ব্রাজিলের কাছে হেরে বিদায়, দূরত্বের ব্যবধান কমার দাবি জাপান কোচের
নিজস্ব প্রতিবেদক: বিশ্বকাপের নকআউট পর্বের হাইভোল্টেজ ম্যাচে আরও একটি চরম হৃদয়ভাঙা ও বিষাদময় রাত কাটল ব্লু সামুরাইদের। যুক্তরাষ্ট্রের হিউস্টনের মাঠে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বুক চিতিয়ে জানপ্রাণ লড়াই করেও শেষরক্ষা হলো না এশিয়ান পরাশক্তি জাপানের। পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলের কাছে ২-১ গোলের অত্যন্ত নাটকীয় ও শ্বাসরুদ্ধকর হারে অশ্রুসিক্ত নয়নে শেষ হলো জাপানের এবারের হেক্সা বা বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্নযাত্রা। তবে ম্যাচের একদম শেষ মুহূর্তে এমন নাটকীয় আর কষ্টের হারের পরও পুরোপুরি ভেঙে পড়ছেন না জাপানের প্রধান মাস্টারমাইন্ড কোচ হাজিমে মোরিয়াসু। ম্যাচ শেষে তাঁর কণ্ঠে বিদায়ের আক্ষেপ ঝরলেও, ভবিষ্যতের জন্য ছিল বুকভরা দৃঢ় আত্মবিশ্বাস। জাপান কোচের সাফ কথা বিশ্বফুটবলের অন্যতম শীর্ষ পরাশক্তি ব্রাজিলের সঙ্গে তাদের শক্তির দূরত্বের ব্যবধানটা এখন অনেকটাই ঘুচে এসেছে।
ম্যাচ পরবর্তী অফিশিয়াল সংবাদ সম্মেলনে মোরিয়াসু বলেন, ‘ব্রাজিলের মতো দলের সঙ্গে মাঠের লড়াইয়ে আমাদের দূরত্ব এখন অনেকটাই কমে আসছে, যা এই ম্যাচেই প্রমাণিত। ওরা নিঃসন্দেহে বিশ্বমঞ্চের অন্যতম সেরা এবং শক্তিশালী দল। তবে আমরাও এখন টেকনিক্যালি ও মানসিকভাবে ওদের সেই স্তরের খুব কাছাকাছি পৌঁছে যাচ্ছি।’
তবে বিশ্বকাপের নকআউট পর্বের পরিসংখ্যান জাপানের জন্য এক নির্মম ট্র্যাজেডি ও অভিশাপের নাম। এ নিয়ে টানা তিন আসরের নকআউট পর্বে প্রথমে গোল করে এগিয়ে গিয়েও, শেষ পর্যন্ত সেই লিড ধরে রাখতে না পেরে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিতে হলো এশিয়ান এই পরাশক্তিকে। এর আগে ২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপে বেলজিয়ামের বিপক্ষে ২-০ গোলে এগিয়ে থেকেও শেষ পর্যন্ত ৩-২ ব্যবধানে হেরেছিল জাপান। পরবর্তীতে ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষেও প্রথমে লিড নিয়ে শেষ পর্যন্ত টাইব্রেকারে বিদায়ের স্তব্ধতা নেমে এসেছিল। আর এবার ২০২৬ আসরেও সেই একই পুরোনো ও নির্মম চিত্রনাট্যের পুনরাবৃত্তি ঘটল। লিড নিয়েও শেষ রক্ষা করতে পারল না জাপান।
হিউস্টনের মাঠে সোমবার রাতের ম্যাচে শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক খেলে ২৯ মিনিটে কাইশু সানোর চমৎকার ও দর্শনীয় গোলে লিড নিয়ে পুরো ব্রাজিল শিবিরকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল জাপান। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে খোলস ছেড়ে বের হওয়া সেলেসাওদের আক্রমণাত্মক ফুটবলকে আর আটকে রাখা যায়নি। ম্যাচের ৫৬ মিনিটে অভিজ্ঞ কাসেমিরোর দুর্দান্ত হেডে সমতায় ফেরে ব্রাজিল। এরপর ম্যাচ যখন অতিরিক্ত সময়ে গড়ায়, ঠিক তখনই অতিরিক্ত সময়ের একেবারে শেষ মুহূর্তে গ্যাব্রিয়েল মার্টিনেল্লির চোখধাঁধানো গোল জাপানের কোটি ভক্তের বুক ভেঙে দেয়।
এই হারের ফলে বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে জাপানের প্রথম ঐতিহাসিক জয়ের অপেক্ষাটা আরও দীর্ঘ হলো। তবে মোরিয়াসু দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন, এই কালো ইতিহাস একদিন বদলাবেই। তাঁর ভাষায়, ‘ইতিহাস হয়তো এই মুহূর্তে আমাদের প্রতি সদয় হচ্ছে না। তবে আমি নিশ্চিত, কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে একদিন আমরা এই হারের বৃত্ত ভাঙবই। সেদিন বিশ্বমঞ্চে জাপানের ফুটবল ইতিহাসটাই বদলে যাবে।’
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ব্রাজিলের বিপক্ষে এ পর্যন্ত ১৫ বারের দেখায় এটি জাপানের ১২তম হার। দুটি ম্যাচ ড্র হলেও একমাত্র জয়টি এসেছিল গত অক্টোবরের এক আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচে। কোচের মতে, সেই জয় আর এবারের জানপ্রাণ লড়াই প্রমাণ করে জাপান ফুটবল সঠিক পথেই এগোচ্ছে, তবে চূড়ায় পৌঁছাতে হলে নিজেদের খেলার মান আরও বাড়াতে হবে। ম্যাচ শেষে ড্রেসিংরুমে কান্নায় ভেঙে পড়া শিষ্যদের সান্ত্বনা দিয়ে এই গভীর হতাশাকেই ভবিষ্যতে এগিয়ে যাওয়ার বড় জ্বালানি বানানোর তাগিদ দিয়েছেন মোরিয়াসু। তবে দলের মহৎ স্বপ্নপূরণ না হওয়ার সব দায় সম্পূর্ণ নিজের কাঁধেই তুলে নিয়েছেন এই জাপানি ট্যাকটিশিয়ান। তিনি বলেন, ‘বিশ্বকাপ জেতাই ছিল আমাদের মূল লক্ষ্য ও স্বপ্ন। কিন্তু সেটা আমরা পারলাম না। প্রধান কোচ হিসেবে আমি খেলোয়াড়দের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছি। ওদেরকে সাফল্যের সেই সর্বোচ্চ শিখরে নিয়ে যাওয়ার জন্য হয়তো আমি নিজেই কৌশলগতভাবে যথেষ্ট যোগ্য হয়ে উঠতে পারিনি।’
|