সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ানো নিয়ে সর্বশেষ তথ্য ২০২৬

প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ০২ জুলাই ২০২৬, ১২:৩৭ অপরাহ্ণ
সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ানো নিয়ে সর্বশেষ তথ্য ২০২৬

অনলাইন ডেস্ক: বাংলাদেশে নতুন ২০২৬-২৭ অর্থবছর থেকে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বাড়ছে— বিষয়টি জাতীয় সংসদে বাজেট পেশকালে নিশ্চিত করেছিলেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। নিজের বাজেট বক্তৃতায় তিনি পহেলা জুলাই থেকে নতুন বেতন কাঠামো ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের ঘোষণা দিলেও, অর্থবছর শুরু হওয়ার পরও এ নিয়ে এখনো চূড়ান্ত গেজেট বা প্রজ্ঞাপন প্রকাশ করেনি সরকার। ফলে সরকারি চাকরিজীবীদের গ্রেডের ভিত্তিতে কার মূল বেতন ও ভাতা কত টাকা বাড়ছে, তা এখনো সুনির্দিষ্টভাবে জানা যায়নি।

আজ বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) বিবিসি বাংলার এক বিশেষ প্রতিবেদনে সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন পে-স্কেল সংক্রান্ত এই সর্বশেষ পরিস্থিতি ও চুলচেরা বিশ্লেষণের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

প্রতিবেদনে জানানো হয়, নতুন পে-স্কেল দেওয়ার ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় গঠিত বিশেষ কমিশন যে প্রস্তাব দিয়েছিল, হুবহু সেটিই কার্যকর হবে, নাকি বর্তমান নির্বাচিত সরকার এর সঙ্গে ভিন্ন কোনো রূপরেখা যোগ করছে— তা এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। তবে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনার জন্য মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বে ১০ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করেছিল এবং সেই কমিটি ইতোমধ্যে নতুন বেতন কাঠামোর একটি খসড়া রূপরেখা তৈরি করেছে।

বর্তমানে এই খসড়া রূপরেখাটিকে চূড়ান্ত রূপ দিতেই কাজ করছে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ। যেখানে মূলত নতুন কাঠামোতে বেতন কত বাড়বে, কয়টি ধাপে বা অর্থবছরে এই বেতন-ভাতা ধাপে ধাপে বাড়ানো হবে এবং বাজারে এর ফলে যে নতুন মূল্যস্ফীতি তৈরি হতে পারে, তা এড়ানোর কার্যকর পন্থা কী হবে— এই বিষয়গুলো নিয়ে গভীর অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, “নতুন অর্থবছরের শুরু (১ জুলাই) থেকেই নতুন স্কেলে বেতন কার্যকর হওয়ার আইনি সিদ্ধান্ত থাকলেও, গেজেট বা প্রজ্ঞাপন প্রকাশ হওয়ার আগ পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে কোনো গ্রেডের সুনির্দিষ্ট তথ্য বলা সম্ভব নয়। প্রশাসনিক আদেশ তৈরি, গেজেট মুদ্রণ এবং আইনি যাচাই-বাছাইয়ের কারণে চূড়ান্ত পরিকল্পনা প্রকাশ করতে আরও কিছুটা সময় লাগতে পারে। তবে যখন থেকেই এটি পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর হোক না কেন, পহেলা জুলাই থেকে হিসাব করে বকেয়াসহ (অ্যারিয়ার) তা পরিশোধ করার বিষয়টি জোরালো আলোচনায় রয়েছে।”

 বাংলাদেশে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য সর্বশেষ অষ্টম জাতীয় বেতন স্কেল ঘোষিত হয়েছিল ২০১৫ সালে। এরপর থেকে প্রতি বছর মূল বেতনের নির্ধারিত ৫ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি (ইনক্রিমেন্ট) হলেও, নতুন করে আর কোনো পে-স্কেলের দেখা মেলেনি। ফলে দীর্ঘ ১১ বছর ধরে নতুন বেতন কাঠামোর অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন দেশের লাখ লাখ সরকারি কর্মচারী।

