বেলুচিস্তান ইস্যুতে ভারতের বিরুদ্ধে প্রমাণ বিশ্বকে দেখাবে পাকিস্তান

প্রকাশ: শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬, ০৫:৩১ অপরাহ্ণ
বেলুচিস্তান ইস্যুতে ভারতের বিরুদ্ধে প্রমাণ বিশ্বকে দেখাবে পাকিস্তান
আন্তর্জাতিক ডেস্ক ঃ পাকিস্তানের খনিজ ও কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রদেশ বেলুচিস্তানে চলমান সশস্ত্র সহিংসতা ও নাশকতায় ভারতের কথিত প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততার সুনির্দিষ্ট ও অকাট্য প্রমাণ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরাম এবং বিশ্বমঞ্চে আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে পাকিস্তান সরকার।

দেশটির প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের রাজনৈতিক ও জনবিষয়ক শীর্ষ উপদেষ্টা রানা সানাউল্লাহ স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, বেলুচিস্তানের বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতিকে শুধু অভ্যন্তরীণ কোনো রাজনৈতিক সংকট, সাধারণ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বা বিচ্ছিন্ন সন্ত্রাসবাদের বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; বরং এটি মূলত আফগানিস্তানের ভূখণ্ডকে ব্যবহার করে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতের চাপিয়ে দেওয়া একটি ‘পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ’।

আজ শনিবার (১১ জুলাই) পাকিস্তানের প্রভাবশালী গণমাধ্যম জিও নিউজের বহুল আলোচিত ‘নয়া পাকিস্তান’ টকশো অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে রানা সানাউল্লাহ বলেন, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে যে, পাকিস্তানের অভ্যন্তরে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিতে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থার বিরুদ্ধে সংগৃহীত সমস্ত সুনির্দিষ্ট ও প্রযুক্তিগত প্রমাণ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে উন্মোচন করা হবে। তাঁর দাবি, পাকিস্তানের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা বিঘ্নিত করতে আফগানিস্তানের বর্তমান অস্থিতিশীল মাটিকে পরিকল্পিতভাবে ‘প্রক্সি’ বা ছায়া যুদ্ধের ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করছে নয়াদিল্লি।

এদিকে, বেলুচিস্তানে কাউন্টার-টেররিজম বা সন্ত্রাসবাদ দমনে চলমান বিশেষ সামরিক অভিযান ‘অপারেশন শাবান’-এ গতকাল শুক্রবার আরও ১৭ জন ‘ভারত-সমর্থিত সন্ত্রাসী’ নিহত হয়েছে বলে পাকিস্তানের নিরাপত্তা সূত্রগুলো জোরালো দাবি করেছে। এর ফলে গত কয়েক দিন ধরে চলা এই রক্তক্ষয়ী অভিযানে শুধু এই একটি ফ্রন্টেই নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৪৩ জনে পৌঁছেছে। মূলত প্রদেশটির মাঙ্গি ড্যাম পুলিশ স্টেশনে একটি বড় ধরনের প্রাণঘাতী ও নৃশংস হামলার পর পাকিস্তান সেনাবাহিনী, আধাসামরিক বাহিনী ফ্রন্টিয়ার কোর (এফসি) ও বেলুচিস্তান পুলিশের যৌথ অংশগ্রহণে এই সাঁড়াশি অভিযান শুরু হয়।

এর আগে পাকিস্তানের আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ শরিফ চৌধুরী গণমাধ্যমকে জানান, সশস্ত্র হামলাকারীরা প্রথমে একটি প্রত্যন্ত পুলিশ চৌকিতে অতর্কিত আক্রমণ চালালে পুলিশ সদস্যরা সাহসিকতার সঙ্গে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। প্রাথমিক সেই তীব্র সংঘর্ষে ১৫ জন হামলাকারী নিহত হলেও দুঃখজনকভাবে ৯ জন পুলিশ সদস্য প্রাণ হারান।

