সুন্দরবনের কাছে পিয়ালি ইকো রিসোর্ট ভ্রমণ গাইড ও খরচ
আজ সোমবার (৮ জুন) অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত ‘ভ্রমণ ও পর্যটন, হেরিটেজ সাইট ও ইকো-ট্যুরিজম’ এবং ‘কটেজ বুকিং, রুট ম্যাপ ও ট্রাভেল কস্ট ট্র্যাকিং উইং’ বিভাগের বিশেষ যৌথ বুলেটিংয়ে পিয়ালি ইকো রিসোর্টে দুই দিন এক রাতের রোমাঞ্চকর ভ্রমণের একটি সম্পূর্ণ ও বাস্তবসম্মত গাইডলাইন পাঠকদের উদ্দেশ্যে তুলে ধরা হলো।
সুন্দরবন বা মোংলা অঞ্চলের দিকে ভ্রমণের জন্য প্রথম ট্রানজিট পয়েন্ট হলো বাগেরহাটের কাটাখালী মোড়। ঢাকা থেকে খুলনাগামী যেকোনো ভালো মানের বাসে চড়ে সরাসরি কাটাখালী মোড়ে নেমে যাওয়া যায়। ঢাকার সায়েদাবাদ, আবদুল্লাহপুর বা গাবতলী থেকে এনা, সোহাগ পরিবহন, টুঙ্গিপাড়া এক্সপ্রেস, গ্রিনলাইন কিংবা ইমাদ পরিবহনের বাস নিয়মিত চলাচল করে। বাসের ধরন ও আসন ভেদে জনপ্রতি টিকিট ভাড়া শুরু হয় সাধারণত ৬৯০ টাকা থেকে।
সকাল ৭টায় ঢাকা থেকে যাত্রা শুরু করলে পদ্মা সেতু পার হয়ে নতুন এক্সপ্রেসওয়ের কল্যাণে মাত্র সাড়ে তিন ঘণ্টায়, অর্থাৎ সকাল ১০টা ৩০ মিনিটের মধ্যেই বাস কাটাখালী মোড়ে পৌঁছে যায়। কাটাখালী মোড় থেকে মোংলা পোর্টের দূরত্ব প্রায় ৩৩ কিলোমিটার। এই পথটুকু পাড়ি দেওয়ার জন্য লোকাল বাস কিংবা রিজার্ভ মাইক্রোবাস (হাইস) পাওয়া যায়। মাইক্রোবাসে সময় লাগে মাত্র ৩০ থেকে ৩৫ মিনিট। মোংলা ফেরিঘাটে পৌঁছালেই রিসোর্টের নিজস্ব ফাইবার বোট (নৌকা) পর্যটকদের স্বাগত জানাতে উপস্থিত থাকে।
মোংলা ঘাট থেকে নিরাপদ ফাইবারের নৌকায় চড়ে পশুর নদীর বুক চিরে যাত্রা শুরু হয় ওপারেই অবস্থিত গভীর বনঘেঁষা বানিয়াশান্তা ইউনিয়নের উদ্দেশ্যে। নদী পার হয়ে যখন সরু খালের ভেতর নৌকা প্রবেশ করবে, তখন থেকেই শুরু হবে আসল সুন্দরবনের রূপ আস্বাদন। খালের দুই পাশে ঘন গোলপাতা, সুন্দরী আর কেওড়া গাছের ফাঁকে ফাঁকে হঠাৎ দেখা মিলবে চিত্রা হরিণের দল, বানরের লাফালাফি কিংবা রোদ পোহাতে থাকা বিশাল গুইসাপ। ভাগ্য সুপ্রসন্ন হলে খালের কাদার ওপর অলস শুয়ে থাকা নোনাপানির বিশাল কুমির কিংবা রয়েল বেঙ্গল টাইগারের দেখাও মিলে যেতে পারে। নদী ও খালের এই মোহময় পথ ধরে প্রায় দেড় ঘণ্টা ট্রলার জার্নি শেষে দেখা মিলবে পিয়ালি ইকো রিসোর্টের নান্দনিক প্রবেশদ্বার
