’ বা কৃত্রিম কোমায় রাখেন।
বদলে গেছে পুরো জীবন
ভিক্টোরিয়া জানান, কোমা থেকে জেগে উঠলেও তাঁর জীবন আর আগের মতো নেই। মস্তিষ্কে গভীর প্রদাহ সৃষ্টির ফলে তাঁর স্বাভাবিক স্মৃতিশক্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কেনাকাটা, মানুষের নাম মনে রাখা এমনকি দৈনন্দিন স্বাভাবিক কাজকর্ম পরিচালনা করতেও তাঁকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। রোগের কারণে একটি পাব এবং বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের স্কুলের শিক্ষকের সহকারী হিসেবে করা দুটি চাকরিই তাঁকে হারাতে হয়েছে। আজও রাতে খিঁচুনি এড়াতে এবং সুস্থ থাকতে তাঁকে প্রতিদিন ১৫ থেকে ১৮টি ওষুধ খেতে হয়।
চিকিৎসকদের ধারণা, গ্রিসে থাকাকালীন ছাগলের খামার বা বনাঞ্চলের কাছ থেকেই এই এঁটেল পোকার কামড় খেয়েছিলেন তিনি।
কী এই ‘এঁটেল পোকা-বাহিত এনসেফালাইটিস’?
যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসের (NHS) তথ্যানুযায়ী, এটি মূলত একধরনের ভাইরাসজনিত সংক্রমণ যা এঁটেল পোকার কামড়ের মাধ্যমে রক্তে ও মস্তিষ্কে ছড়ায়। ইউরোপের বিভিন্ন অংশ, রাশিয়া, চীন ও জাপানের বনাঞ্চলে এ পোকার উপস্থিতি বেশি। অধিকাংশ ক্ষেত্রে উপসর্গ মৃদু হলেও প্রায় ৩ শতাংশ রোগীর ক্ষেত্রে এটি মস্তিষ্কে ভয়াবহ প্রদাহ তৈরি করে, যা প্রাণঘাতী হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ ও সতর্কতা:
লিভারপুল বিশ্ববিদ্যালয়ের জুনোটিক সংক্রমণ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক বেনেডিক্ট মাইকেল জানান, এ রোগের নির্দিষ্ট কোনো কার্যকরী অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ নেই, তবে এটি 'টিবিই (TBE) ভ্যাকসিন'-এর মাধ্যমে ১০০% প্রতিরোধযোগ্য।
ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল বা বনাঞ্চলে ভ্রমণের অন্তত এক মাস আগে টিবিই টিকা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে ইউকে হেলথ এজেন্সি। পাশাপাশি বনাঞ্চল বা ঝোপঝাড়ের কাছে গেলে লম্বা হাতার জামাকাপড় পরা, ত্বকে পোকা তাড়ানোর স্প্রে (DEET) ব্যবহার করা এবং বাড়ি ফিরে শরীর ভালো করে পরীক্ষা করার পরামর্শ দিচ্ছেন চিকিৎসকেরা।
|