হলি আর্টিজান হামলার ১০ বছর আজ, চূড়ান্ত বিচার সুপ্রিম কোর্টে ঝুলে

প্রকাশ: বুধবার, ০১ জুলাই ২০২৬, ১০:৫৯ পূর্বাহ্ণ
হলি আর্টিজান হামলার ১০ বছর আজ, চূড়ান্ত বিচার সুপ্রিম কোর্টে ঝুলে

জাতীয় ডেস্ক: আজ ১ জুলাই। ঠিক এক দশক আগে ২০১৬ সালের এই রক্তক্ষয়ী ও অভিশপ্ত রাতে রাজধানীর কূটনৈতিক পাড়া গুলশানের ‘হলি আর্টিজান বেকারি’তে স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ, নৃশংস ও বর্বরোচিত জঙ্গি হামলা চালিয়েছিল উগ্রবাদীরা। দেশ-বিদেশে তোলপাড় সৃষ্টি করা সেই কালরাতের আজ ১০ বছর (এক দশক) পূর্তি হলো। এই ভয়াবহ হামলায় ১৭ জন বিদেশি নাগরিক ও ২ জন পুলিশ কর্মকর্তাসহ মোট ২২ জন নিরীহ মানুষ নিহত হয়েছিলেন। তবে নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সহযোগিতার দায়ে সাড়ে পাঁচ বছর আগে ঢাকার বিশেষ আদালত আসামিদের মৃত্যুদণ্ড দিলেও, মামলাটি বর্তমানে দেশের সর্বোচ্চ আদালতে এসে থমকে গেছে। তবে এবার এক দশক পূর্তির দিনে রাষ্ট্রপক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তারা মামলাটির চূড়ান্ত নিষ্পত্তির জন্য সর্বোচ্চ আদালতে দ্রুত শুনানির উদ্যোগ নেবে।

আদালত সূত্রে জানা গেছে, মামলার বিচারিক আদালতের (নিম্ন আদালত) রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের আবেদন) নামঞ্জুর করে ২০২৩ সালের ৩০ অক্টোবর ঐতিহাসিক রায় দিয়েছিলেন হাইকোর্ট। উচ্চ আদালত তখন আইনি ও ধারাগত ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করে আসামিদের ফাঁসির পরিবর্তে ‘আমৃত্যু কারাদণ্ড’ দেন। কিন্তু এরপর থেকে চূড়ান্ত নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে এই স্পর্শকাতর মামলার বিচারকাজে আর কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। বর্তমানে হাইকোর্টের ওই রায়ের বিরুদ্ধে সাজাপ্রাপ্ত আসামিদের লিভ টু আপিল (আপিলের অনুমতি চেয়ে আবেদন) সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে। এর মাঝে ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ডামাডোলে গাজীপুরের কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কারাগার থেকে পালানোর সময় কারারক্ষীদের গুলিতে আসলাম হোসেন নামের এক দণ্ডিত আসামি নিহত হন।

মামলাটির বিলম্ব ও দ্রুত শুনানির বিষয়ে দেশের প্রধান আইন কর্মকর্তা তথা অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, "রাষ্ট্রপক্ষের পক্ষ থেকে যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল মামলার দ্রুত শুনানি ও নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে আন্তরিকতার কোনো ঘাটতি থাকে না। তবে সুপ্রিম কোর্টের বিচারকস্বল্পতাসহ নানা বিচারিক ও বাস্তবতার কারণে অনেক সময় তা যথাসময়ে সম্ভব হয়ে ওঠে না। তবে হলি আর্টিজান হামলার ১০ বছর পূর্তির এই সময়ে দাঁড়িয়ে আমরা বলতে পারি, মামলাটি দ্রুত শুনানি ও চূড়ান্ত নিষ্পত্তির জন্য রাষ্ট্রপক্ষ থেকে বিশেষ ও আন্তরিক উদ্যোগ নেওয়া হবে।" তবে শুনানির সুনির্দিষ্ট কোনো সময়সীমার কথা তিনি উল্লেখ করেননি।

