যে কারণে বিশ্বজুড়ে পুরোনো বইয়ের বাজার হঠাৎ অস্বাভাবিক চাঙা
অনলাইন ডেস্কঃ বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দুর্লভ ও পুরোনো বইয়ের বাজারে হঠাৎ করেই অস্বাভাবিক চাহিদা ও বিক্রির জোয়ার তৈরি হয়েছে। তবে বই বিক্রির এই হঠাৎ উল্লম্ফনের পেছনে বইপ্রেমী বা সাধারণ পাঠকদের কোনো ভূমিকা নেই; বরং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) চালিত আধুনিক মডেলগুলোকে প্রশিক্ষিত করার জন্য বিপুল পরিমাণ পুরোনো বই কিনে নিচ্ছে বিভিন্ন তথ্যভিত্তিক গবেষণা ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান।
যুক্তরাজ্যের নর্দাম্বারল্যান্ডের বিশ্বখ্যাত বইয়ের দোকান ‘বার্টার বুকস’-এর মালিক স্টুয়ার্ট ম্যানলি জানান, তাঁর বিগত ৩০ বছরের দীর্ঘ ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতায় তিনি এমন বিস্ময়কর ঘটনা কখনো দেখেননি। সম্প্রতি কানাডার একটি নিবন্ধিত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান একবারে তাঁর শোরুম থেকে যে পরিমাণ বিপুল পুরোনো বই কিনে নিয়েছে, তা সাধারণ সময়ে তাঁর টানা এক সপ্তাহের পুরো বিক্রির সমান।
শুধু যুক্তরাজ্যই নয়, বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে থাকা ক্ষুদ্র ও স্বাধীন বই বিক্রেতারাও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ক্রেতার কাছ থেকে অগণিত বড় বড় অর্ডারের খবর প্রকাশ করেছেন। ল্যাটিন ভাষার প্রাচীন ধর্মীয় ও সাহিত্যিক গ্রন্থ থেকে শুরু করে বহুল প্রচলিত সাধারণ কাউবয় উপন্যাস—সব ধরনের পুরোনো বই-ই পাইকারি দরে বিপুল সংখ্যায় কেনা হচ্ছে।
এআই ইন্ডাস্ট্রির এই হঠাৎ বাড়ন্ত চাহিদার অভ্যন্তরীণ রহস্য খুঁজতে গিয়ে উন্মোচিত হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি আদালতের চাঞ্চল্যকর নথি। ২০২৫ সালে এআই গবেষক ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রোপিক (Anthropic)-এর বিরুদ্ধে তিনজন বিশিষ্ট লেখক কপিরাইট লঙ্ঘনের অভিযোগে দেওয়ানি মামলা করেন।
উক্ত মামলার ঐতিহাসিক পর্যবেক্ষণে বিচারক উইলিয়াম আলসাপ উল্লেখ করেন, এআই সফটওয়্যার ও মডেল প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্যে কপিরাইটযুক্ত সাহিত্য বা বই ব্যবহার করা পুরোপুরি আইনসিদ্ধ এবং এটি প্রযুক্তির এক ধরনের 'রূপান্তরমূলক ব্যবহার' (Transformative Use)।
মামলার আনুষঙ্গিক নথি ও পর্যালোচনা থেকে আরও জানা যায়, অ্যানথ্রোপিক তাদের শীর্ষ চ্যাটবট ‘ক্লদ’ (Claude)-এর প্রশিক্ষণের জন্য ‘প্রজেক্ট পানামা’ নামের একটি অতি গোপনীয় প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম পরিচালনা করছিল। এই বিশেষ উদ্যোগের অংশ হিসেবে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা লাখ লাখ পুরোনো বই সংগ্রহ করে সেগুলোকে অতি দ্রুত ডিজিটাইজ করার বিস্তৃত মাস্টারপ্ল্যান গ্রহণ করা হয়।
