এআই ব্যবহারে সবার চিন্তা কি এক হয়ে যাচ্ছে

প্রকাশ: সোমবার, ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ০১:১৪ অপরাহ্ণ
এআই ব্যবহারে সবার চিন্তা কি এক হয়ে যাচ্ছে

অনলাইন ডেস্কঃকৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) বর্তমান যুগে মানুষের কাজকে বহুগুণ সহজ ও দ্রুত করে দিয়েছে। যেকোনো বিষয় নিয়ে লেখালেখি, পরিকল্পনা কিংবা নতুন উদ্ভাবনী ধারণা তৈরিতে এখন চোখের পলকেই মিলছে সমাধান। তবে এই প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহারের পাশাপাশি মানব সভ্যতার সামনে নতুন এক প্রশ্ন দেখা দিয়েছে—এআই-এর নিয়মিত ব্যবহারে মানুষের স্বাধীন চিন্তা ও সৃজনশীলতার বৈচিত্র্য কি ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে?

সাম্প্রতিক একাধিক আন্তর্জাতিক গবেষণার বরাতে মনস্তত্ত্ব বিষয়ক সাময়িকী ‘সাইকোলজি টুডে’ এমন আশঙ্কার ইঙ্গিত দিয়েছে।

২০২৪ সালে ‘সায়েন্স অ্যাডভান্সেস’ জার্নালে প্রকাশিত ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের আনিল দোশি এবং ইউনিভার্সিটি অব এক্সেটারের অলিভার হাউজারের এক গবেষণায় ৩০০ জন অংশগ্রহণকারীকে গল্প লিখতে দেওয়া হয়। তাঁদের একাংশকে এআইয়ের সহায়তায় গল্প বানানোর সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। ফলাফলে দেখা যায়, শুরুতে যাঁরা কম সৃজনশীল ছিলেন, এআই ব্যবহারের ফলে তাঁদের লেখার মান উন্নত হলেও সামগ্রিকভাবে সবার গল্পের মূল ধারণা ও কাঠামোর মধ্যে প্রবল মিল ছিল।

পরবর্তীতে ২০২৬ সালে ‘পিএনএএস নেক্সাস’ জার্নালে ২২টি এআই মডেল ও ১০০ জনেরও বেশি মানুষের ওপর পরিচালিত পৃথক এক গবেষণায় দেখা যায়, এআই মডেলগুলোর দেওয়া উত্তর মানুষের দেওয়া উত্তরের তুলনায় অনেক বেশি একই ছাঁচে বাঁধা ও সমরূপ ছিল।

মানুষের চিন্তার এই সমরূপতার পেছনে মনস্তত্ত্বের ‘অ্যাঙ্করিং’ বা প্রাথমিক ধারণার প্রভাবকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। ১৯৭৪ সালে বিশ্বখ্যাত মনোবিজ্ঞানী আমোস টভারস্কি ও ড্যানিয়েল কাহনেম্যান দেখিয়েছিলেন, যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে মানুষ শুরুতে প্রাপ্ত তথ্যের দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়।

এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রেও ঠিক এটিই ঘটছে। কোনো বিষয়ে নিজে চিন্তা করার আগেই যদি একজন মানুষ এআই-এর তৈরি করা খসড়া বা ধারণা পান, সেটিই তাঁর মস্তিষ্কের প্রথম ভিত্তি বা ‘অ্যাঙ্কর’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। একই বিষয়ে কোটি কোটি মানুষ এআইকে প্রশ্ন করলে তারা কাছাকাছি উত্তর পাচ্ছে, যার ফলে মানুষের চূড়ান্ত চিন্তাধারাও প্রায় একই রকম হয়ে যাচ্ছে।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এআই ব্যবহার করলেই যে মানুষের নিজস্ব সৃজনশীলতা শেষ হয়ে যাবে—বিষয়টি এমন নয়। কিছু নিয়ম মেনে চললে প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়েও নিজের চিন্তার মৌলিকতা টিকিয়ে রাখা সম্ভব:আগে নিজে ভাবুন: এআই চালুর আগেই যেকোনো বিষয়ে নিজের কয়েকটি হলেও অসম্পূর্ণ ধারণা বা চিন্তা আগে নোট করে নেওয়া উচিত। এরপর এআইকে কেবল সেই চিন্তাকে পরিশীলিত বা প্রুফরিড করার কাজে ব্যবহার করা যায়।ভিন্ন ধাঁচে চিন্তা: সবাই যখন এআই-এর দেওয়া নিরাপদ ও গতানুগতিক সমাধান বেছে নিচ্ছে, তখন প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োগ করলে কাজকে আলাদাভাবে ফুটিয়ে তোলা সহজ হয়।মানবিক অনুভূতি প্রয়োগ: মানুষের হাস্যরস, সহানুভূতি ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার বিকল্প এআই হতে পারে না। ২০২৫ সালে ‘নেচার হিউম্যান বিহেভিয়ার’ জার্নালে প্রকাশিত গবেষণায় দেখা যায়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার চেয়ে মানুষের নিজস্ব অভিজ্ঞতা ও অনুভূতি প্রকাশ পেলে পাঠকেরা সেটিকে বেশি গ্রহণযোগ্য ও হৃদয়গ্রাহী হিসেবে বিবেচনা করেন।

সংকটের এই যুগে এআই দিয়ে কাজ দ্রুত শেষ করা গেলেও, শেষ পর্যন্ত একটি কাজ বা ভাবনাকেন অন্য সবার চেয়ে আলাদা হয়ে উঠবে—তা সম্পূর্ণ নির্ভর করবে মানুষের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও অনুভূতির ওপর।