জাতীয় ডেস্ক ২০১৬ সালের ১ জুলাই পবিত্র রমজান মাসের রোজার ঈদের মাত্র এক সপ্তাহ আগে নিবরাস ইসলাম, শফিকুল ইসলাম ওরফে উজ্জ্বল, মীর সামেহ মোবাশ্বের, রোহান ইবনে ইমতিয়াজ ও খায়রুল ইসলাম ওরফে পায়েল নামের পাঁচ উচ্চশিক্ষিত ও বিপথগামী তরুণ আধুনিক পিস্তল, সাব-মেশিনগান আর ধারালো চাপাতি হাতে সন্ধ্যার পর গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় অতর্কিত ঢুকে পড়ে। তারা সেখানে থাকা বিদেশি ও দেশি অতিথিদের জিম্মি করে এবং সারারাত ধরে নৃশংসতা চালিয়ে ৯ জন ইতালীয়, ৭ জন জাপানি, ১ জন ভারতীয় এবং ৩ জন বাংলাদেশিসহ মোট ২০ জন নাগরিককে নির্মমভাবে হত্যা করে। হামলা ঠেকাতে গিয়ে রেস্তোরাঁর বাইরে জঙ্গিদের ছোড়া বোমা ও গুলিতে প্রাণ হারান পুলিশের দুই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। পরদিন সকালে সেনাবাহিনীর প্যারা-কমান্ডোদের পরিচালিত ‘অপারেশন থান্ডারবোল্ট’ অভিযানে ৫ জঙ্গির সবাই নিহত হয়। হামলার পর পরই মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট (আইএস) দায় স্বীকার করলেও তৎকালীন সরকার জানায়, দেশীয় নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন ‘নব্য জেএমবি’ এই হামলার মূল পরিকল্পনাকারী ও বাস্তবায়নকারী

পরবর্তীতে ২০১৯ সালের ২৭ নভেম্বর ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনাল এই ঘটনার নেপথ্যে থাকা নব্য জেএমবির ৭ সদস্যকে সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড এবং ৫০ হাজার টাকা করে জরিমানা করেন। নিয়ম অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ড কার্যকরে হাইকোর্টের অনুমোদন (ডেথ রেফারেন্স) প্রয়োজন হওয়ায় ২০১৯ সালের ১৮ আগস্ট মামলার সব নথি হাইকোর্টে পাঠানো হয়। আসামিরাও খালাস চেয়ে জেল আপিল করে। ২০২৩ সালের শুরু থেকে আপিলের শুনানি শেষে ওই বছরের ৩০ অক্টোবর হাইকোর্ট রায় দেন। গত বছর (২০২৫ সালের ১৭ জুন) সুপ্রিম কোর্ট ২২৯ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়টি প্রকাশ করেন।

হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আমৃত্যু কারাদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা গত বছর জুনেই আপিল বিভাগের সংশ্লিষ্ট শাখায় পৃথক লিভ টু আপিল দায়ের করেন। আসামিপক্ষের সাবেক আইনজীবী মো. আরিফুল ইসলাম জানান, হাইকোর্টের রায়ের পর আসামিপক্ষের কেউ আর যোগাযোগ না করলেও তিনি নিশ্চিত হয়েছেন যে ছয় আসামির পক্ষে লিভ টু আপিল দায়ের করা হয়েছে। বর্তমানে আমৃত্যু কারাদণ্ডে দণ্ডিত জীবিত ৬ আসামি হলেন— রাকিবুল হাসান ওরফে রিগ্যান, মো. জাহাঙ্গীর হোসেন ওরফে রাজীব গান্ধী, হাদিসুর রহমান, আবদুস সবুর খান ওরফে সোহেল মাহফুজ, মামুনুর রশীদ ওরফে রিপন এবং শরিফুল ইসলাম খালেদ।

উল্লেখ্য, ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পরদিন (৬ আগস্ট) গাজীপুরের কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কারাগারের ভেতরের কারারক্ষীদের জিম্মি করে ২০৯ জন বন্দি পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। তখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কারারক্ষীদের ছোঁড়া গুলিতে যে ছয়জন বন্দি নিহত হন, তাদের মধ্যেই ছিলেন এই মামলার আমৃত্যু কারাদণ্ডপ্রাপ্ত অন্যতম দুর্ধর্ষ আসামি আসলাম হোসেন।

হাইকোর্ট কেন মৃত্যুদণ্ড থেকে আসামিদের সাজা কমিয়ে আমৃত্যু কারাদণ্ড দিয়েছিলেন, তার বিস্তারিত ব্যাখ্যা উঠে এসেছে পূর্ণাঙ্গ রায়ে। উচ্চ আদালত রায়ে স্পষ্টভাবে বলেছিলেন, “হলি আর্টিজানের ঘটনাস্থলে সশরীরে উপস্থিত না থাকলেও এই সাত আপিলকারী পর্দার আড়ালে থেকে মূল ষড়যন্ত্র, অর্থায়ন ও অস্ত্র সরবরাহ করে জঘন্য এই ঘটনায় সরাসরি সহায়তা করেছেন, যা আদালতে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। তারা সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯-এর ধারা ৬-এর ১ উপধারা (ক)(আ) দফায় বর্ণিত অপরাধে দোষী। কিন্তু বিচারিক সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনাল সংশ্লিষ্ট ধারা ও উপধারার আইনি গূঢ়ার্থ যথাযথভাবে উপলব্ধি না করেই সরাসরি সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন, যা আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে সঠিক ও গ্রহণযোগ্য নয়। যে কারণে বিচারিক আদালতের উক্ত রায়টি উচ্চ আদালতের মাধ্যমে হস্তক্ষেপযোগ্য এবং আসামিরা আমৃত্যু কারাদণ্ড পাওয়ার যোগ্য।”

মন্তব্য করুন