কিশোরগঞ্জে মাদকের জন্য ৪ পরিবারের ৫ সন্তান বিক্রির অভিযোগ
কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলায় মাদকাসক্তির ভয়াবহ ছোবলে পড়ে চারটি পরিবারের বিরুদ্ধে নিজেদের পাঁচটি নিষ্পাপ শিশু সন্তানকে অর্থের বিনিময়ে বিক্রি করে দেওয়ার চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় এলাকাবাসীর দাবি, মূলত নিয়মিত মাদকের টাকা জোগাড় করতেই এসব পরিবার নিজেদের নাড়ির ধন সন্তানদের অন্যের হাতে তুলে দিয়েছে। এমন অমানবিক ঘটনায় গোটা এলাকায় তীব্র ক্ষোভ ও আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে।
এ ঘটনায় সম্প্রতি বিক্রি হওয়া এক শিশুর বাবা জাকির হোসেন বাদী হয়ে কটিয়াদী মডেল থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। জাকির হোসেনের অভিযোগ, গত ২ সেপ্টেম্বর তাঁর স্ত্রী ফারজানা তৃতীয় সন্তানের জন্ম দেন। কিন্তু সন্তান প্রসবের পরপরই তাঁকে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখে এক দালালের মাধ্যমে নবজাতক শিশুটিকে বিক্রি করে দেন স্ত্রী। পাশের পাকুন্দিয়া উপজেলার মঠখোলা এলাকার এক ব্যক্তির কাছে ৬০ হাজার টাকার বিনিময়ে ওই সদ্যোজাত শিশুকে বিক্রি করা হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করেন তিনি।
তবে অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে স্ত্রী ফারজানা সম্পূর্ণ ভিন্ন দাবি করেন। তিনি জানান, তাঁর স্বামী জাকির দীর্ঘদিন ধরে চরম মাদকাসক্ত। সংসারে চলমান তীব্র অভাব-অনটন ও আর্থিক সংকটের পেছনে স্বামীর মাদকাসক্তিই একমাত্র দায়ী। ফারজানার দাবি, স্বামীর প্রত্যক্ষ সম্মতি ও উপস্থিতিতেই পরিবারের অনাহার কাটাতে নবজাতককে অন্যের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল, এখন সে বিষয়টি অস্বীকার করে নাটক করছে।
এদিকে জাকির হোসেনের ছোট ভাই গণমাধ্যমকে জানান, তাঁর ভাই প্রবাসে যাওয়ার আগে অত্যন্ত ভদ্র ছিলেন এবং জীবনে কখনো বিড়ি-সিগারেটও স্পর্শ করেননি। তবে বিদেশ থেকে দেশে ফিরে আসার পর তিনি জানতে পারেন জাকির চরম মাদকাসক্ত হয়ে পড়েছেন। সন্তান বিক্রির মতো জঘন্য অপরাধে ভাই জড়িত থাকলে তাঁর দৃষ্টান্তমূলক আইনি শাস্তি দাবি করেন তিনি।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, কেবল জাকির-ফারজানা দম্পতিই নন, একই গ্রামের আরও তিনটি পরিবার গত তিন বছরের ব্যবধানে একইভাবে তাদের সন্তানদের বিক্রি করে দিয়েছে। গ্রামবাসীদের সুস্পষ্ট অভিযোগ, এলাকাটিতে মাদক কারবারিদের দৌরাত্ম্য বাড়ায় মাদকাসক্ত মা-বাবারা নেশার টাকা জোগাড় করতেই এই পথ বেছে নিয়েছে।
গ্রামবাসীর দাবি অনুযায়ী, বিভিন্ন সময়ে মোট পাঁচটি শিশুকে ৬০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা পর্যন্ত মূল্যে নিঃসন্তান বিভিন্ন পরিবারের কাছে বিক্রি করা হয়েছে। একের পর এক এমন ঘটনায় সাধারণ গ্রামবাসীরা এখন নিজেদের সন্তানদের সার্বিক নিরাপত্তা নিয়েও গভীর উদ্বেগ ও শঙ্কা প্রকাশ করছেন।
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রফিকুল ইসলাম জানান, ঘটনাটি স্থানীয়ভাবে জানার পরপরই পুলিশের একটি বিশেষ দল ওই গ্রামে সরেজমিন পরিদর্শন করেছে। তিনি বলেন, “ঘটনাটি অত্যন্ত অমানবিক ও স্পর্শকাতর। আমরা লিখিত অভিযোগটি খতিয়ে দেখছি এবং বিক্রি হওয়া শিশুদের উদ্ধারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। একই সাথে এভাবে সন্তান বিক্রি রোধ এবং মাদকের অপব্যবহার বন্ধ করতে ওই এলাকায় সামাজিক সচেতনতা বাড়াতেও পুলিশ কাজ করছে।”