মাসুদ হাসান উজ্জ্বলের ‘বনলতা সেন’ সিনেমার চুলচেরা বিশ্লেষণ ও রিভিউ

প্রকাশ: রবিবার, ০৭ জুন ২০২৬, ০২:৫৪ অপরাহ্ণ
মাসুদ হাসান উজ্জ্বলের ‘বনলতা সেন’ সিনেমার চুলচেরা বিশ্লেষণ ও রিভিউ
বিনোদন প্রতিবেদক : প্রথম কথা হিসেবে এটি স্বীকার করে নেওয়া ভালো যে, আমি কোনো পেশাদার বা কঠোর চলচ্চিত্র সমালোচক নই। কেবলই একজন সাধারণ রূপালি পর্দার অনুরাগী হিসেবে, আঠারো লাইনের একটি অবিনশ্বর কবিতা ‘বনলতা সেন’ নিয়ে যে নির্মাতা এত দীর্ঘ, কণ্টকাকীর্ণ ও নান্দনিক পথের একাকী অভিযাত্রী হতে পারেন, তাঁর সেই অবিশ্বাস্য সাহসকে কুর্নিশ জানাতেই এই লেখার অবতারণা। নিজের ভালোলাগা আর এই দুঃসাহসিক ভিজ্যুয়াল অভিযানের পেছনের মূল কারিগরকে একজন খাঁটি প্রেমিকের মতো গভীর ভালোবাসা উজাড় করে দেওয়াই এই পর্যালোচনার মূল উদ্দেশ্য।

আজ রবিবার (৭ জুন) দুপুর ২টা ৩৪ মিনিটে অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত ‘তারকা কথন, গ্ল্যামার ও বিনোদন’ এবং ‘সৃজনশীল বাংলা চলচ্চিত্র, আর্টহাউস সিনেমা, ভিজ্যুয়াল মেটাফোর ও জীবনানন্দীয় সাহিত্য পর্যবেক্ষণ উইং’ বিভাগের বিশেষ যৌথ বুলেটিংয়ে কবি ও চলচ্চিত্র নির্মাতা মাসুদ হাসান উজ্জ্বলের সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত ‘বনলতা সেন’ সিনেমার নান্দনিক ব্যবচ্ছেদ বিস্তারিত তুলে ধরা হলো।

চলচ্চিত্র নির্মাতা মাসুদ হাসান উজ্জ্বল তাঁর এই চলচ্চিত্রে একটি বিশেষ ও নিগূঢ় অর্থবহ উপশিরোনাম ব্যবহার করেছেন—‘এ ফ্লেশ অব পোয়েট্রি’ (A Flesh of Poetry)। সহজ বাংলায় যার অর্থ দাঁড়ায় কাব্যের দেহ কিংবা কবিতার মাংস। তবে এই শব্দবন্ধটি তিনি নিছক অলংকার হিসেবে নয়, বরং গভীর এক রূপক অর্থে পর্দায় ফুটিয়ে তুলেছেন। কবিতা যখন সাধারণ ডায়েরির পাতা বা অক্ষরের খাঁচায় বন্দি না থেকে কবির নিজের রক্ত-মাংসের তীব্র আবেগ, দহন ও অনুভূতির জীবন্ত অভিজ্ঞতায় সঞ্চারিত হয়, তখনই তা ‘ফ্লেশ অব পোয়েট্রি’র রূপ নেয়। ছবিটির সিনেমাটিক জার্নিতে অংশ নিতে নিতে দর্শক প্রতিটি দৃশ্যে যে মনস্তাত্ত্বিক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন, তাতে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে পর্দায় ‘বনলতা সেন’ কোনো কাল্পনিক ছায়া নন; বরং তিনি একজন হাড়-মাংসের শাশ্বত নারী, যাকে নির্মাতা ভিন্ন ভিন্ন রূপে ও অবয়বে হাজির করেছেন।

এই চলচ্চিত্রে নির্মাতা কবিতাটিকে কোথাও আবৃত্তি বা যান্ত্রিকভাবে ব্যবহার না করে, তাকে রক্ত-মাংসের আবেগ দিয়ে কবির জীবনের এক সমান্তরাল ফিচার হিসেবে দাঁড় করিয়েছেন। তাই পর্দায় ‘বনলতা সেন’কে খুঁজতে খুঁজতে দর্শক আসলে আবিষ্কার করে বসেন স্বয়ং কবি জীবনানন্দ দাশকে। এই ফিচার ফুটিয়ে তোলার অভিনব ভঙ্গিমার কারণে কালের দূরত্ব ঘুচিয়ে আজকের আধুনিক দর্শকও জীবনানন্দের মতোই এক একজন পরিব্রাজক বা যাযাবর হয়ে ওঠেন। ছবির মূল চরিত্র মহিনের ভেতর দিয়ে দর্শক সমকালীন বাস্তবতায় দাঁড়িয়েই কবির সেই ধূসর ও ট্র্যাজিক সময়ে অবগাহন করার সুযোগ পান।