২০২৫ সালে সাবেক অর্থ সচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বে 'জাতীয় বেতন কমিশন, ২০২৫' গঠন করেছিল তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার। ওই কমিশন গত ২২ জানুয়ারি সরকারের কাছে যে প্রতিবেদন জমা দিয়েছিল, সেখানে সরকারি কর্মচারীদের সর্বস্তরের বেতন-ভাতা ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর ঐতিহাসিক সুপারিশ করা হয়।

কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী, বিদ্যমান সর্বনিম্ন গ্রেডের মূল বেতন স্কেল ৮,২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০,০০০ টাকা এবং সর্বোচ্চ ধাপ বা গ্রেডের বেতন ৭৮,০০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০,০০০ টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। এছাড়াও বৈশাখী ভাতার হার বর্তমানের ২০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করা এবং যাতায়াত ও অন্যান্য চিকিৎসা ভাতার ক্ষেত্রেও ব্যাপক সংস্কারের কথা বলা হয়েছিল। তখন জানানো হয়েছিল যে, পুরো সুপারিশটি একবারে বাস্তবায়ন করতে সরকারের অতিরিক্ত প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হবে, যা জাতীয় বাজেটের ওপর বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি করতে পারে।

এই চাপ সামাল দিতেই বর্তমান সরকার নতুন বেতন-ভাতা একবারে কার্যকর না করে ধাপে ধাপে দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর এই তথ্য নিশ্চিত করে বলেছেন, “আমরা কয়েকটা ধাপে বা পর্যায়ক্রমে এটা করব। নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক দিক বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। প্রথম ধাপে মূলত কর্মচারীদের মূল বেতন বা বেসিকটা বাড়ানো হবে। পরবর্তীতে অন্যান্য ভাতা যুক্ত হবে।” অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি জুলাই মাসের মাঝামাঝি বা শেষ নাগাদ এই বেতন বৃদ্ধির চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশ হতে পারে।

 ঘোষিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ও ভাতা বাবদ প্রায় ৮৯ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। পেনশন ও গ্র্যাচুইটিসহ যা গিয়ে দাঁড়ায় ১ লাখ ৪১ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকায়। বাজেটের 'জনপ্রশাসন-নিট' খাতে গত অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় এবার রেকর্ড ৫৪ হাজার ৫৭২ কোটি টাকা বেশি বরাদ্দ রাখা হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এই অতিরিক্ত বরাদ্দের অন্তত ৪৪ হাজার কোটি টাকাই রাখা হয়েছে মূলত সরকারি কর্মচারী, এমপিওভুক্ত শিক্ষক এবং পেনশনভোগীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামোর আংশিক বা প্রথম ধাপ বাস্তবায়নের জন্য।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মজিদ এবং বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান সহ দেশের শীর্ষ অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দীর্ঘ এক যুগ পর সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধির সিদ্ধান্তটি অত্যন্ত ইতিবাচক ও যৌক্তিক। কারণ এই দীর্ঘ সময়ে মূল্যস্ফীতির কারণে তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় আকাশচুম্বী হয়েছে। তবে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের সময় সরকারকে অবশ্যই দেশের সার্বিক বাজার পরিস্থিতি ও মূল্যস্ফীতি কঠোর নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। তা না হলে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ার অজুহাতে বাজারে যদি জিনিসপত্রের দাম আরেক দফা বাড়ে, তবে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি খোদ সরকারি কর্মচারীরাও এই বেতন বৃদ্ধির আসল সুফল পাবেন না। একই সঙ্গে বেতন বৃদ্ধির পাশাপাশি সাধারণ জনগণের দোরগোড়ায় সরকারি সেবা নিশ্চিত করা এবং প্রশাসন থেকে দুর্নীতি দূর করার ওপরও জোর দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

মন্তব্য করুন