রিসোর্টের একদম কাছেই, নদীর তীর ঘেঁষে সবুজে ঘেরা এক শান্ত পরিবেশে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী ‘বনবিবির মন্দির’। সুন্দরবনের জেলে, বাওয়ালি, মৌয়াল আর কাঠুরিয়ারা—যারা প্রতিদিন জীবিকার তাগিদে বনের গহীনে প্রবেশ করেন, তারা বাঘ ও অন্যান্য বিপদ থেকে রক্ষা পেতে পরম বিশ্বাসে বনবিবির আশ্রয় প্রার্থনা করেন। প্রতি বছর মাঘ ও ফাল্গুন মাসে এখানে ধুমধাম করে বনবিবির পূজা অনুষ্ঠিত হয়। এই অঞ্চলের সবচেয়ে সুন্দর দিক হলো, এই লোকজ বিশ্বাসে ধর্মের কোনো বিভাজন নেই। হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ যুগ যুগ ধরে এখানে একসাথে মানত ও প্রার্থনা করে আসছেন। মন্ত্রোচ্চারণের পাশে যেখানে দোয়া-দুরুদ সমান্তরালে চলে, যা সুন্দরবনের বুকে এক অনন্য মানবিক সহাবস্থানের বার্তা দেয়।
বিকেলের নরম আলোয় লাইফ জ্যাকেট পরিধান করে রিসোর্টের নৌকা নিয়ে বের হওয়া যায় ক্যানেল ক্রুজিংয়ের জন্য। খালের বুক চিরে যখন বৈঠার ছন্দে নৌকা বনের আরও গভীরে প্রবেশ করে, তখন চারপাশের সুনসান নীরবতা এক দারুণ থ্রিলিং অনুভূতির জন্ম দেয়। রাতে রিসোর্টের হ্যামক বা দোলনায় শুয়ে মাথার ওপর খোলা আকাশ আর হাজার তারার মেলা দেখার অভিজ্ঞতা জীবনের অন্যতম সেরা স্মৃতি হয়ে থাকবে।
ভ্রমণের দ্বিতীয় দিনে আলসেমি জড়ানো সকালের গ্রামীণ নাস্তা শেষে ফেরার পথে ঢুঁ মারা যায় ‘করমজল বন্যপ্রাণী প্রজননকেন্দ্রে’ (Karamjal Wildlife Centre)। এখানে রয়েছে সরকারের অফিশিয়াল হরিণ ও কুমির প্রজননকেন্দ্র এবং বনের ভেতর দিয়ে হেঁটে যাওয়ার জন্য কাঠের তৈরি দীর্ঘ ও বিখ্যাত ‘মানকি ট্রেইল’। করমজল ঘুরে দুপুরের লাঞ্চ শেষে পুনরায় মোংলা ঘাটে ফিরে আসা এবং সেখান থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার মাধ্যমে শেষ হয় এই চমৎকার ট্যুর।
ভ্রমণ সুন্দর ও আনন্দময় হোক, তবে তা যেন কোনোভাবেই প্রকৃতির ক্ষতির কারণ না হয়। সুন্দরবন আমাদের ফুসফুস এবং এটি বৈশ্বিক ঐতিহ্য। তাই বনে বা রিসোর্টে ভ্রমণের সময় ও প্লাস্টিকের বোতল, চিপসের প্যাকেট বা ওয়ানটাইম জিনিসপত্র যেখানে-সেখানে ফেলে পরিবেশ দূষিত করা থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকুন। এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য শুধু আমাদের একার নয়, আগামী প্রজন্মের সুরক্ষার্থেও একে বাঁচিয়ে রাখা আমাদের সকলের নৈতিক দায়িত্ব।
জান্নাত সকালবেলা
|