নির্মাতা উজ্জ্বল এই ছবির মাধ্যমে দর্শককে ইতিহাসের এক গভীর সুরঙ্গ দিয়ে হাঁটিয়ে নিয়ে গেছেন। এই দীর্ঘ যাত্রায় পর্দায় কখনো দেখা মেলে বিশ্বখ্যাত কবি এডগার অ্যালেন পোর সেই অলৌকিক ‘হেলেন’-এর সাথে, কখনো দর্শক প্রবেশ করেন গৌতম বুদ্ধের পরম উপাসিকা বিশাখার পবিত্র গৃহে, কখনোবা কবির বাস্তব জীবনের খুঁড়তুতো বোন ও প্রথম প্রেম শোভনার ট্র্যাজিক স্মৃতির বারান্দায়। শুধু তাই নয়, ব্রিটিশ বিরোধী বিপ্লবী বনলতা সেনের নির্জন জেলের কামড়া থেকে শুরু করে ভারতের কেরালায় প্রাচীন স্তন-কর (Breast Tax) প্রথার বিরুদ্ধে প্রথম স্তন কেটে আত্মাহুতি দেওয়া অবদমিত ও বিদ্রোহী নারী ‘নাঙ্গেলি’র চিতার আগুনের তাপেও দর্শক নিজেকে দগ্ধ করার এক বিরল শৈল্পিক অভিজ্ঞতা লাভ করেন।

১৮ পঙক্তির এই কাব্যিক চলচ্চিত্রে মেটাফোর বা রূপকের এক দারুণ উৎসব চলেছে। ক্যামেরার ফ্রেম, আলোর বিন্যাস ও আর্ট ডিরেকশনে যে পরিমাণ সুক্ষ্ম কাজ করা হয়েছে, তা চোখের জন্য আরামদায়ক। তবে প্রথাগত কমার্শিয়াল ফর্মুলার বাইরে গিয়ে সাজানো এই ভিন্নধর্মী চিত্রনাট্যে হঠাৎ সংযোজিত একটি গানের আদৌ কোনো নাটকীয় প্রয়োজনীয়তা ছিল কি না, তা নিয়ে আমার মতো সাধারণ দর্শকের মনে একটি সংগত প্রশ্ন বা খটকা থাকতেই পারে। অভিনয়ের দিক থেকে মাসুমা রহমান নাবিলা (Masuma Rahman Nabila), খাইরুল বাসার (Khairul Basar), সোহেল মন্ডল (Sohail Mondol) এবং নবাগতা রূপন্তী আকিদ প্রত্যেকেই নিজ নিজ চরিত্রের সাথে এমনভাবে মিশে গিয়েছিলেন যে, তাঁদের সেই শৈল্পিক রসায়নে দর্শক হিসেবে আমিও পুরোপুরি দ্রবীভূত হয়েছি।

ব্যক্তিজীবনে মাসুদ হাসান উজ্জ্বল একাধারে একজন কবি, প্রথাবিরোধী চিত্রশিল্পী, সুরকার এবং চলচ্চিত্র নির্মাতা। বহুমুখী প্রতিভার এই মেলবন্ধনের কারণেই হয়তো তিনি এমন একটি মনস্তাত্ত্বিক ও দুঃসাহসিক অভিযান সফলভাবে পরিচালনা করতে পেরেছেন। ‘বনলতা সেন’ মূলত একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির উত্তীর্ণ ও বিদগ্ধ দর্শকের সিনেমা। এই সিনেমার প্রকৃত স্বাদ ও রূপ-রস-গন্ধ আস্বাদন করতে হলে নিজেকে কিছুটা সাহিত্য ও পঠন-পাঠনের মধ্য দিয়ে তৈরি করে প্রেক্ষাগৃহে বসলে সবচেয়ে ভালো হয়। তবে তৈরি না হয়ে আসলেও ক্ষতি নেই, এর মায়াবী প্রতীক ও স্বপ্নের জাল যেকোনো সাধারণ মানুষকেও আচ্ছন্ন করবে। ঠিক যেমন পাহাড়ের শৃঙ্গ ছুঁতে চাইলে পাদদেশ থেকেই প্রস্তুতি নিতে হয়, অন্যথায় গড়িয়ে পড়ার শঙ্কা থাকে; এই চলচ্চিত্রটির গভীরতাও ঠিক তেমন উচ্চমার্গীয়।

সবশেষে বলতে হয়, আমাদের বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের বাজারে দীর্ঘদিন ধরে ‘দর্শক খাওয়ানো’র নামে সস্তা নাচ-গান, ফাইটিং আর স্থূল রিরংসায় ভরা এক হাস্যকর ও কুরুচিপূর্ণ বাস্তবতা তৈরি করে রাখা হয়েছিল। সিনেমা যে শুধু সস্তা বিনোদন নয়, বরং তা একটি গভীরচিন্তন প্রক্রিয়া—সেই ধারণাটি ভাঙতে মেজবাউর রহমান সুমন (হাওয়া খ্যাত) এবং মাসুদ হাসান উজ্জ্বলের মতো তরুণ নির্মাতারা আধুনিক সিনেমার আকাশে উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো আলো ছড়াচ্ছেন। তাঁদের এই বৈপ্লবিক কাজ দেখে মনে হয়, বাংলা ভাষার সিনেমা খুব শীঘ্রই বিশ্বমঞ্চ জয় করবে। শেষকথা বলে আসলে কিছু নেই, বাংলা সিনেমার এই নবজাগরণের তো কেবলই শুরু!

জান্নাত সকালবেলা

মন্তব্য করুন