জাতীয় মাছ ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে সরকারের নতুন প্রকল্প
অনলাইন ডেস্ক: বাংলাদেশের জাতীয় মাছ এবং জিআই (GI) পণ্য ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে সরকার ও সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকেরা একযোগে জোরালো উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন, জাটকা নিধন রোধে কঠোর অভিযান, মোবাইল কোর্ট পরিচালনা, নদীর নাব্যতা ও প্রাকৃতিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনা, বৈজ্ঞানিক মৎস্য আহরণ এবং জেলেদের সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ভিজিএফ (VGF) বা বিশেষ বরাদ্দের পরিমাণ বাড়ানোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
মৎস্য অধিদপ্তরের ইলিশ সম্পদ ব্যবস্থাপনা শাখার উপ-পরিচালক মো. আবুল কালাম আজাদ জানান, আগের প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলেও ‘মা ইলিশ ও জাটকা সংরক্ষণের মাধ্যমে ইলিশের টেকসই উন্নয়ন প্রকল্প’ নামে একটি নতুন প্রকল্প খুব শিগগিরই অনুমোদিত হতে যাচ্ছে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং জেলেদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি করা হবে। বিশেষ করে, জেলেদের জন্য প্রস্তাবিত ভিজিএফ সহায়তা ৬ লাখ ২০ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৬ লাখ ৪৬ হাজার করা হয়েছে।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু এ প্রসঙ্গে বলেন, “ইলিশ রক্ষার দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়, এটি আমাদের সবার। ইলিশের প্রজনন ও উৎপাদন বাড়াতে গত ৮ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া ২৯ দিনব্যাপী নিষেধাজ্ঞা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।” যেকোনো মূল্যে এই সময়ে ইলিশ ধরা বন্ধ রাখতে হবে বলে তিনি কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন।
মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বিগত ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ইলিশের উৎপাদন ছিল ৫.২৯ লাখ টন, যার আনুমানিক বাজারমূল্য ২০ হাজার ৬৮০ কোটি টাকা। তবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা কমে প্রায় ৫ লাখ টনে নেমে আসে, যা আগের তুলনায় প্রায় ৫.৫ শতাংশ কম।
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ অ্যান্ড মেরিন সায়েন্স অনুষদের চেয়ারম্যান ড. মাসুদ রানা এবং বাংলাদেশ মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মো. আব্দুল ওহাব মনে করেন, জলবায়ু পরিবর্তন, নদীদূষণ, প্লাংকটনের পরিমাণ হ্রাস, অপরিকল্পিত ট্রলিং এবং প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ ও জাটকা নির্বিচারে নিধন করার কারণে ইলিশের উৎপাদন নিম্নমুখী হয়েছে। জাটকা নিধনে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণের পাশাপাশি অভয়াশ্রমগুলোর সীমানা পুনর্নির্ধারণের পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
ইলিশসম্পদ সুরক্ষায় স্যাটেলাইট, জিআইএস, এআই (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) এবং ড্রোন প্রযুক্তির মাধ্যমে পানির তাপমাত্রা, লবণাক্ততা ও নদীর প্রবাহ পর্যবেক্ষণ করে ইলিশের গতিবিধি নির্ণয় এবং অবৈধ আহরণ রোধে ‘স্মার্ট হিলসা ম্যানেজমেন্ট’ গড়ে তোলার ওপর জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
উল্লেখ্য, দেশের মোট মৎস্য উৎপাদনের প্রায় ১২ শতাংশ আসে ইলিশ থেকে। বর্তমানে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ লাখ মানুষ ইলিশ আহরণ, পরিবহন ও প্রক্রিয়াজাতকরণের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে। ভারতসহ প্রতিবেশী দেশের নদীর পরিবেশের তুলনামূলক গবেষণার মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রধান নদী অববাহিকাগুলো রক্ষা করতে পারলে দেশের ইলিশ সম্পদ দীর্ঘমেয়াদে টেকসই ও সুরক্ষিত রাখা সম্ভব হবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা প্রকাশ করছেন।