দ্রুতগতিতে এসব বই ডিজিটাইজড বা ডিজিটাল উপাত্তে রূপান্তর করার ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হচ্ছে ‘ডেস্ট্রাকটিভ স্ক্যানিং’ (Destructive Scanning) নামক এক ধরনের বিশেষ যান্ত্রিক পদ্ধতি। এতে করে পৃষ্ঠার আধুনিক হাই-স্পিড স্ক্যানিং সুবিধার জন্য বইয়ের বাঁধাই ও শেলাই সম্পূর্ণ কেটে ফেলা হয়। স্ক্যানিং প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে কাগজের অবশিষ্টাংশ ফেলে দেওয়া বা পুনর্ব্যবহারের জন্য ধ্বংস করা হয়।
অবশ্য অ্যানথ্রোপিকের পক্ষ থেকে এক সরকারি মুখপাত্র জানান, তাদের কোনো তথ্য বা উপাত্ত সংগ্রহ কর্মসূচির মাধ্যমে প্রাচীন দুর্লভ বা বিরল সংগ্রহের কোনো একক পুরোনো বই কিনে ধ্বংস করা হয় না। এআই প্রযুক্তির আধুনিকায়নে টেক্সট ডাটা সংগ্রহের অংশ হিসেবে বইয়ের বহুমুখী ব্যবহার আন্তর্জাতিক শিল্পে একটি খুবই স্বাভাবিক ও নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বলেও তিনি যুক্তি দেন।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে যুক্তরাজ্যের মেধাস্বত্ব ও কপিরাইট আইন এক্ষেত্রে কিছুটা কঠোর ও ভিন্ন কাঠামোর। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাস্বত্ব বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এমিলি হাডসন ব্যাখ্যা করেন, যুক্তরাজ্যে এআই প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্যে যেকোনো বৃহৎ ডেটাসেট তৈরি করতে মূল কপিরাইট মালিকের পূর্বানুমতি নিশ্চিত করা আইনত বাধ্যতামূলক।
ডিজিটাইজেশনের জন্য বই ধ্বংসের এই অনাকাঙ্ক্ষিত বিষয়টিতে বই বিক্রেতা ও সংগ্রাহকদের মধ্যে চরম মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। লন্ডনের ‘ওয়ালডেন বুকস’-এর স্বত্বাধিকারী ডেভিড টোবিন জানান, বহু বছর ধরে অবিক্রীত পড়ে থাকা বই বিক্রি হওয়া স্বস্তির হলেও, প্রক্রিয়াটি শেষে বইগুলো চিরতরে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে ভেবে মানসিক পীড়া অনুভূত হয়।
এডিনবার্গের ‘ম্যাকনটনস’ বইয়ের দোকানের মালিক ডেরেক ওয়াকার তাঁর উদ্বেগ প্রকাশ করে জানান, ১৮ শতকের বা তারও পূর্বের কোনো বিরল ও একক কপি হিসেবে টিকে থাকা ঐতিহাসিক বই যদি না জেনে স্ক্যান করার জন্য কেটে ফেলা হয়, তবে তা বৈশ্বিক প্রত্ন-সাহিত্যের অপূরণীয় ক্ষতি ডেকে আনবে।
তবে বিপরীতে ব্যবসায়ী স্টুয়ার্ট ম্যানলি মনে করেন, দীর্ঘদিন যাবত শেলফে পড়ে থাকা অপ্রয়োজনীয় বই নতুন কোনো প্রাতিষ্ঠানিক কাজে বিক্রি হয়ে যাওয়া খারাপ কিছু নয়। তাঁর ভাষায়, টানা ২০ বছর ধরে ওয়েবসাইটে ক্যাটালগ আকারে পড়ে থেকেও যেসব সাধারণ বই বিক্রি করা সম্ভব হয়নি, এআই টেকনোলজির যুগে সেগুলোর নতুন বাণিজ্যিক চাহিদা তৈরি হয়েছে।
|