পরবর্তীতে হামলাকারীরা কৌশলে আরও কয়েকজন পুলিশ সদস্যকে জিম্মি করে জিয়ারাত এলাকার দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে আত্মগোপন করলে, নিরাপত্তা বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করে পাহাড়ে তাদের চারদিক থেকে অবরুদ্ধ করে ফেলে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, গত ৬ জুলাই থেকে জিম্মি উদ্ধারে সেখানে রুদ্ধশ্বাস অভিযান চলছিল। একপর্যায়ে সন্ত্রাসীরা চারদিক থেকে ঘেরাও বুঝতে পেরে তাদের হেফাজতে থাকা আরও ১৮ জন পুলিশ সদস্যকে নির্মমভাবে হত্যা করে।

লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ শরিফ চৌধুরী আরও যোগ করেন, মাঙ্গি চেকপোস্টে জিম্মি সংকট ও হামলায় সব মিলিয়ে মোট ২৭ জন পুলিশ সদস্য শাহাদাত বরণ করেছেন এবং দীর্ঘ অভিযানে এ পর্যন্ত ২৬ জন শীর্ষ সন্ত্রাসী নিহত হয়েছে। অন্যদিকে খুজদার এলাকার আরেকটি পুলিশ স্টেশনে চালানো সমান্তরাল হামলাও বীরত্বের সঙ্গে প্রতিহত করেছে পুলিশ। পরবর্তীতে সেখানে চালানো চিরুনি অভিযানে আরও আটজন সশস্ত্র ব্যক্তি নিহত হয়েছে বলে নিরাপত্তা সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে।

পাকিস্তানের সামরিক ও বেসামরিক নিরাপত্তা সূত্রের দাবি, গত ৫ জুলাই থেকে শুরু হওয়া ‘অপারেশন শাবান’ এবং অন্যান্য সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দাভিত্তিক বিশেষ অভিযানে প্রদেশের বিভিন্ন প্রান্তে এ পর্যন্ত মোট ৯১ জন সশস্ত্র বিদ্রোহী ও সন্ত্রাসী নিহত হয়েছে। এর বাইরে দুর্গম পাহাড়ি গিরিখাতে চালানো পৃথক বিশেষ হেলিকপ্টার গানিং অভিযানে আরও পাঁচ থেকে ছয়জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। তবে বিদ্রোহীদের সাম্প্রতিক এই ত্রিমুখী আত্মঘাতী হামলায় নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য ও সাধারণ বেসামরিক নাগরিকসহ সর্বমোট ৪২ জন পাকিস্তানি নিহত হয়েছেন।

এর আগে গত বৃহস্পতিবার কোয়েটায় ন্যাশনাল অ্যাকশন প্ল্যান (ন্যাপ)–সংক্রান্ত প্রাদেশিক অ্যাপেক্স কমিটির একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকে সভাপতিত্বকালে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ বেলুচিস্তানে ‘ভারত-সমর্থিত ও অর্থায়িত ছায়া সন্ত্রাসবাদ’ সম্পূর্ণ নির্মূলে দেশের বেসামরিক ও সামরিক নেতৃত্বের সুদৃঢ় অঙ্গীকার ও জাতীয় ঐক্যের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন।

প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলেন, ‘ফিতনা আল-খাওয়ারিজের যেকোনো ধরনের অশুভ ও রাষ্ট্রবিরোধী পরিকল্পনা আমাদের যেকোনো মূল্যে নস্যাৎ করতে হবে। দেশের এই সংকটকালে পুরো জাতি বীর সশস্ত্র বাহিনীর পাশে রয়েছে।’ একই সঙ্গে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, পাকিস্তানের মাটি থেকে শেষ সন্ত্রাসীকে সম্পূর্ণ নির্মূল না করা পর্যন্ত এই চিরুনি অভিযান অবিরাম চলবে। এ সময় ভারতের নাম সরাসরি উল্লেখ না করে তিনি আঞ্চলিক কূটনীতিতে অভিযোগ তোলেন যে, পাকিস্তানের ‘পূর্বাঞ্চলীয় প্রতিবেশী’ দেশই সাম্প্রতিক এই সমস্ত ভয়াবহ হামলার মূল মাস্টারমাইন্ড এবং পাকিস্তানে রক্তপাত ঘটাতে তারা আফগানিস্তানের অনিয়ন্ত্রিত ভূখণ্ডকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে।

মন্তব্য করুন