দক্ষিণ কোরিয়ায় জন্মহার বাড়াতে মন্দিরে স্পিড ডেটিংয়ের আয়োজন

প্রকাশ: রবিবার, ১২ জুলাই ২০২৬, ০৪:১২ অপরাহ্ণ
দক্ষিণ কোরিয়ায় জন্মহার বাড়াতে মন্দিরে স্পিড ডেটিংয়ের আয়োজন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: জন্মহারের ক্রমাগত পতন দক্ষিণ কোরিয়ার জন্য এখন অন্যতম বড় জাতীয় উদ্বেগের কারণ। তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বিয়ে ও পরিবার গঠনের প্রতি অনীহা দূর করতে দেশটির সরকার নানা অর্থনৈতিক সুবিধা দিলেও তাতে খুব একটা কাজ হচ্ছে না। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় এবার সম্পূর্ণ ভিন্ন এক অভিনব ও আধ্যাত্মিক পন্থায় এগিয়ে এসেছে দেশটির একটি প্রাচীন বৌদ্ধ মন্দির। তরুণ-তরুণীদের একাকীত্ব দূর করে তাঁদের সুস্থ ও সুন্দর উপায়ে জীবনসঙ্গী খুঁজে দিতে মন্দির প্রাঙ্গণেই আয়োজন করা হয়েছে বিশেষ ‘স্পিড ডেটিং’ ও সামাজিক মেলামেশার অনুষ্ঠান।

দক্ষিণ কোরিয়ার দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের পালগংসান পর্বতে অবস্থিত অষ্টম শতকের ঐতিহাসিক ‘ডংহওয়াসা’ (Donghwasa) মন্দিরে টানা ৩০ ঘণ্টাব্যাপী এই বিশেষ পরিচিতিমূলক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

মন্দিরের এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগের পেছনের কারণ ব্যাখ্যা করে আয়োজক ইউ চিওল-জু বলেন, “ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, অতীতে যেকোনো বড় জাতীয় সংকটে বৌদ্ধ ভিক্ষুরা সবসময় দেশের মানুষের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। বর্তমানে আমাদের দেশের সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি হলো— আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়া জন্মহার। এই জনসংখ্যা বিপর্যয় রোধ করতে আমাদের এই ক্ষুদ্র সামাজিক প্রয়াস।”

সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দক্ষিণ কোরিয়ায় বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম সর্বনিম্ন জন্মহার বিরাজ করছে। ২০২৩ সালের এক তথ্যে দেখা গেছে, দেশটিতে একজন নারীর গড়ে সন্তান জন্মদানের হার নেমে এসেছে মাত্র ০.৭২-এ, যেখানে একটি দেশের জনসংখ্যা স্বাভাবিক ও স্থিতিশীল রাখতে এই হার ন্যূনতম ২.১ থাকা প্রয়োজন। বিশ্লেষকদের মতে, আকাশচুম্বী আবাসন ব্যয়, সন্তান লালন-পালনের বিপুল খরচ, অতিরিক্ত কর্মজীবনের চাপ এবং বদলে যাওয়া আধুনিক সামাজিক মূল্যবোধের কারণে তরুণরা বিয়ে থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন।

মন্দিরে জীবনসঙ্গী খোঁজার এই লোভনীয় ও পবিত্র সুযোগটি হাতছাড়া করতে চাননি কোরিয়ান তরুণ-তরুণীরা। মাত্র কয়েকদিনের নোটিশে অনুষ্ঠানটিতে অংশ নিতে আবেদন করেছিলেন প্রায় ১,৬০০ জন আগ্রহী। সেখান থেকে দীর্ঘ প্রশ্নপত্র মূল্যায়ন ও কঠিন ভিডিও সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে নিখুঁতভাবে যাচাই-বাছাই করে মাত্র ২৪ জন তরুণ-তরুণীকে (১২ জন ছেলে ও ১২ জন মেয়ে) চূড়ান্তভাবে নির্বাচন করা হয়। তবে এই আয়োজনে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে ধর্মীয় পরিচয় কোনো বাধা ছিল না; বিয়ে ও সুন্দর পরিবার গঠনে প্রকৃত আগ্রহীরাই এখানে সুযোগ পেয়েছেন।

অনুষ্ঠানের ৩০ ঘণ্টায় ছিল নানা রোমাঞ্চকর পর্ব। এতে অংশগ্রহণকারীদের জন্য রাখা হয় নিজেদের চেনার বিভিন্ন পরিচিতিমূলক পর্ব, চায়ের আড্ডায় একান্তে কথা বলার সুযোগ, দলগত ইনডোর গেমস, চমৎকার সাংস্কৃতিক পরিবেশনা, প্রতিভা প্রদর্শনের সুযোগ এবং মূল আকর্ষণ ‘স্পিড ডেটিং’। এখানে সবাই একসঙ্গে নিরামিষ খাবার খান এবং মন্দিরের শান্ত পরিবেশে পরস্পরের চিন্তাভাবনা শেয়ার করেন।

৩০ ঘণ্টার এই মেলবন্ধন মোটেও বৃথা যায়নি। অনুষ্ঠানের শেষ দিনে সব প্রতিযোগী মোবাইল ফোনের মেসেজের মাধ্যমে নিজেদের পছন্দের মানুষের নাম প্রধান আয়োজকদের কাছে গোপনে পাঠান। আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, ২৪ জন অংশগ্রহণকারীর মধ্যে থেকে শেষ পর্যন্ত সফলভাবে ৮টি নতুন কাপল বা জুটি তৈরি হয়েছে। যার মধ্যে দুটি জুটি ছিল অনুষ্ঠানের নারী-পুরুষ কর্মী ও অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে।

যাদের কোনো প্রেমের জুটি মেলেনি, তারাও এই অভিজ্ঞতাকে অত্যন্ত ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। প্রতিযোগীরা জানিয়েছেন, ব্যস্ত নাগরিক জীবনে এর মাধ্যমে তারা নতুন কিছু ভালো বন্ধু পেয়েছেন এবং নিজেদের সামাজিক যোগাযোগ বাড়াতে পেরেছেন। দক্ষিণ কোরিয়া সরকারও এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছে, কারণ সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে— সরকারের বিভিন্ন গৃহ ও সন্তান জন্মদানের আর্থিক প্রণোদনার পাশাপাশি এই ধরণের সামাজিক আয়োজনের কারণে দেশটির অবিবাহিত তরুণ-তরুণীদের মধ্যে বিয়ে ও সন্তান নেওয়ার প্রতি ইতিবাচক মনোভাব আগের তুলনায় কিছুটা হলেও বৃদ্ধি পাচ্ছে।

মন্তব্য করুন