ভোটার নিবন্ধনে ‘ফ্যামিলি ট্রি’ ব্যবস্থা আনছে নির্বাচন কমিশন
জাতীয় ডেস্ক: জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) তৈরি ও সংশোধনের ক্ষেত্রে যেকোনো ধরনের জালিয়াতি, অনিয়ম এবং অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের ভোটার হওয়া শতভাগ রোধ করতে ‘ফ্যামিলি ট্রি’ বা পারিবারিক তথ্যভিত্তিক এক যুগান্তকারী ও কঠোর নতুন ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা করছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এই বিশেষ ডিজিটাল ব্যবস্থা পুরোপুরি কার্যকর হলে, নতুন ভোটার হওয়ার জন্য আবেদনকারীদের শুধুমাত্র পিতা-মাতার তথ্যে আর কাজ হবে না; বরং নিজের আপন ভাই-বোনদের এনআইডি সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্যও বাধ্যতামূলকভাবে ফর্মে জমা দিতে হবে।
ইসি কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, সাধারণত এনআইডি কার্ড পাওয়ার প্রাথমিক শর্ত হিসেবে নাগরিকদের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হতে হয়। তবে ১৬-১৭ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীরা ভোটার হওয়ার যোগ্য না হলেও একই ফরম পূরণ করে এনআইডির জন্য আবেদন করতে পারে। এই আবেদনের ফরমে বর্তমানে কেবল পরিবারের সদস্যদের মধ্যে পিতা ও মাতার এনআইডি কার্ডের তথ্য ও কপি দিতে হয়। তবে সামনের দিনগুলোতে এই নিয়মে পরিবর্তন এনে পরিবারের অন্য রক্তসম্পর্কীয় সদস্য তথা ভাই-বোনদের এনআইডির তথ্য দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে।
নির্বাচন কমিশনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানান, মায়ানমার থেকে বলপ্রয়োগপূর্বক বাস্তুচ্যুত হয়ে দেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের এনআইডি জালিয়াতি ঠেকাতে চট্টগ্রাম অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে বিশেষ ফরমের মাধ্যমে কঠোরভাবে ভোটার বা এনআইডি কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। ফলে চট্টগ্রাম অঞ্চল থেকে রোহিঙ্গাদের পক্ষে এনআইডি সংগ্রহ করা এখন প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। কিন্তু এই কড়াকড়ির কারণে রোহিঙ্গারা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে স্থানীয় দালালদের সহায়তায় ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে ভোটার হওয়ার চেষ্টা করছে। এছাড়া অন্যান্য দেশের নাগরিকরাও মাঝে মধ্যে জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে বাংলাদেশের মূল্যবান এনআইডি হাতিয়ে নেয়। দালালেরা অনেক সময় বিভিন্ন ভুয়া কাগজপত্র ও অন্য কারও পিতা-মাতার এনআইডির তথ্য সহজে সংগ্রহ করে দেয়। এই জালিয়াতির পথটি চিরতরে বন্ধ ও আরও কঠিন করার জন্য মূলত ভাই-বোনের এনআইডির তথ্যও এখন থেকে নেওয়া হবে। এর মাধ্যমে কেউ নতুন ভোটার হতে এলে সার্ভারে থাকা সবার পারিবারিক তথ্য লিংক বা 'ফ্যামিলি ট্রি' তৈরি করে মুহূর্তেই নিখুঁতভাবে যাচাই করা সম্ভব হবে।
এদিকে কেবল ভিনদেশি বা বিদেশি নাগরিকরাই নয়, দেশের সাধারণ নাগরিকরাও অনেক সময় অনৈতিক কারণে বা চাকরি-সম্পত্তির লোভে পিতা-মাতার নাম বা বয়স পরিবর্তনের আবেদন করেন এবং সাথে ভুয়া কাগজপত্র জমা দেন। কিন্তু নতুন নিয়মে ভাই-বোনের এনআইডির তথ্য লিংক করা থাকলে তা আর কেউ করতে পারবেন না। কেননা, ভাই-বোনের এনআইডিতে পিতা-মাতার নাম ও তথ্য যা আছে, সেটি কেন্দ্রীয় সার্ভারে সহজে দৃশ্যমান হবে। ফলে এই ফ্যামিলি ট্রির মাধ্যমে দুই ধরনের বড় সুফল পাওয়া যাবে— প্রথমত, বিদেশিদের এনআইডি হাতিয়ে নেওয়ার সুযোগ পুরোপুরি বন্ধ হবে; অন্যদিকে দেশের নাগরিকদের জালিয়াতি ও জালিয়াতি চক্রের দৌরাত্ম্য রোধ হবে।
ইসির এনআইডি শাখার তথ্যপ্রযুক্তি কর্মকর্তারা বলছেন, পরিবারের সবার তথ্য এভাবে একটি একক চেইনে বা ফ্যামিলি ট্রিতে একসঙ্গে থাকলে ভবিষ্যতে এনআইডি ভুল বা সংশোধনের হার নাটকীয়ভাবে কমে যাবে। অন্যদিকে সবার তথ্যই এক ক্লিকে পাওয়া যাবে বিধায় বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সেবা প্রতিষ্ঠানও সহজেই ব্যক্তির পরিচয় সুনির্দিষ্টভাবে যাচাই করতে পারবে। এছাড়া এর ফলে জমিজমা বা ওয়ারিশ-সংক্রান্ত জটিল পারিবারিক বিরোধও অনেক কমে আসবে।
ইসি সচিব আখতার আহমেদ এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়ে বলেন, "আমরা একটি নিখুঁত ‘ফ্যামিলি ট্রি’ বা পারিবারিক শৃঙ্খল করার পরিকল্পনা করছি। কেউ একজন নতুন আবেদন নিয়ে এলে সেখানে তার পিতা-মাতা ছাড়াও কতজন ভাই-বোন আছে এবং তাদের এনআইডির নম্বর কত, তা দিতে হবে। এতে এনআইডি জালিয়াতির হার যেমন শূন্যে নামবে, তেমনি পরিবারের সবার তথ্য একসঙ্গে সিকিউরড থাকবে। এমনকি এর মাধ্যমে ওয়ারিশ সনদও ভবিষ্যতে আমরা ডিজিটাল পদ্ধতিতে দিতে পারব।" তিনি আরও জানান, ‘ফ্যামিলি ট্রি’ ব্যবস্থা চালুর বিষয়টি বর্তমানে উচ্চপর্যায়ে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনায় রয়েছে। কারিগরি প্রক্রিয়া শেষ হলে দ্রুতই এটি দেশব্যাপী বাস্তবায়ন করা হবে।
বাস্তব ক্ষেত্রে অনেকের নিজস্ব সনদের সঙ্গে ভাই-বোনের এনআইডিতে উল্লেখিত পিতা-মাতার নামের বানানের মিল থাকে না। আবার অনেক পরিবারেই ভাই-বোনদের কারও কাগজের সঙ্গে অন্যজনের কাগজপত্রে পিতা-মাতার নামের অমিল দেখা যায়। এমন ক্ষেত্রে কেউ নতুন ভোটার হতে এলে বা এনআইডির জন্য আবেদন করলে সমাধান কী হবে— জানতে চাইলে ইসি সচিব স্পষ্ট করে বলেন, "প্রথমত, এটি কোনো স্বাভাবিক বিষয় নয় যে একই ভাই-বোনদের মধ্যে পিতা-মাতার নামের বানানে মিল থাকবে না। দ্বিতীয়ত, যদি এমন ভুল হয়েই থাকে, তবে তারা পরিবারের সবাই মিলে পিতা-মাতার নামের বানান একই রকম ও সঠিক করার জন্য আগে আবেদন করবেন, আমরা তা সংশোধন করে দেব। এতে তো কোনো অসুবিধা নেই।" ইসি সচিব আরও বলেন, "আমরা চাই দেশের সবার এনআইডিতে একই রকম সঠিক তথ্য থাকুক। এজন্যই এই সমন্বিত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এতে বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম ও এনআইডি সংশোধনের জন্য বারবার আবেদনের হার কমবে।"
সাধারণ ক্ষেত্রে একজন নাগরিকের ভোটার হয়ে এনআইডি পাওয়ার জন্য— নিজস্ব নাম, পিতা-মাতার এনআইডির কপি, শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ, পাসপোর্ট, অনলাইন জন্মসনদ, ইউটিলিটি (গ্যাস/বিদ্যুৎ/পানি) বিলের কপি, বিবাহিতদের ক্ষেত্রে স্বামী বা স্ত্রীর এনআইডির কপি, ড্রাইভিং লাইসেন্স, টিআইএন (TIN) নম্বর, মোবাইল নম্বর এবং রক্তের গ্রুপ সংক্রান্ত কাগজপত্র ও তথ্য দিতে হয়। এছাড়া এনআইডি সংশোধনের জন্য কোর্টের হলফনামা, শিক্ষাসনদ, পরিবারের সদস্যদের এনআইডি, তালাকনামা, কাবিননামা, বাড়ির খাটি দলিল বা মিউটেশন পর্চা এবং ওয়ারিশ সনদ ইত্যাদি তথ্য দিতে হয়।
প্রবাসীদের ভোটার হওয়ার জন্য— পাসপোর্টের কপি (মেয়াদ থাকুক বা না থাকুক), সংশ্লিষ্ট দেশে বসবাসকারী এনআইডিধারী অন্তত তিন বাংলাদেশি নাগরিকের লিখিত প্রত্যয়নপত্র, অনলাইন জন্মনিবন্ধন সনদ, পাসপোর্ট সাইজের রঙিন ছবি এবং অনলাইনে পূরণ করা আবেদনপত্র সংশ্লিষ্ট দেশের বাংলাদেশি দূতাবাসে জমা দিতে হয়। বাধ্যতামূলক নয় এমন কোনো তথ্য যদি তারা প্রবাসে নিবন্ধন কেন্দ্রে জমা দিতে না পারেন, তবে প্রবাসীরা দেশে থাকা তাদের আত্মীয়-স্বজনের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তার কার্যালয়ে তা জমা দেওয়ার সুযোগ পান।
রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশপ্রবণ চট্টগ্রাম অঞ্চলের ৫৬টি উপজেলা বা থানার জন্য (চট্টগ্রাম অঞ্চল) ভোটার হতে হলে বিশেষ তথ্য ফরম, শিক্ষাসনদ, পিতা-মাতার এনআইডি, মৃত হলে মৃত্যু সনদ, ড্রাইভিং লাইসেন্স/টিআইএন, দ্বৈত নাগরিকত্ব সনদ (যদি থাকে), নিকাহনামা, স্বামী-স্ত্রীর এনআইডি, স্থানীয় চেয়ারম্যানের নাগরিকত্ব সনদ, ইউটিলিটি বিলের কপি, ভাড়াটিয়া হলে মূল বাড়িভাড়ার লিখিত চুক্তিপত্র এবং সংশ্লিষ্ট বাড়িওয়ালার অনাপত্তিপত্র বাধ্যতামূলকভাবে জমা দিতে হয়।
উল্লেখ্য, বর্তমানে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) মূল কেন্দ্রীয় সার্ভারে মোট ১২ কোটি ৮৩ লাখ ২৩ হাজার ২৪০ জন নাগরিকের ডাটাবেজ রয়েছে। এদের মধ্যে পুরুষ ভোটার ৬ কোটি ৫২ লাখ ১২ intellectual ৭৩১ জন, নারী ভোটার ৬ কোটি ৩১ লাখ ৯ হাজার ২৬৬ জন এবং হিজড়া বা তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন ১ হাজার ২৪৩ জন। ইসি কর্মকর্তারা জানান, ব্যাংক, বিমা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ দেশের সরকারি ও বেসরকারি প্রায় ২০২টি প্রতিষ্ঠান নাগরিকদের পরিচয় নিশ্চিত ও কেওয়াইসি (KYC) যাচাইয়ের জন্য নিয়মিত ইসির সার্ভার থেকে ভেরিফিকেশন সেবা নিয়ে থাকে। ‘ফ্যামিলি ট্রি’ চালু হলে খুব সহজেই এই প্রক্রিয়া আরও গতিশীল ও নিখুঁত হবে।
|